Mir cement
logo
  • ঢাকা সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

কক্সবাজার প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

  ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৩৩
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৪১

বন দখলের মহোৎসব চলছে কক্সবাজারে 

দখলের মহোৎসব চলছে কক্সবাজারে 
খাসজমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, ছবি : আরটিভি

কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্যারাবন নিধন আর সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মহোৎসব চলছে। থেমে নেই নদীতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন, অবাধে পাহাড় কর্তন, বনের গাছ নিধন ও মাটি বিক্রিও। কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে সৃষ্ট প্যারাবনের আনুমানিক ২০ হাজার গাছ কেটে দখল করা হয়েছে কয়েকশ একরের জলাভূমি।

পাশাপাশি গাছপালা উজাড় হওয়ায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য। কাটা গাছের গোড়ালি যাতে প্রশাসনের কেউ দেখতে না পান এ জন্য চলছে ভরাটের কাজ।

কয়েক দিন ধরে প্যারাবনের বিশাল ভূমি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখে সেখানে ভরাটের কার্যক্রম চালানো হলেও বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বাঁকখালী নদীর দখলদারদের উচ্ছেদ, দখল বন্ধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।

জানা গেছে, কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর তীরের কস্তুরাঘাট এলাকায় প্যারাবনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নদীর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১০ একর প্যারাবন নিধন করে সরকারি খাস জমি ও নদীর তীর দখলে নিয়েছে স্থানীয় কয়েকটি দখলবাজ সিন্ডিকেট। পাশাপাশি প্যারাবনের কয়েক হাজার গাছ কেটে পাহাড়ি মাটি দিয়ে ভরাট করে রাতারাতি তৈরি করা হয়েছে টিনের ঘেরা দিয়ে প্লট।

অভিযোগ উঠেছে, এই দখলকৃত প্লট চড়াদামে বিক্রি করছে দখলবাজরা। আর এই দখল কার্যক্রমে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তরের গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কয়েকজন অফিসার। যে কারণে দখলকারীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হলেও বরাবরের মতোই মামলা থেকে বাদ পড়েছে দখলে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অসংখ্য দখলকৃত প্লটের মালিক ও দখলবাজরা।

সরেজমিনে গিয়ে একাধিক লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যারা দখলের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন তারা হলেন, নেত্রকোনা সদরের মৌগাতী, মারাদিঘী এলাকার চিহ্নিত দালাল ওমর ফারুক (৩৬) ওরফে দালাল ফারুক, মহেশখালীর কুতুবজোমের মেহেরিয়াপাড়ার রোকন উদ্দিন (৪০), মহেশখালী পৌরসভার, চরপাড়ার মোহাম্মদ ইউছুফ (৪৫), সাতকানিয়া কাঞ্চনার শরিফুল আলম চৌধুরী (৫০), মহেশখালী পুটিবিলা এলাকার জাহেদুল ইসলাম শিবলু (৪০), বদর মোকামের এলাকার কামাল মাঝি (৫০), খরুশকুল কুলিয়াপাড়ার মোহাম্মদ সোহেল (৩৬), সাতকানিয়া পশ্চিম ডলুর জসিম উদ্দিন (৪৪), বাঁশখালী চনুয়ার জিয়া মো. কলিম উল্লাহ (৪০), লোহাগাড়া চৌধুরীপাড়াস্থ উত্তর হরিয়া এলাকার খোরশেদ আলম চৌধুরী (৫৫), মনোহরগঞ্জের দক্ষিণ সরসপুর বাতাবাড়িয়া এলাকার ফিরোজ আহমদ, বদর মোকামের কফিল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনস্থ চাদগাঁও এলাকার মাহমুদুল করিম (৪১), শহরের লালদিঘীপাড় এলাকার আশিক (৩৮), কক্সবাজার সদর উপজেলার হাজীপাড়ার আমীর আলী (৪৫), রামু চাকমারকুলের মোস্তফা কামাল (৫০) ও বৈল্যাপাড়ার আমিন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দখলদার বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে রাতে হাজার হাজার কেউড়া, বাইনগাছ কেটে বনভূমি টিন দিয়ে ঘিরে দখলে নিয়েছেন। এরপর প্রতি দুই শতক জমি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় বিভিন্ন লোকজনের কাছে বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা।

এ নিয়ে কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা আরটিভি নিউজকে বলেন, জাপানি একটি পরিবেশবাদী সংস্থার কর্মীরা জোয়ারের প্লাবন থেকে শহরবাসীকে রক্ষার জন্য বাঁকখালী নদীর তীরে কয়েক হাজার বাইন ও কেওড়া গাছের চারা রোপণ করেছিলেন কয়েক বছর আগে। সেগুলো ২০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতার হয়েছে। এখন সেসব গাছ কেটে জলাভূমি দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালী মহল।

কস্তুরাঘাটের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, বদরমোকাম হয়ে খুরুশকুল পর্যন্ত সংযোগ সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে মূলত নদী দখল শুরু হয়। নির্মাণাধীন সেতুর দুপাশে চলছে প্যারাবন উজাড় করে নদী দখল ও ভরাটের কাজ। এতে নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জোয়ার-ভাটার অংশ ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা। প্যারাবন দখল-বেদখল নিয়ে দখলদারদের মধ্যে সংঘাতও চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, দখলবাজরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় স্থানীয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা করছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার চেষ্টা করেও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে প্যারাবন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বাধা দিতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, গতকাল রোববার (৯ জানুয়ারি) ভোর ৪টার দিকে গাছ কাটা শুরু করে সকাল পর্যন্ত চলে। পাশাপাশি প্যারাবনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উজাড় করে। এ ছাড়া পাহাড়ি মাটি দিয়ে একসঙ্গে ভরাট কার্যক্রমও চালায় দখলবাজরা।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সাইফুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, প্যারাবন নিধন ও পাহাড়ি মাটি ফেলে নদী দখলের বিষয়ে ইতোপূর্বে তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটির চার্জশিট হয়েছে। বাকি দুটি মামলার তদন্ত চলছে। তবে সম্প্রতি রেকর্ড হওয়া মামলায় প্রকৃত দখলবাজ ও প্যারাবন নিধনকারীদের বাদ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা নিজে নতুন যোগদান করেছেন বলে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।

কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুএমং মারমা মং বলেন, গতকাল রোববার সকালে প্যারাবনে আগুন দিয়ে দখলবাজির ব্যাপারে শোনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। কিন্তু তখন দখলবাজদের ঘটনাস্থলে না পাওয়ার কারণে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।

এদিকে, পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাহাড় ও বন কাটার সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের মাঝে মধ্যে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে মিলে বন থেকে গাছ চুরি করলে বন রক্ষা করার আর কোনো উপায় থাকে না। এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো সাহসও কেউ দেখাতে পারে না। উল্টো তাকে দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। গাছ চুরি বন্ধে এসব শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্থানীয়রা।

এমআই/পি

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS