logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

স্টাফ রিপোর্টার, ফরিদপুর, আরটিভি নিউজ

  ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৮:০২
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৮:২৩

আড়িয়াল খাঁ নদের ড্রেজিং করা বালু বিক্রি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ

Allegations of irregularities, in the sale of dredged, rtv news
ছবি আারটিভি
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নাসিরাবাদ ইউনিয়নের কোষাডাঙ্গা গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদে ড্রেজিং করে উত্তোলন করা লাখ লাখ ঘন ফুট বালু নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মানুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে পাঁচ থেকে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকার কথা। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি লিজ নিয়ে সেখানে বালু ফেলা হচ্ছে আর এরইমধ্যে শত শত ট্রাক বালু বিক্রি করে দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিদের পক্ষ হতে বিষয়টি নিয়ে উপজেলার পরিষদে এক সভায় উত্থাপনের পরে সকলের নজরে আসে বিষয়টি। এই নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদের নাব্য রক্ষায় প্রায় তিনশ কোটি ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ওই প্রকল্পের আওতায় ভাঙ্গার কোষাডাঙ্গা গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদের ১৩শ মিটার খননের কাজ শুরু করে একোয়া মেরিন ড্রেজিং নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

একোয়া মেরিন ড্রেজিং কোম্পানির সাইট ম্যানেজার ওমর ফারুক জানান, গত তিন মাস আগে থেকে তারা দুটি ড্রেজিং মেশিন বসিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদে ড্রেজিং কাজ শুরু করেন। এপর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হয়েছে। একটি ড্রেজিং মেশিন দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১০ হাজার ঘন ফুট বালু উত্তোলন করা হয়। এপর্যন্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়িয়াল খাঁ নদের পাশেই কোষাডাঙ্গা গ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় ৩৩ বিঘা জমিতে এসব বালু ঢিবি করে রাখা হয়েছে। আর এসব বালি হতে নিষ্কাশিত পানির তোড়ে বসতি জমি, কবরস্থান ধসে গেছে। গাছপালা ও ফসলাদি মরে যাচ্ছে। এসব নিয়ে গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ। তারা কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসব বালু রাখার জন্য তাদের কাছ থেকে বাৎসরিক ভিত্তিতে এসব জমি লিজ নিয়েছেন। ওই গ্রামের লতিফ ফকির জানান, তার তিন ফসলী দুই বিঘা জমি ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে ইউএনও এবং এসিল্যান্ড সাহেব লিজ নিয়েছেন। অনেকে এখনও লিজের টাকা পাননি। এদিকে অনেকের অভিযোগ তাদের জমিতে বালু ফেলা হয়েছে, লিজতো দূরে থাক তাদের জানানোও হয়নি। প্রতিবাদ জানাতে গেলে তাদের এসিল্যান্ড ও ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নিয়মানুযায়ী ড্রেজিং করে উত্তোলন করা এসব বালু ফেলার স্থান নির্ধারণ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাই উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পক্ষে জমি লিজ নেয়ার সুযোগ নেই। তবে তারা বালি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হিসেবে মধ্যস্থতা করতে পারেন। সরকারের প্রয়োজন ছাড়া বিনা টেন্ডারে এসব বালু বিক্রি করা বা সরানো নিষেধ।

নাসিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বালি ব্যবস্থাপনা কমিটি করলে, নিয়মানুযায়ী সেখানে আমারও থাকার কথা। কিন্তু এসব বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন বা পানি উন্নয়ন বোর্ড কেউই আমাকে কিছু জানায়নি। তিনি জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাদের নিজ উদ্যোগে এসব জমি লিজ নিয়ে বালু রাখছেন। এরই মধ্যে ১০ চাকার ট্রাক ও ড্রাম ট্রাকে ভরে কয়েকশ’ ট্রাক বালিও বিক্রি করা হয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে গত মাসের জরুরি উন্নয়ন সমন্বয় সভায় আলোচনা পর জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের সহকারী পরিচালকের (ডিডিএলজি) কার্যালয় থেকে আমার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে, পুরো বিষয়টি লিখিতভাবে আমি তাদের জানিয়েছি। তিনি আরও জানান, তার ৭ বিঘা জমির ওপর বালু রাখা হয়েছে। অথচ কেউই তার অনুমতি নেননি। এমন অনেকের জমি নেয়া হয়েছে, যাদেরকে জানানো পর্যন্ত হয়নি। খোঁজ নিতে গেলে, ড্রেজিং কোম্পানির লোকজন বলে, এসিল্যান্ড ও ইউএনওর সঙ্গে কথা বলতে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে এসবের প্রতিকারে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন, এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এসিল্যান্ড ও ই্উএনও আমার বস। তাদের সঙ্গে আমি কিভাবে প্রতিবাদ করবো।

এ ব্যাপারে জানতে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুর রহমান খানের কার্যালয়ে গেলে তিনি কোনও বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তবে উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি এসব বালি বিক্রির জন্য বালি ও মাটি বিক্রির একটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।

এই বিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা আছে। স্থানীয়রা তার কাছে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েছেন। এমপি নিক্সন চৌধুরী ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসনের নদী ভাঙন রোধে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছেন। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই তিন উপজেলার নদী শাসনের জন্য প্রায় ছয়শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। সেই কাজে আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে উত্তোলিত বালু স্থানীয় বাসিন্দাদের ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। লিজ নেয়ার কথা বলে তাদের লিজের টাকাও দেয়া হয়নি। বালু তোলার পরে সেই বালু, পানি স্থানীয়দের বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ছে। তাদের ঘড়-বাড়ি, গাছপালা ভেঙে পড়ছে, ফসলী জমিতে গিয়ে চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আবার সেখান থেকে গত কয়েক মাস যাবত বালু বিক্রি হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অ্যাসিল্যান্ড সাহেব এটা কিভাবে করছে। কোন নিয়মে করছে তা আমার জানা নেই। কিন্তু এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে ইউএনও সাহেব অসৌজন্যতা মনে করেন। তারা মনে করেন এটা তাদের এখতিয়ার। চেয়ারম্যান কেন জানতে চাবে। তাই অনেক বিষয়েই আমাদের কথা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা জনপ্রতিনিধি। জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হয়। তিনি এসময় সাংবাদিকদের উল্টো প্রশ্ন করেন, আপনাদের মাধ্যমে আমরা জানতে চাই এই কয় মাসে যে বালু বিক্রি হয়েছে, তার টাকা কি সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে?

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, যতদূর জানি এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে। তদন্তাধীন বিষয়ে তিনি আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহামুদ জানান, ড্রেজিং করা বালু বা মাটির মালিক সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং এসিল্যান্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব জমি নেই, তাই ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের মাধ্যমে হুকুম দখল করে স্বল্প সময়ের জন্য জমিগুলোতে বালু ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের যে সমস্যার কথা বলছেন তা আমাদের জানা আছে, স্থানীয়দের সমস্যার সমাধান করেই কাজ করা হবে।

জেবি

RTVPLUS