logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পুকুরে মুক্তা চাষে সাফল্য পেতে যাচ্ছে তারেক 

Tareq is going to get success in pearl cultivation in the pond
পুকুরে মুক্তা চাষ
প্রাচীনকাল থেকে মুক্তার প্রতি মানুষের কতই না আকর্ষণ! শখের বশে তাই এর চাষ শুরু করেছিলেন তারেক। চেয়েছিলেন আভিজাত্য ছড়ানো এই রত্নটির চাষ করে সবাইকে চমকে দিতে। নিজের বাড়ির পুকুরে তাই মাছের পাশাপাশি এই মুক্তা চাষও শুরু করেছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কালিচরণপুর গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাজ্জাদুর রহমান তারেক।

শখ থেকেই পল্লবিত হয়েছে সাজ্জাদুর রহমানের স্বপ্ন! এখন তিনি পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে নেমেছেন মুক্তা চাষে। মুক্তা উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য ক্ষেত্রে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

গহনা হিসেবে মুক্তার কদর রয়েছে বিশ্বজুড়ে। প্রাকৃতিক মুক্তার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে পুকুরে ঝিনুকে মুক্তা চাষ শুরু হয়েছে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলিপুর ইউনিয়নের কালিচরণপুর গ্রামে মাছের চাষের সাথে মুক্তা চাষ করে সাফল্য পেতে যাচ্ছেন সাজ্জাদুল রহমান তারেক।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন সাজ্জাদুর রহমান তারেক। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন তিনি। রসায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ফরিদপুর থেকে। এমবিএ করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনে। ল্যান্স করপোরাল পদে কর্মরত অবস্থায় তারেক ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। দেড় বছর আগে নিজেদের এক একর আয়তনের পুকুরে মাছের পাশাপাশি মুক্তা চাষের উদ্যোগ নেন।

সাজ্জাদুর রহমান তারেক জানান, মুক্তা চাষকে প্রসারিত করার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে তার। এর মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থান হবে, বেকারত্ব দূর হবে। মুক্তা জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করা যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে মুক্তার সুন্দর ডিজাইন হয়। বিদেশে এর প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। 

তিনি আরও জানান, আপাতত তার সঙ্গে একজন কাজ করছেন। তবে বড় আকারে চাষাবাদ করতে গেলে প্রচুর শ্রম দিতে হবে। আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে এর ফল পাওয়া যাবে। জেলা মৎস্য অফিস থেকে এ ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। মুক্তা চাষে জেলার অন্য কেউ এগিয়ে এলে তিনিও তাদের সহযোগিতা করবেন।

সাজ্জাদুর রহমান তারেক জানান, তাদের গ্রামে অনেক পুকুর। মৎস্যগ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিত। গার্মেন্ট ও কনজুমার ব্যবসার সুবাদে প্রায়ই ভারতে যাতায়াত করতে হয় তাকে। ভারতের এক বন্ধুর পরামর্শে দেড় বছর আগে তিনি শখের মুক্তা চাষে উৎসাহিত হন। তখন রংপুর, নীলফামারী ও কুয়াকাটা গিয়ে মুক্তাচাষিদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে ধারণা নেন। পরে ভারতের মুক্তা গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে মুক্তা চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেন। দেড় বছর আগে বাড়ির পাশে নিজের পুকুরে মাছের পাশাপাশি মুক্তা চাষের অনুশীলন শুরু করলেও ছয় মাস আগে মাঠে নেমেছেন সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভাবে। রাজবাড়ী জেলায় তিনিই প্রথম মুক্তা চাষ শুরু করেছেন।

চলতি বছরের মার্চ মাসে বাণিজ্যিকভাবে মাছের সাথে মুক্তা চাষ শুরু করেন তিনি। নিজের এক একর আয়তনের পুকুরে ১৪ হাজার ঝিনুকে মুক্তা চাষ করেছেন তারেক। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তা রপ্তানি করা যাবে বলে প্রত্যাশা তার। এরই মাঝে দেশ-বিদেশের বেশ কিছু কোম্পানি তার সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে।

তিনি জানান, মিঠা পানিতে তিনি সাত হাজার ঝিনুকের মধ্যে ১৪ হাজার মুক্তা চাষ করছেন। একেকটি মুক্তার জন্য প্রয়োজন হয় একেকটি নিউক্লিয়াস, যা ভারত থেকে কেনা হয়। এই নিউক্লিয়াস ইনজেকশনের মাধ্যমে ঝিনুকের মধ্যে ইনজেক্ট করা হয়। ইনজেক্ট করা ঝিনুক একটি কক্ষে সাত থেকে ১০ দিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। ঝিনুকগুলো বাঁচিয়ে রাখতে দিতে হয় বিশেষ ওষুধ। তার পরও কিছু ঝিনুক মরে যায়। বেঁচে থাকা ঝিনুকগুলো জালের মধ্যে ঢুকিয়ে বোতল দিয়ে বেঁধে পুকুরে ফেলা হয়; যাতে ঝিনুক মাটিতে না পড়ে যায়। এভাবে এক বছর রাখার পর ঝিনুকের মধ্যে পরিপূর্ণতা পায় মুক্তা। প্রতিটি ঝিনুকের জন্য খরচ হয় ১০০ টাকা। যেহেতু গ্রোথ ভালো হচ্ছে, এজন্য তিনি ঝিনুক থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই মুক্তা সংগ্রহ করার আশা করছেন।  

সাজ্জাদুল রহমান তারেক আরও জানান, ২০১৮ সালের দিকে আমি ভারতের একটি মুক্তা গবেষণা কেন্দ্র (সেপা) থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এরপর স্বপ্ন দেখি নিজের পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি মুক্তা চাষের। ২০১৯ সালের ১৪ হাজার ঝিনুকের মাঝে মুক্তা চাষ শুরু করি। প্রথমে স্থানীয় বিভিন্ন পুকুর থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করি। এরপর ঝিনুকের মধ্যে ডাইস স্থাপন করা হয়। তারপর টিস্যু প্রতিস্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের নিউক্লিয়াস পদ্ধতিতে মুক্তা চাষ শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, ঝিনুক সাধারণত শীতকালে পাওয়া যায়। তবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকায় তারেক স্থানীয়ভাবে এক লাখ ঝিনুক সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করছেন আগামী বছর চাষ করার জন্য। মুক্তা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাড়তি কোনো খরচ বা ঝুঁকি নেই। মাছের দেওয়া খাবার খেয়েই বেঁচে থাকে ঝিনুক। বর্ষায় পুকুর ভেসে গিয়ে মাছের ক্ষতি হতে পারে; কিন্তু ঝিনুক ভেসে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

বিদেশ থেকে ডাইস ও নিউক্লিয়াস সংগ্রহ করে মুক্তার চাষ আরও বৃদ্ধির কাজ চলছে। প্রথমে ৯ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তার চাষ শুরু করি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে আমার মুক্তা পরিপক্কতা পাবে। ১৪ হাজার ঝিনুকের মধ্যে কিছু ঝিনুক মারা যায়। যেখান থেকে মুক্তা তৈরি হয় না। পরিচর্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমার পুকুরের ১০ শতাংশ ঝিনুক মারা গেছে। বাজার মূল্য হিসেবে প্রতিটি মুক্তার দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। আমি প্রত্যাশা করছি আগামী ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ২৫ লাখ টাকার মুক্তা বিক্রি করতে পারবো।

আলিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শওকত হাসান বলেন, আমি খোঁজ-খবর রাখছি সাজ্জাদুলের মুক্তা চাষ নিয়ে। এখন যে পর্যায়ে রয়েছে আগামী ফেব্রুয়ারি বা মার্চে সে ব্যাপক লাভবান হবে। সে আর্থিকভাবে লাভবান হলে আলিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন পুকুরে মৎস্য চাষের পাশাপাশি মুক্তার চাষ শুরু করা হবে। 
তারেকের চাচা আমিনুর রহমান জানান, মুক্তা চাষের পেছনে তারেক প্রচুর শ্রম দিচ্ছে। তার স্বপ্ন সফল হলে রাজবাড়ী জেলার মানুষের উপকার হবে। অন্যরা মুক্তা চাষে এগিয়ে আসবে। বেকারত্ব দূর হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, আমি এখানে যোগদানের পর সাজ্জাদুল রহমান তারেকের মুক্তা চাষের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছি। আমরা মৎস্য বিভাগ থেকে তাকে পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছি। তারেকের স্বপ্ন বাস্তবের পথে রয়েছে। রাজবাড়ী জেলায় সাজ্জাদুর রহমান তারেকই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মুক্তা চাষ করছেন। বিশ্বব্যাংক তাকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে রাজবাড়ী মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে। আলীপুরসহ রাজবাড়ীতে বেশ কিছু পুকুরে দ্রুত সময়ে মুক্তা চাষ শুরু করা হবে। আগ্রহী যে কাউকে জেলা মৎস্য অফিস থেকে এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
পি


 

RTVPLUS