বঙ্গোপসাগর কেড়ে নিচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত

প্রকাশ | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:২১ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৫২

মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী

বঙ্গোপসাগরের তাণ্ডবে ক্ষত-বিক্ষত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সমুদ্রসৈকত সাগরকন্যা কুয়াকাটা। সাগরের রুদ্ররোষে সৈকতের অন্তত বিশাল একটা অংশ এরইমধ্যে সাগরের বুকে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছরই এভাবে ভাঙছে এ সৈকত। এ বছর ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। এতে সৌন্দর্য হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ সমুদ্র সৈকতটি।

ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে গেছে মনোরম পরিবেশের ইকো পার্ক, সারি সারি তাল গাছ, নারিকেল কুঞ্জ ও ঝাউ বাগানসহ আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো। এভাবে প্রতিদিনই উত্তাল সাগর গিলে খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ কুয়াকাটার সাজানো অপরূপ সৌন্দর্যকে। হুমকির মুখে রয়েছে কুয়াকাটা রক্ষা বেড়িবাঁধসহ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তা সত্ত্বেও ভাঙনরোধের উদ্যোগ নেই কারও। তাই ভাঙনরোধসহ এই সমুদ্র সৈকতটি রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন পর্যটকসহ স্থানীয়রা।

এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙনরোধ প্রকল্প এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এ প্রকল্পটির চলতি বছরের নির্মাণ কাজ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পুনঃসমীক্ষার জন্য ওই প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়ে দেয়ায় এ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে কিনা তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কর্তা ব্যক্তিরা। তবে, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

-------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : কুষ্টিয়ায় মুখোমুখি সংঘর্ষে ট্রাক দুটি পুড়ে ছাই
-------------------------------------------------------

অপরদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে থমকে আছে কুয়াকাটার মাস্টার প্লান। কুয়াকাটাকে ঢেলে সাজিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ২০১০ সালে এ মাস্টার প্লান করা হয়। মাস্টার প্লান প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে কয়েক দফা কুয়াকাটায় সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়ে স্থান নির্ধারণ করা হয় এবং ২০১৩ সালের জুনের দিকে মাস্টার প্লান তৈরির কাজ সম্পন্ন করে বই আকারে প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কুয়াকাটার মাস্টার প্লানেও জট বেধেছে। যার ফলে থেমে আছে কুয়াকাটা উন্নয়ন কাজও। এ মাস্টার প্লানটি বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটি আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠতো এবং সচল হয়ে উঠতো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা। আর এতে সরকারি রাজস্বখাতে যোগ হতো এক নতুন মাত্রা। কিন্তু সবকিছুই থমকে আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়।

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দেশের সর্ব দক্ষিণে পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটায় রয়েছে একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র এ সমুদ্র সৈকতটির কদর বাড়তে থাকে আশির দশক থেকে এবং তখন থেকেই দেশ-বিদেশের পর্যটকপ্রেমীরা ছুটে আসতে শুরু করে কুয়াকাটায়।

এখানে এসে প্রকৃতির হাতে সাজানো অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হতেন পর্যটকরা। তখন থেকেই ধীরে ধীরে সমুদ্রপ্রেমীদের হৃদয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে ঠাঁই মিলে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষাসহ সব ঋতুতেই পর্যটকদের কলরবে দিন-রাত মুখর থাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটি।

এখানে রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ এবং তাদের ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহার। শতাব্দীকালেরও আগে এখানে প্রচলন হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রাস উৎসব ও সমুদ্র স্নান। আর এ উৎসবকে ঘিরে কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতে আগমন ঘটে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও সমুদ্র দর্শনার্থীর।

১৯৯৮ সালের মে মাসে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় পর্যায় ও দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখানে বিনিয়োগ শুরু করেন। বিনিয়োগকারীরা জমিজমা ক্রয় ও বিক্রয়সহ হোটেল-মোটেল স্থাপনা নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। পর্যটকদের সেবার মান বাড়াতে বর্তমান সরকার ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে পৌরসভায় উন্নীত করে এবং ২০ বছর মেয়াদী উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। কিন্তু সব উদ্যোগ আর মহাপরিকল্পনাই গিলে খাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। 

স্থানীয়রা জানায়, বিধ্বস্ত সৈকতের প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গাছপালার গোড়ালি উপড়ে পরে রয়েছে। রয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিধ্বস্ত অংশের স্লাব, ভিম, পিলারসহ নানান ধরনের ভাঙা অংশ। রয়েছে সৈকতের বিশাল অংশজুড়ে ক্ষত-বিক্ষতের চিহ্ন। এতে জোয়ারের সময় গোসল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জখম হয় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। এমনকি সৈকতের বিশাল এলাকাজুড়ে এলোমেলোভাবে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য দোকানপাট। এ অব্যবস্থাপনা দেখার যেন কেউ নেই। এর ফলে দিনে দিনে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের এ সমুদ্র সৈকতটি।

লক্ষ্মীপুর থেকে আসা পর্যটক মো. নুরুল কবির প্রান্ত ও সুরাইয়া শারমিন উর্মি জানান, ক্রমাগত ভাঙনে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে এ সমুদ্র সৈকতটি। এছাড়া ইকোপার্কটি তো দিনে দিনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আসা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরূপ সৌন্দর্যের কথা শুনে কুয়াকাটায় ঘুরতে এলাম এবং ভালোই লাগছে। কিন্তু সৈকতটির ভাঙন দেখে খারাপ লাগছে।

কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সাকিল খলিফা, মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. রাসেল আহমেদ খলিফা বলেন, অনেকদিন ধরে এখানে ঝিনুক, আচারসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করছি। সেই থেকে দেখছি বঙ্গোপসাগরে রুদ্ররোষ। গত তিন বছরে অন্তত দেড় কিলোমিটার সাগর বক্ষে চলে গেছে এ সমুদ্র সৈকতের একটি অংশ। এসময়কালে বহুবার দোকান সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। শুধু আমরা নই, সৈকতের অর্ধশত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এভাবে প্রতি বছর দোকানের স্থান বদল করেছেন।  

সৈকতের ছাতা ও বেঞ্চ ব্যবসায়ী মো. নুর হোসেন, আল-আমিন, মো. দোলোয়ার হোসেন ও আব্বাস কাজী জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এই বিচে পর্যটকদের সেবা করছি। এ সময়ে অন্তত দুই কিলোমিটারেরও বেশি সৈকত সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনরোধ না হলে আর অল্প দিনের মধ্যেই বেড়িবাঁধও চলে যাবে সাগরের বুকে।   

আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোতালেব শরীফ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে এ সমুদ্র সৈকতটি। সৈকতটিকে রক্ষা করতে হলে যুগপোযোগী ও টেকসই ভাঙনরোধ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আর এটি করা না হলে কুয়াকাটাকে রক্ষা করা যাবে না। কুয়াকাটার হোটেল-মোটেলগুলো বেড়িবাঁধ সংলগ্ন হওয়ায় এগুলো এখন হুমকির মুখে রয়েছে। 

কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র আবদুল বারেক মোল্লা আরটিভি অনলাইনকে জানান, সৈকতের ভাঙনের অবস্থা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই মুহূর্তে যদি ভাঙনরোধের ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে কুয়াকাটার বিচ আর থাকবে না। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের আরটিভি অনলাইনকে জানান, কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙনরোধ প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে যাচাই-বাচাই শেষে অনুমোদন হওয়ার পর প্রকল্পের মূল কার্যক্রম শুরু হবে।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মো. মাছুমুর রহমান আরটিভি অনলাইনকে জানান, কুয়াকাটার সৈকতে এবারের ভাঙন অতীতের চেয়ে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এ বছর জোয়ারের পানির উচ্চতা ছিল অস্বাভাবিক। প্রকৃতির এই বাস্তবতার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তারপরও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় আশ্বস্ত করেছেন অতিদ্রুত ভাঙনরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তিনি।

আরও পড়ুন :

জেবি/পি