logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পাবনা মানসিক হাসপাতালের যতো কথা

As far as Pabna Mental, Hospital, rtv news
পবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীরা
সিভিল সার্জন গাংগুলীর স্বপ্নই ছিল পাবনায় একটি মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা প্রথম ধাপ। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাবনা জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী স্বপ্ন দেখেছিলেন এই হাসপাতালের। তিনি ছিলেন বরিশালের মানুষ কিন্তু স্বপ্ন দেখেছেন পাবনার জন্য। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আজও তার নামটি লেখা আছে হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা বোর্ডে। ১৯৫৭ সালের শুরুর দিকে প্রথমে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে। প্রথম বছরেই পাবনা মানসিক হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছিল ৮০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ৪০ জন। এরপর ধীরে ধীরেই হাসপাতালের এগিয়ে চলা। হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মকর্তা ব্রজ গোপাল সাহা শোনালেন সিভিল সার্জন গাংগুলীর স্বপ্ন সফলতার সেই গল্প।

হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই হাসপাতালের মূল অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। পাবনা সদর উপজেলার হিমাইতপুর ইউনিয়নের হিমাইতপুর গ্রামে অধিগ্রহণ করা হয় ১১১ দশমিক ২৫ একর জমি। বিশাল এলাকাজুড়ে শুরু হয় নির্মাণ কাজ। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৫৯ সালে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানালেন, অধিগ্রহণ করা জমির সিংহভাগই ছিল পাবনার আধ্যাত্মিক সাধক শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের। জমি অধিগ্রহণের সময় তিনি ভারতে ছিলেন। ফলে অধিগ্রহণের অর্থ তার ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছিল।

হাসপাতালের রোগী সেবার তথ্য থেকে জানা গেল, ১৯৫৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আবাসিকে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৪৪৪ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৬ হাজার ৭৯০ জন। বর্হির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা আরও বেশি। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে নারী ছিলেন  এক লাখ ৫১ হাজার ৩৮৯ জন, পুরুষ এক লাখ ২৪ হাজার ১৬৭ জন।

৬০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল পাবনা মানসিক হাসপাতালের। ১৯৬৬ সালে প্রথম দফায় শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ ও পরে ২০০টি করা হয়। ১৯৯৬ সালে শেষ দফায় ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয় হাসপাতালটিকে। এর মধ্যে ১২০টি পেয়িং ও ৩৮০টি সাধারণ শয্যা রয়েছে। চিকিৎসা হয় অন্তর্বিভাগে, বহির্বিভাগ ও বিনোদনমূলক নামে এই তিন বিভাগে। অন্তর্বিভাগে ৪০০ পুরুষ ও ১০০ নারী চিকিৎসা নিতে পারেন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০ জন রোগী চিকিৎসা পরামর্শ নেন।

বছরের পর বছর যুগের পর যুগ মানসিক হাসপাতালেই কেটে যাচ্ছে এ রকম রোগী রয়েছেন ২১ জন। তারা শুধু প্রতীক্ষা করেন কেউ তাদের ঠিকই একদিন নিতে আসবে। কিন্তু তাদের কেউ আর নিতে আসে না। অনেকেই প্রতীক্ষা করতে করতে এখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০১৫ সালে এরকমভাবে মারা গেছেন দুজন।

সাইদ হোসেন। হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার অনুযায়ী তাকে ১৯৯৬ সালে ভর্তি করেন তার স্বজনরা। তিনি অনেক আগে সুস্থ হলেও কেউ তাকে নিতে আসেননি। তাই তিনি বছরের পর বছর হাসপতালে বন্দি থাকার মতো থেকে অনেকটা অথর্ব হয়ে গেছেন।

এছাড়া বর্তমানে দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতাল কনসালটেন্ট ও ক্লিনিক্যাল সাইক্রিয়াটিস্ট ছাড়াই চলছে। পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতালে ৩০ জন চিকিৎসক পদের মধ্যে ১৭ জনের পদই শূন্য। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), অ্যানেসথেটিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, বায়োক্যামিস্ট, ডেন্টাল সার্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক ছাড়াই চলছে এ মানসিক হাসপাতাল। সীমিত চিকিৎসক ও জনবল দিয়েই যথাসম্ভব সেবা দেয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালটির জন্য ৩০ চিকিৎসকসহ মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৬৪৩। ১৩ চিকিৎসকসহ কর্মরত ৪৫৩ জন এবং শূন্য রয়েছে ১৯০টি পদ। জনবলের অভাবে এখন নিজেই ধুকছে হাসপাতালটি। শুধু তাই নয়, ৫০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য অনুমোদন রয়েছে মাত্র ২০০ শয্যার হাসপাতালের জনবল। এই ২০০ শয্যার জনবলের জন্য প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের যে ৩০টি পদ মঞ্জুর আছে তার মধ্যে আবার ১৭টি পদই শূন্য। অন্যান্য কর্মকর্তা এবং কর্মচারী পদেও একই অবস্থা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, জরুরি ভিত্তিতে সিনিয়র কনসালটেন্ট, ক্লিনিক্যাল সাইক্রিয়াটিস্ট, মেডিকেল অফিসার দ্রুত নিয়োগ করা না হলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

হাসপাতালের অবকাঠামো বলতে সবই আছে। দ্বিতল হাসপাতাল ভবন, বহির্বিভাগ, প্রশাসনিক ভবন, বিনোদন বিভাগ, রান্নাঘর, ধোপাঘর, সিনেমা হল, হস্তশিল্প ভবন, তাঁতশিল্প ভবন, ওষুধ ও মালামাল সংরক্ষণ ভান্ডার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন ও কটেজ মিলিয়ে মোট ৫৩টি ভবন রয়েছে। তবে অধিকাংশই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। বর্তমানে ব্যবহৃত ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

অবকাঠামো জরাজীর্ণ, পাশাপাশি চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটে ভুগছে হাসপাতাল। লোকবল সংকটের কারণে হাসপাতাল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কিছু যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালানোর লোক নেই।
তবে আনন্দের সংবাদ হলো বহির্বিভাগের রোগীদের হাসপাতাল থেকেই এখন এক থেকে দুই মাসের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ ওষুধ বহনের জন্য রোগীর স্বজনদের সরবরাহ করা হচ্ছে হাসপাতালের তৈরি ব্যাগ, যা তৈরি করছেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নারীরা।

পাবনা মানসিক হাসপাতালে অকুপেশন থেরাপিস্ট পদে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে। পুরো নাম ব্রজ গোপাল সাহা। এই হাসপাতালের মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে আছেন তিনি। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। তবে হাসপাতালের সবার কাছে কালা দা নামে পরিচিত। দায়িত্ব ছিল রোগীদের বিনোদন ও খেলাধুলার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া। ২০০০ সালে চাকরি থেকে অবসর পেয়েছেন। কিন্তু এখনও ছাড়তে পারেননি হাসপাতালের মায়া। ব্যক্তিগত জীবনে সংসারও পাতেননি মানুষটি। সারা দিন হাসপাতালেই কাটান। ভালো-মন্দ দেখভাল করেন। রোগীদের সঙ্গে গল্প, আড্ডায় মেতে থাকেন। তাদের বিভিন্ন বিনোদন দিয়ে সুস্থ রাখার চেষ্টা করেন।

কথায় কথায় বহু গল্প বলেন ব্রজ গোপাল সাহা। তিনি যখন কর্মজীবনে ছিলেন, তখন হাসপাতালের চিত্র ছিল ভিন্ন। নিয়মিত রোগীরা খেলাধুলা করতে পারতেন। বিনোদনের জন্য একটি সিনেমা হল ছিল (বর্তমানে মিলনায়তন)। কিন্তু অর্থাভাবে অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে চাকরি না থাকলেও তিনি এই বিনোদনের কিছু ধারা অব্যাহত রেখেছেন। শুধু মায়ার টানে বিনা পারিশ্রমিকে রোগীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন। নিয়মিত খেলাধুলার উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্রজ গোপাল সাহা আরও বলেন, হাসপাতালের প্রত্যেক রোগী আমার স্বজন। এই চত্বর আমার বাড়ি। তাই হাসপাতাল ছেড়ে যেতে পারি না।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম মোর্শেদ আরটিভি নিউজকে জানান, এখানে কোনও চিকিৎসকের পোস্টিং দেয়া হলেই তিনি বা তারা মনে করেন তাকে ‘শাস্তি’ দেয়া হলো। ফলে এখানে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসক সঙ্কট রয়েই যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এক হাজার শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া রয়েছে। কিন্তু এসব ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

চিকিৎসকের সংখ্যা যেখানে বাড়ানো দরকার সেখানে অনুমোদিত ৩০ জন চিকিৎসকের মধ্যে ১৭ জন চিকিৎসকের পদ শূন্য মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক দিয়েই চলছে হাসপাতাল। এর মধ্যে পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ককে প্রশাসনিক কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। সেদিক দিয়ে হিসাব করলে চিকিৎসক আরও কম।

চিকিৎসকের পদ ছাড়াও প্রথম শ্রেণির আটজন কর্মকর্তা পদের মধ্যে চারজনের পদ শূন্য। অন্যদিকে দ্বিতীয় শ্রেণির ৩১৬টি পদের মধ্যে ২৭৫টি পদ শূন্য, তৃতীয় শ্রেণির ১১৯টি পদের মধ্যে ৮৮টি ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ১৭০টি পদের মধ্যে ৯৭টি পদ শূন্য। এতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

২৬৪ জন সিনিয়র নার্সের পদ থাকলেও বর্তমানে শূন্য রয়েছে ১৬টি পদ। স্টাফ নার্সের ৪৫ জনের মধ্যে ২২টি পদ শূন্য। কর্মরত এ নার্সদের আবাসিক কোনও ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালটি শহর থেকে দূরে হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবহনের জন্য নেই কোনও যানবাহন। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের (সুইপার) সংখ্যা অপ্রতুল। সুইপারের ৩০টি পদের মধ্যে ১৭টি পদ শূন্য। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত এ হাসপাতালের এমন অবিশ্বাস্য করুণ অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সুতরাং এ হাসপাতালকে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনেক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। হাসপাতালটির সেবার মান আরও উন্নত করতে হলে এখানে চিকিৎসক এবং কর্মচারীদের শূন্যপদ পূরণ জরুরি।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসক ছাড়াও হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও বিরাট প্রয়োজন। রোগীদের গোসল, খাওয়া-দাওয়া, পায়খানা-প্রস্রাব করানো ও পরিষ্কার করার কাজে পর্যাপ্ত কর্মচারী ও সুইপার প্রয়োজন। সমৃদ্ধ হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছি। মানসিক হাসপাতাল সাধারণ হাসপাতালের মতো নয়। এখানকার চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে শুরু করে সবকিছুই আলাদা। ফলে জনবল বেশি প্রয়োজন হয়। কিন্তু জনবল সংকট এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক কাজই সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না।

হাসপাতাল ক্যাম্পাস জঙ্গলে ভরে উঠলেও পরিষ্কার করার মানুষ নেই। এছাড়া ভবনগুলো পুরানো হয়ে গেছে। বৃষ্টির দিনে অনেক কক্ষে পানি ঢোকে। এতে রোগীদের সমস্যা হচ্ছে। এর মধ্যেই আমরা হাসপাতালকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করছি। রোগীদের প্রতিটি কক্ষে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সারাক্ষণ গান শুনতে পারেন। রয়েছে টেলিভিশন, পছন্দমতো অনুষ্ঠান দেখেন সবাই। এছাড়া হাসপাতালের চারপাশ নজরদারিতে রাখার জন্য সম্প্রতি ১০৭টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। লোডশেডিংয়ের সময় হাসপাতাল যাতে অন্ধকারে না থাকে, সে জন্য ৪৮টি সোলার বাতি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে সোলার লাইট লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রোগীদের জন্য একটি লাইব্রেরি তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে।

নারী রোগীদের সুন্দর অবকাশ কাটানোর জন্য একটি ছোট্ট পার্ক ও হ্যান্ডবল খেলার জন্য একটি কোর্ট তৈরি করা হয়েছে। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা পাবনা মানসিক হাসপাতালকে একটি সমৃদ্ধ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।
সমস্যায় জর্জরিত এই হাসপাতাল তবু মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য। এখনও বিশাল করিডরের এই হাসপাতালের সবুজ চত্বরে ঢুকলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

জেবি

 

 

 


 

RTVPLUS