Mir cement
logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

গাইবান্ধা প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

  ০৮ মে ২০২২, ০৯:৪০
আপডেট : ০৮ মে ২০২২, ১১:৫৩

নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় 

নৌকায়, ঝুঁকি, নিয়ে, যাতায়াত, অতিরিক্ত, ভাড়া, আদায়,  
ছবি: আরটিভি

গাইবান্ধার বালাসি-বাহাদুরাবাদ রুটে স্যালো ইঞ্জিনচালিত খোলা নৌকায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। এ ছাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

যাত্রীপ্রতি ১২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ২০০-৩০০ টাকা এবং মোটরসাইকেল প্রতি ২০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাইবান্ধাসহ আশপাশের জেলার হাজার হাজার মানুষ বালাশীঘাটে ফেরির অপেক্ষা করছে। তারা লঞ্চে করে বাহাদুরাবাদঘাটে গিয়ে দেওয়ানগঞ্জ থেকে বাস কিংবা ট্রেনে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় যাবেন। কিন্তু ঘাটে লঞ্চ না থাকায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। বাধ্য হচ্ছেন নৌকায় ঝুঁকিপুর্ণ পারাপার করতে। নৌকার ওপরে ছাউনি নেই। নেই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। বালু পরিবহনের নৌকায় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছে। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকে এ অবস্থা চলছে।

সম্প্রতি বালাসিঘাটে ক্রয় ও ভাড়ায় তিনটি লঞ্চ আনেন স্থানীয় লঞ্চ মালিক সমিতি। গত ৯ এপ্রিল লঞ্চ সার্ভিসের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। উদ্বোধনের পর একটি লঞ্চ বিকল হয়। বাকি দুইটি নিয়মিত চলছে না। ফলে প্রতিদিন ছোটবড় ১৫-২০টি নৌকা ও বালু পরিবহনের নৌকায় যাত্রী পারাপার চলছে।

ঈদ পরবর্তী কর্মস্থলে ফেরার জন্য বাস ও ট্রেনের টিকেট না পাওয়া হাজার হাজার যাত্রীরা ছুটছেন বালাসিঘাটে। ঘাটে এসে তারা দুর্ভোগে পড়ছেন। কর্মস্থল ঢাকায় ফেরার জন্য গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বালাসিঘাটে আসেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকারিভাবে ফেরী আছে কাগজে-কলমে। এই ঘাটে বাস্তবে কোনো ফেরি বা লঞ্চ নাই। একটি সিন্ডিকেট যোগসাজস করে মানুষকে জিম্মি করে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় গাদাগাদি করে পারাপার করছেন। ঘাটে নেই কোনো শৌচাগার। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি।

একই অভিযোগ করেন ঢাকায় কর্মস্থলে ফেরা যাত্রী গাইবান্ধা সদর উপজেলার এনামুল হক ও মোহাম্মদ রানু, রংপুরের পীরগঞ্জের জান্নাতুল ফেরদৌসী রিয়াসহ অনেকে।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া গ্রামের কলেজশিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, লঞ্চ চালু করা হলেও এগুলো পুরোনো ও চলাচলের অনুপোযোগী। নিয়মিত চলে না। চললেও মাঝপথে বিকল হয়। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি নৌকায় ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় এসেছেন। কিন্তু অধিক লাভের আশায় বালু পরিবহনের নৌকায় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে। কোনো নৌকায় নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা (লাইফ জ্যাকেট ও টিউব)। ফলে ঝুঁকি বেড়েছে।

একই গ্রামের মেহেদী মিয়া বলেন, ঈদে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেশি। ট্রেনের টিকিট পাওয়া দুষ্কর। এ কারণে ঘরমুখি মানুষ নৌকার ওপর নির্ভরশীল হয়েছেন। এ সুযোগে জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তিনি ৩৫০ টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছেন। ঈদের আগেও একই ভাড়া দিয়ে তিনি বোনকে আনতে ঢাকায় গিয়েছিলেন।

এই রুটে প্রায়ই গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়ার ক্রীড়া সংগঠক আজহারুল হক জামালপুর যান। তিনি বলেন, বেশি ভাড়া নেওয়া হলেও নৌকায় লাইফ জ্যাকেট, টিউবসহ নাগরিক সুবিধা নেই। নেই যাত্রী ছাউনি কিংবা ছাতার ব্যবস্থা। রোদে পুড়ে যেতে হয়। এতে শিশু, বৃদ্ধ যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে দুঘর্টনা ঘটলে নিরাপত্তামূলক কোনো ব্যবস্থা নেই।

তবে বালাসিঘাটের ইজারাদার বাদল মিয়া অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, এই ঘাটটি তারা বিআইডাব্লিটিএ'র কাছ থেকে ইজারা নেওয়া। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত তার যাত্রী পারাপারের মেয়াদ রয়েছে। অথচ লঞ্চ মালিক সমিতি হঠাৎ করে ঈদের আগে এ রুটে লঞ্চ চালু করে। কিন্তু সেই লঞ্চগুলো চলাচলের অনুপোযোগী (ফিটনেসবিহীন)। অদক্ষ চালক ও লঞ্চে হেডলাইট না থাকায় রাতে চলাচল করতে পারে না। গত কয়েকদিন ধরে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রিরা কর্মস্থলে ফেরার কারণে নৌকায় যাত্রীর চাপ বেড়েছে।

লঞ্চ ফেলে রেখে নৌকায় যাত্রী পারাপার প্রসঙ্গে গাইবান্ধা বালাসি-বাহাদুরাবাদ লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিদিন বালাসিঘাট থেকে সকাল ৯টা ও ১১টা, দুপুর দুইটা ও বিকেল চারটায় লঞ্চ ছেড়ে যেত। জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা। প্রতিটি লঞ্চ ১৫০-২৫০ আসনবিশিষ্ট। যেতে সময় লাগতো পৌনে দুই ঘণ্টা ও আসতে লাগবে আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু নদীতে ডুবোচরের কারণে নিয়মিত লঞ্চ চালানো যাচ্ছে না। শুক্রবার সন্ধ্যায় ও শনিবার সকালে দুইটি লঞ্চ ডুবোচরে আটকে আছে। লঞ্চ নিয়মিত চালাতে নদীপথ সচল রাখার জন্য বিআইডাব্লিটিএ কর্তৃপক্ষের কাছে ড্রেজার চাওয়া হয়েছে। ড্রেজিং ছাড়া এ রুটে লঞ্চ চালানো সম্ভব নয়।

গাইবান্ধা রেলস্টেশন সূত্র জানায়, বৃটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখঘাট-জামালপুরের বাহাদুরাবাদ নৌরুট চালু করে। তখন থেকে এ রুটের মাধ্যমে ঢাকা-দিনাজপুর রেল যোগাযোগ চালু ছিল। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার মানুষ ট্রেনযোগে তিস্তামুখঘাটে যেতেন। এরপর তিস্তামুখঘাট-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি পারাপার হতেন। ওপারে বাহাদুরাবাদে গিয়ে ট্রেনে উঠে ঢাকায় যেতেন। সে সময় ঢাকার সঙ্গে উত্তরের আট জেলার দূরত্ব দুই-তিন ঘণ্টা কমেছিল।

১৯৯০ সালে নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে তিস্তামুখঘাটটি একই উপজেলার বালাসিতে স্থানান্তর করা হয়। এ জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ত্রি-মোহিনী থেকে বালাসি পর্যন্ত নতুন প্রায় ছয় কিলোমিটার রেলপথ নির্মিত হয়। তখন বালাসি-বাহাদুরাবাদ রুটের মাধ্যমে একইভাবে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল।

১৯৯৬ সাল থেকে যমুনা নদীতে নাব্যতা হ্রাসের কারণে বালাসি-বাহাদুরাবাদ রুটে রেলওয়ের ফেরি চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়ে যায়। এরই মধ্যে ১৯৯৮ সালের জুন মাসে যমুনা বহুমুখি সেতু চালু হয়। ফলে ২০০০ সাল থেকে এ রুটে রেলের ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে প্রায় ২২ বছর ধরে বালাসি-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। অবশ্য শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে ঝুঁকিপুর্ণ পারাপার অব্যাহত ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে বালাসি-বাহাদুরাবাদ নৌরুটে লঞ্চ সার্ভিস চালুর জন্য স্থানীয় জনগনের দাবির মুখে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিটিএ) উভয়পাশে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নৌ টার্মিনাল নির্মাণ করে। এই পথে রো রো ফেরি (পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার মতো) চালুর মাধ্যমে যাত্রীসহ যানবাহন পারাপার করার কথা। দীর্ঘ ২২ বছর পর এই পথে গাইবান্ধাবাসীর বহু প্রত্যাশিত রো রো ফেরি চালুর ব্যবস্থা না করে গত ৯ এপ্রিল লঞ্চ সার্ভিস উদ্বোধন করা হলেও তা কাজে আসছে না।

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS