কুড়িগ্রামে থামছেই না বাল্যবিবাহ! (ভিডিও)

প্রকাশ | ০৩ নভেম্বর ২০২০, ১৮:৩০ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২০, ১৮:৪৫

ফাইল ছবি

প্রতিদিন ঘটেই চলছে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নামক বাল্যবিবাহ। যে কিশোরী বই হাতে নিয়ে স্বপ্নের আকাশে নিজের ভবিষ্যৎকে দেখার কথা, সেই কিশোরী দিন বা রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে ভয়ানক বাল্যবিবাহের জালে। 

দেশ যখন অর্থনীতির মুক্তির জয়গানে বিজয়ী দল। সেসময় কুড়িগ্রামে থামছে না বাল্যবিবাহে। দিন দিন বেড়েই চলছে এ সামাজিক ব্যাধির পরিসংখ্যান। চলমান করোনাকালে বাল্য বিয়ের হার বেড়েছে কয়েকগুণ। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে মেয়েদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে প্রতিকুল পরিবেশ, রয়েছে দরিদ্রতার সঙ্গে সামাজিক সমালোচনা। প্রভাব রয়েছে যৌতুকের অংকে। এসব চিন্তা থেকেই মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে বাবা-মা’র নিজেদের বোঝা হালকা করছেন বলে অভিমত অনেকের।

বাল্যবিবাহের পর থেকেই সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এসব মেয়েরা হয়ে পড়ে কিশোরী মাতা। অপুষ্টিতে ভুগে হারিয়ে ফেলে শারীরিক সক্ষমতা। বৃদ্ধিপায় পারিবারিক কলহ। শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ বালিকাবধূর সংসার ভাঙে বিবাহ বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। পুনরায় বোঝা হয়ে ফিরে আসে পরিবারের মাঝে। 

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের রাঙ্গালিরকুটি গ্রামের আলিম উদ্দিন এবং সাজেদা বেগমের ১২ বছরের মেয়ে আরিফা খাতুন, পঞ্চম শ্রেণি পার করে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই করোনার প্রভাবে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িতে অলস বসে থাকা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মেয়ের অনুকূলে নয় এমন শঙ্কায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিয়ে দেয়া হয় তাকে। 

আরিফার মা সাজেদা বেগম জানান, করোনার জন্য স্কুল বন্ধ। মেয়ে বাড়িতে অলস বসে থাকে। এ বাড়ি ও বাড়ি যায়। সমাজের পরিবেশ মেয়ের অনুকূলে নয় এমন সংশয়ে তাকে বিয়ে দিয়েছেন। বিয়েতে কাজি ছিল তবে মূল রেজিস্টারে নিবন্ধন হয়নি। পরবর্তীতে কিছু টাকা পয়সা খরচ করে রেজিস্টার করে নিবে বলে তিনি জানান।

একই মাসে প্রথম সপ্তাহে একই উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের পাগলার হাট গ্রামের হামিদুল মিয়া এবং একই ইউনিয়নের শালঝোড় গ্রামের ফজলমিয়ার মেয়ে পূর্ণিমা খাতুনের বিয়ে হয়। হামিদুলের বয়স ১৮ এর কোটা পার হয়নি আর পূর্ণিমা কেবলমাত্র পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাল্যবিবাহ নিষেধ হলেও রীতিমতো মাইক বাজিয়ে, পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনদের নিমন্ত্রণ দিয়ে বৌ-ভাতের আয়োজন করে সম্পন্ন হয়েছে তাদের বিয়ে। ৮০ হাজার টাকা যৌতুক নেয়া হলেও নিবন্ধন হয়নি  তাদের বিয়ের। 

বরের বাড়িতে বৌ-ভাতের আসরে কনে পূর্ণিমা জানায়, সে সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। তবে এ বিয়েতে তার আপত্তি ছিল না। বর হামিদুল জানান, ৮০ হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে তাদের বিয়ে হয়েছে। তবে যৌতুকের টাকার বড় অংশ বাকী রয়েছে। পরিবারের লোকজন বাল্যবিবাহের বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তবে তাদেরও রেজিস্টার হয়নি বলে জানান তারা। 

এলাকাবাসী জানায়, এরকম বাল্যবিবাহ অহরহ হচ্ছে। কখনো মেয়েদের প্রতিকূল পরিবেশ, কখনো যৌতুক, কখনো দরিদ্রতা এবং অসচেতনতা উপর দায় চাপিয়ে এই রকম ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আরও এসব বিয়ে সংগঠিত হওয়ার পেছনে স্থানীয় নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীদের একটা ভূমিকা রয়েছে।

তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভুয়া রেজিস্ট্রার করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিবাহ নিবন্ধনের মূল বহিতে (খাতা) না উঠলেও কাজীদের উপস্থিতে ঘটে থাকে এসকল বিয়ের ঘটনা। কাজীদের নিকট বিকল্প বহি (খাতা) থাকে সেই খাতায় সান্ত্বনা স্বরূপ নাম ঠিকানা লিখে রাখেন কাজী। ঝামেলা না হলে সময় বুঝে (মেয়ের বয়স হলে) পরবর্তীতে মূল রেজিস্ট্রারে তুলে নেন। তবে এ প্রক্রিয়ায় যেতে মেয়ে পক্ষকে গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাজীর একজন সহকারী জানান, বিয়ে বাড়ির ডাক পেয়ে আসরে গিয়ে দেখা গেল কনের বয়স কম। তখন আমরা ফিরে আসতে চাইলেও অভিভাবকদের আকুতিতে ফিরতে পারি না। তখন তাদেরকে রেজিস্ট্রার হবে না বললেও তারা মানেন না। পরে শান্তনা স্বরূপ অন্য বইয়ে নামঠিকানা লিখে নিয়ে আসি। এটার কোনও আইনি ভিত্তি নাই।  

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর বিল্ডিং বেটার ফর গার্লস প্রকল্পের জরিপে উঠে এসেছে কুড়িগ্রামের বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ মাসে এ জেলায় বাল্যবিবাহ হয়েছে ২ হাজার ৬০৩টি। বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে ৯৬১টি। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাল্যবিবাহ হয়েছে ৩৩৯টি এবং বন্ধ হয়েছে ৭১টি। শুধু আগস্ট মাসে ৪৭টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে ১১টি।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান জানান, বল্যবিবাহ কোনক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না। করোনাকালে আগের চেয়ে বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধি হয়েছে। এসব বিয়ে বন্ধে প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিরা বাধা দিলেও পরবর্তীতে গোপনে বিয়ে হয়ে যায়। একবার বিয়ে হয়ে গেলে মানবিক কারণে আর করার কিছু থাকে না।

কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাল্যবিবাহ রোধে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। ৯৯৯ অনেকে ফোন করে বাল্যবিবাহ তথ্য দিচ্ছে এবং সেখানে দ্রুত পুলিশ পৌঁছে যাচ্ছে এবং বিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে। এছাড়াও বাল্যবিবাহ রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতেও পুলিশ ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

জিএম/এসএস