logo
  • ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

করোনা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলছে সুন্দরবন, চিড়িয়াখানা (ভিডিও)

করোনা মহামারীর শুরুর দিকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হয়নি। তখন দেশের অন্য সব সেক্টরের মতো পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ ছিল। এখন স্কুল-কলেজ বাদে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত সকল সেক্টর খুলেছে। মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বের হচ্ছে। করোনার কারণে মানুষ দীর্ঘদিন বন্দি থাকায় মনের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মনে অস্বস্তিও ভর করেছে। আর এই অস্বস্তি ও মানসিক চাপ কমাতে আস্তে আস্তে দেশের সকল পর্যটক স্থান ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আগামীকাল রোববার থেকে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনস্পট সুন্দরবন ও দর্শনার্থীদের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানা খুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার দিকে তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে করোনার হানা এখনও কমেনি। বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। বাংলাদেশ এখনও করোনা সংক্রমণের গড় ১১ শতাংশের নিচে আসেনি। এমতাবস্থায় বিনোদন কেন্দ্রগুলো খুলে দিলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্বাস্থবিধি কঠোরভাবে পালনে দর্শনার্থীদের নির্দেশনা দিতে হবে।

জানা গেছে, পর্যটকদের জন্য আগামীকাল (১ নভেম্বর) সুন্দরবন খুলে দেয়া হচ্ছে। তবে যেসব পর্যটক সুন্দরবনে ঘুরতে আসবেন তাদের জন্য পাঁচটি শর্ত মানতে হবে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের পক্ষ থেকে ট্রলার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করে এ শর্ত জানানো হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত ২০ মার্চ জাতীয় চিড়িয়াখানা বন্ধ ঘোষণা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে দর্শনার্থীদের জন্য মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানা কাল (রোববার) খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। আর রাজধানীর ফুসফুস খ্যাত রমনা পার্ক গত মাসে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। রমনাপার্কে দর্শনার্থীদের জন্য সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়।

বিনোদনকেন্দ্র ও পর্যটনস্থান খোলার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন আরটিভি নিউজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে করোনা মহামারীর মধ্যেও সরকার কিছু কিছু উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ আগামীতে শীতের মৌসুম আসছে। এই শীত মৌসুমের আগেই স্কুল-কলেজ বাদে সবকিছু খুলে দেওয়ায় বয়স্ক মানুষদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আর বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, করোনা সংক্রমণের গড় এখনও ১১ ও ১২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিনোদন কেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো হয়নি। করোনার ভ্যাকসিন এলে বিনোদন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার ঠিক ছিল। দেশ থেকে করোনাভাইরাস ঠিকই চলে যাবে। কিন্তু বিনোদন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার কারণে করোনা দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।


হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আরটিভি নিউজকে বলেন, করোনা সংক্রমণ কমায় ইউরোপীয় দেশগুলোতে বিনোদনকেন্দ্র খুলে দেয়। পরবর্তীতে দর্শনার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেয়। আমার দেশে স্কুল-কলেজ বাদে সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতসহ সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিনোদন কেন্দ্রগুলো খুললে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। দর্শনার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বিনোদন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যেন বাধ্য করেন। দর্শনার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনোদন কেন্দ্রগুলো থেকেই ফের করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের পালনীয় শর্ত
১.চিড়িয়াখানায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে অমোচনীয় রঙ দিয়ে বৃত্তাকার স্থান চিহ্নিত করতে হবে, ২. প্রবেশ গেটে জীবাণুনাশক টানেল ও ফুটবাথ স্থাপন করতে হবে, ৩. প্রবেশ গেটে থার্মাল স্ক্যানারের সাহায্যে দর্শনার্থীর দৈহিক তাপমাত্রা চেক করার ব্যবস্থা করতে হবে, ৪. চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন ও সাবানের ব্যবস্থা রাখতে হবে, ৫. দর্শনার্থীদের জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে, ৬. দর্শনার্থীর সংখ্যা দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, ৭. প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর এনক্লোজারের চারপাশে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে, ৮. পরিদর্শন সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারিত রাখতে হবে, ৯. ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে এবং ১০. ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের চিড়িয়াখানায় প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখতে হবে।

চিড়িয়াখানার ভেতরে প্রবেশে দর্শনার্থীদের পালনীয় বিষয়
১. চিড়িয়াখানায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অমোচনীয় রঙ দিয়ে চিহ্নিত বৃত্তাকার স্থানে অবস্থান করতে হবে, ২. প্রবেশ গেটে স্থাপিত জীবাণুনাশক টানেল ও ফুটবাথ ব্যবহার করতে হবে, ৩. চিড়িখানার ভেতর প্রবেশের পর দিকনির্দেশক অনুসরণ করে একমুখী পথ ব্যবহার করতে হবে, ৪. বাধ্যতামূলকভাবে ফেস মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, ৫. চিড়িয়াখানায় খাবার নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না এবং ৬. চিড়িয়াখানার ভেতরে এক জায়গায় ভিড় বা জটলা করা যাবে না।

চিড়িয়াখানা দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, করোনাকালে ঢাকাবাসীর বিনোদনের উল্লেখযোগ্য বিকল্প না থাকায় তাদের বিনোদন এবং শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চিড়িয়াখানা খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে চিড়িয়াখানায় থাকা প্রাণীর খাদ্য, নিয়মিত পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সুন্দরবনে পর্যটক ও পর্যটক বহনে কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলো হচ্ছে, কোনও ট্রলারে ২০ জনের বেশি পর্যটক বহন করা যাবে না। পর্যটকরা খাদ্য ছাড়া অন্য কোনও পণ্য বহন করতে পারবে না। প্রতিটি ট্রলারে স্যানিটাইজ ও বর্জ্য ফেলার জন্য ঝুড়ির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনও ট্রলারে মাইক অথবা সাউন্ড বক্স ব্যবহার করা যাবে না।

অপরূপ সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি সুন্দরবনের দুয়ার খুলে দেওয়ায় স্থানীয় ট্রলার মালিক ও নৌকার মাঝিদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা নৌকা ও ট্রলার মেরামত করছেন তারা। ভ্রমণতরী বা লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হচ্ছে। কোনও কোনওটিতে করা হচ্ছে রঙের আলপনা।

প্রায় আট মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকার পর করোনাভাইরাসের মধ্যেও পর্যটকদের সাড়া পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন ট্যুর অপারেটররা। সহকারী বন সংরক্ষক সুলতান আহমেদ বলেন, ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে সেই অনুমতি পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগের নিয়ম অনুযায়ী ভ্রমণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন পর্যটকরা।

বুড়িগোয়ালিনী (নীলডুমরি) ঘাটের ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মণ্ডল বলেন, করোনায় দীর্ঘদিন সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকায় খোলার সিদ্ধান্ত আসা মাত্রই পর্যটকদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামীকাল (রোববার) সুন্দরবন খুলে দেওয়া হলে শতশত পর্যটক এখানে ঘুরতে আসবেন।
এফএ/পি


 

RTVPLUS