DMCA.com Protection Status
  • ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬

কলমাকান্দায় আদিবাসী পরিবারের ভাগ্যে জুটে না বিশুদ্ধ পানি

কলমাকান্দা সংবাদদাতা
|  ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৫ | আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:২৬
পাহাড়ি ছড়ার ময়লাযুক্ত গোলা পানি না হয় টিলার নিচে তিন চাঁকের (চাঁক্কি) তৈরি অগভীর কুঁপের (কুয়ো বা ইন্দরা) ময়লা পানিই শতাধিক আদিবাসী পরিবারের নিকট একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার টিলাঘেরা পাঁচ পাড়ার শতাধিক আদিবাসী পরিবারের লোকজন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় ধরেই তাদের এই দুরবস্থা।

গতকাল শুক্রবার সকালে সরজমিনে গেলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে আদিবাসী পল্লীর দুর্ভোগের শিকার পরিবারের লোকজন জানান, উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চেংগ্নী গ্রামের হতদরিদ্র পাঁচ পাড়ায় লোকজনের জন্য সরকারিভাবে টিউবওয়েল কিংবা গভীর কুয়ো তৈরি করে না দেয়ায় তাদের ভাগ্যে জুটছে না বিশুদ্ধ পানি।

গ্রামে সচ্ছ্বল পরিবারের লোকজন সুবিধামতো নিজ নিজ বাড়িতে কয়েকটি টিউবওয়েল বসালেও দিন আনে দিন খায় এমন হতদরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী লোকজন বসাতে পারছেন না বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল কিংবা একটি গভীর কুঁয়ো।

উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের টিলাঘেরা চেংগ্নীর টেংরা টিলাপাড়া, বাঙ চাকুয়া, বাতানগ্রী, কনকোণা, ধলধলাসহ পাঁচ পাড়ার লোকজন তাদের পানির দুভোর্গের কথা জানাতে গিয়ে বললেন, এক সময় পাড়ার লোকজন ওপারের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা চেংগ্নী ছড়ার ময়লাযুক্ত পানিই কাপড় দিয়ে ছেঁকে কোনোরকম পরিষ্কার করে পান করতেন। ধীরে ধীরে সচ্ছল পরিবারের লোকজন গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে টিউবওয়েল বসিয়েছেন। কিন্তু সেগুলোতেও আয়রণের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। অপরদিকে আর্থিক সুবিধা না থাকায় পাড়ার লোকজন নিজেরা হাজার দু’হাজার হাজার টাকা সংগ্রহ করে বনবিভাগের টিলার নিচে তিনটি পাঁকা চাঁকায় প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর পূর্বে কোনোরকম একটি কুঁয়ো (ইন্দরা) বসিয়ে খাবার পানিসহ পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনে পানি সংগ্রহ করে যাচ্ছেন।

উপজেলার চেংগ্নী’র বাতানশ্রীপাড়ার ফাতেমা হাগিদক (৬৫) বলেন, এই তিন চাঁকার কুয়োতে বছরের কার্তিক মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ছয় মাস পানিই থাকে না। শুঁকিয়ে যায়। কারণ কুয়োটি গভীর নয়। এ কারণে বছরের বাকি ছমাস চেংগ্নী ছড়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। এক সময় ছড়ার পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফকে বলে  ছড়ার উৎসমুখ জিরো লাইন থেকেও পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হয়।

একই গ্রামের টেংরা টিলাপাড়ার প্রয়াত জিনেং রিছিলের স্ত্রী শতবর্ষী জেমদিনী রাকসাম অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে নিজেদের গারো (মান্দি) ভাষায় বলেন, সতব্রিশনী বিলছি নাম্মাচিক রিংমানজাজক। (৪৭ বছরেও বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারলাম না)।

চেংগ্নী মাতৃমণ্ডলীর পাস্টার গিজিয়ন চিসিম (৬৫) বলেন, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে শুরু করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ অনেকের কাছে ধর্ণা দিয়েও এ এলাকার লোকজনের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা গেল না। 

উপজেলার চেংগ্নী টেংরা টিলাপাড়ার সুবিনাথ সাংমা (৫৫) বলেন, একটি তিন চাঁকার কুয়ো থেকে পানি সংগ্রহ করছে পাঁচ পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বণিতাকে লাইন ধরতে হয়, আবার কুয়োয় পানি না থাকলে সেই সীমান্তের জিরো লাইন থেকে তৈলের টিন, কলসি না হয় বালতি জোড়ায় পানি ভড়ে ঘাড়ে বয়ে আনতে হয়।

তিনি আরও বলেন, কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি উদ্যোগী হয়ে একটি টিউবওয়েল বা গভীর কুঁয়ো বসিয়ে দিতেন এ পাঁচ পাড়ার লোকজনের বিশুদ্ধ পানির দুর্ভোগ দূর হয়ে যেত।’

উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভুঁইয়ার নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেংগ্নীর ওই এলাকায় পানির দুর্ভোগের বিষয়টি পরিষদ অবহিত আছেন বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন,  আসলে ওখানে প্রায় হাজার ফুট গভীর নলকুপ বসাতে হবে। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মাটির নিচ থেকে পাথর সড়িয়ে যদিও বিকল্প হিসাবে একটি গভীর কুঁয়ো  বসানো যায় তাতেও ৭০ থেকে লাখ টাকা ব্যয় হবে।

তিনি আরও বলেন, সরাসরি উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলেই কেবল দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই এলাকায় পানির সমস্যা নিরসন করা সম্ভব হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেনের নিকট এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটা আমার জানা ছিল না। এ বিষয়টি আমাকে অবহিত করা মাত্রই আমি খোঁজখবর নিয়েছি। এলাকাটি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা। মাটির নিচে পাথর থাকায় এখানে অগভীর নলকূপ বসানো যায় না। এমনকি গভীর নলকূপ বসানোও খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ওই এলাকার জন্য কেবলমাত্র জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে যে রিংওয়েল বরাদ্দ দেয়া হয় তা প্রযোজ্য হবে। আমরা অতিদ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়