Mir cement
logo
  • ঢাকা রোববার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮

কামাল হোসেন

  ০৫ জুন ২০২১, ১৫:২৯
আপডেট : ০৫ জুন ২০২১, ১৫:৪৩

কচি কাঁঠালও পাকছে ২৪ ঘণ্টায়, কোষে কোষে বি'ষ

কচি কাঁঠালও পাকছে ২৪ ঘণ্টায়, কোষে কোষে বিষ

মধুমাসের মধুফল জাতীয়ফল কাঁঠাল পছন্দ অনেকেরই। আর এ জাতীয় ফলটি পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল ইথিফন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পেকে যাচ্ছে কচি কাঁঠাল। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বেশি লাভের ব্যবহার করছে এ বিষাক্ত কেমিক্যাল। অনেকটা জোর করেই পাকানো হচ্ছে কাঠাল।

সরেজমিনে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এবং মধুপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি বাজারের নাম গারোবাজার। জেলার সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট বসে এখানে। সপ্তাহে রোববার এবং বুধবার বসে এ হাট। হাটবার ছাড়াও প্রতিদিনই এখান থেকে ট্রাকে করে কাঁঠাল যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে হাটবারে আমদানি হয় অনেক বেশি। ৩০-৩৫ ট্রাকে কাঁঠাল ভরা হয়।

এছাড়াও ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী, জোড়দিঘী, আষাড়িয়া চালা, রামদেবপুর, শহর গোপিনপুর, ধলাপাড়া, দেওপাড়া, দেলুটিয়া, ছোনখোলা, চাপড়ি, পেচারআটা, মাকড়াই, কুশারিয়াসহ অনেক এলাকায় হাটবারে শতাধিক ট্রাকে ভরে কাঁঠাল যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

বেশি লাভের আশায় মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই কচি কাঁঠালে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিষাক্ত ইথিফন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে জোর করেই পাকাচ্ছেন কাঁঠাল। আর এসব রাসায়নিক দ্রব্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে হাতের নাগালেই পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রাকৃতিকভাবে কাঁঠাল পাকতে একটু সময় লাগে। কিন্তু উচ্চ মাত্রায় কেমিক্যাল প্রয়োগ করলে ২৪ ঘণ্টায় একটি কচি কাঁঠালও পেকে যায়। চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে কাঁঠাল পাকানোর প্রতিযোগিতা। স্থানীয়ভাবে এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘শিক মারা’। প্রায় দেড় ফুট লম্বা লোহার শিক কাঁঠালের বোটা বরাবর ঢুকিয়ে দিয়ে ছিদ্র পথে সিরিঞ্জ দিয়ে বিষাক্ত ইথিফন প্রয়োগ করা হয় উচ্চ মাত্রায়। অনেক ক্ষেত্রে ইথিফন এর সঙ্গে মেশানো হচ্ছে লবণ এবং পটাশ সার।

মধুপুর মহিষমারা গ্রামের কৃষক তায়েব আলী জানালেন, ইথিফনের সঙ্গে লবণ আর পটাশ মেশালে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। হাতে বা শরীরের কোথাও লাগলে সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, অপরিপক্ক কাঁঠাল এভাবে পাকানোর ফলে মানুষ শুরুতে প্রতারিত হয়ে পরে আর কাঁঠাল কিনতে চায় না।

গারোবাজারের কৃষক মিন্টু মিয়া জানালেন, শিক দিয়া বোটা ফুটা কইরা যে ওষুধ দেওয়া হয় তা কাঁঠালের সব রোয়ায় রোয়ায় (কোষে কোষে) যায় (চলে যায়), মানুষ না জাইনা বিষ খাইতেছে।

গারোবাজারের আরেক কৃষক জুলহাস উদ্দিন বলেন, বর্তমানে এ ব্যবসায় কাঁঠাল পাকানোর ফলে নষ্ট হতে চলেছে ঘাটাইলের কাঁঠালের সুনাম। পাশাপাশি কাঁঠালের বাজার হচ্ছে মন্দা এবং ন্যায্যমূল্য হতে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।

শালিয়াবহ গ্রামের আনোয়ার হোসেন বললেন, অন্য বিষ খাইলে মানুষ বাঁচে কিন্তু এইডা খাইলে আর বাঁচে না। প্রায় ছয় বছর আগে সিংহেরচালা গ্রামের আজীম মিয়ার স্ত্রী কাঁঠাল পাকানোর এই মেডিসিন (ইথিফন) খেয়েছিলেন, হাসপাতালে নিয়ে সব চিকিৎসা করার পরও তিনি মারা গেছেন।

উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, বেশি লাভের আশায় অনেকেই অপরিপক্ক কাঁঠাল বাজারে আনতে শুরু করেছেন। এসব কাঁঠালে যখন রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে পাকানো হয় তখন এর স্বাদ-গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বললেন, ১৬ লিটার পানির মধ্যে ৫০ মিলি হচ্ছে সহনীয় মাত্রা। উচ্চ মাত্রায় এ ধরনের পদার্থের ব্যবহার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, এক লিটার পানির মধ্যে ১০০ মিলি ব্যবহার করে তা কাঁঠালে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

গারোবাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী সরকার ট্রেডার্সের মালিক মুনতাজ সরকার বলেন, ফল পাকানোর জন্য ইথিফনের ব্যবহার সরকারিভাবে নিষেধ। ওই কেমিক্যালের গায়ে লেখা রয়েছে যে কোনও ধরণের ফল আগাম বাহির এবং গাছ বৃদ্ধির জন্য অনুমোদিত।

ঢাকা, কুষ্টিয়া, যশোর ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররা জানান, মৌসুম শুরুর আগেই বেশি লাভের আশায় তারা কাঁঠালে রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে থাকেন। ৫০ টাকার একটি কাঁঠাল ঢাকায় দুইশ থেকে আড়াইশ টাকায় বিক্রি করা যায়।

তারা জানান, ঢাকা শহরে কেউ কাঁচা কাঁঠাল কিনতে চায় না। সবাই পাকা চায়। তাই সবগুলোতে মেডিসিন দিতেই হয়।

গারোবাজার বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, এ বছর কাঁঠালের মৌসুম শুরু হয়েছে একটু দেড়িতে। তবে কচি কাঁঠালে বিষাক্ত রাসায়নিক দেয়া শুভ লক্ষণ নয়। এর প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে উপজেলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান বলেন, ফল পাকানোর জন্য ইথিফন নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার খুবই ক্ষতিকর। এর ফলে ফুসফুস, হার্ট এবং কিডনিতে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইউএনও অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। এখন জানতে পারলাম। অচিরেই এ ধরণের অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এসএস

RTV Drama
RTVPLUS