logo
  • ঢাকা বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

করোনা: ছুটিতে গৃহকর্মী, নতুন জীবনধারায় মধ্যবিত্তরা

করোনা, ছুটি, নতুন জীবনধারা, মধ্যবিত্ত
গৃহকর্মীর ছুটি, স্বামী-স্ত্রী মিলেই বেলছেন রুটি। ছবিতে- উত্তম রায় ও ফাল্গুনী মজুমদার।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বের দেশে দেশে চলছে লকডাউন। বাংলাদেশও পরিস্থিতির বাইরে নয়। 

এরই মধ্যে করোনা–পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে না আসায় সাধারণ ছুটি আরও বাড়িয়েছে সরকার। তাই করোনা আতঙ্কে ঘরের মধ্যে বন্দী আছে অনেকে। সচেতনরা খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেড় হচ্ছেন না। করোনা ভাইরাস ছোঁয়াচে হওয়ায় বাড়তি সতর্কতা হিসেবে প্রায় অনেক বাসায় গৃহকর্মীদের দেয়া হয়েছে ছুটি। আর এতেই  মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের জীবনে এসেছে বেশ পরিবর্তন। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান মিলে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন গৃহস্থালির কাজ। যা আগে তাদের হয়তো কখনও করতেই হয়নি। মাসখানেক ধরে এই ধরনের কাজে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তারা। জীবনে এসেছে নতুন মাত্রা। 

বেশকিছু পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসারে অতীতের অনেক অশান্তি কমে গেছে। বন্ধন মজবুত হয়েছে, চলছে মজার মজার অনেক খুনসুটি।

মনোবিদরা বলছেন, গৃহস্থালির কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ মানে সমাজের একটা ইতিবাচক পরিবর্তন। এটা অব্যাহত থাকলে সবার জন্য কল্যাণ হবে।

রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় অধিকাংশ পরিবারের চিত্র এখন পাল্টে গেছে। রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়াসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজ এখন ভাগাভাগি করে করছেন সবাই।

কথা বলেছিলাম রাজধানীর কল্যাণপুরের বাসিন্দা সাইমা জাহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বামী সন্তানসহ আমরা তিনজন বাসায় থাকি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। তবে লকডাউনের এই সময়টা মনে হচ্ছে যে অনেক আগের দিনগুলোকে পেয়েছি। ছেলেকে তার বাবা বেশি সময় দিতে পারছে। আবার ঘরের কাজগুলো একটু এগিয়ে দিচ্ছে। বাইরে যেমনই হোক সবমিলিয়ে বাড়িতেই সবাইকে নিয়ে ভালো সময় কাটছে আমাদের।’

মিরপুরের বাসিন্দা পারভীন আক্তার বলেন, ‘স্বামী, চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাসায় মনে হচ্ছে এক অন্য রকম জীবনযাপন করছি। অন্যান্য দিনে স্বামী, মেয়েরা অফিস আর ছেলেরা স্কুলে চলে গেলে আমার একা আর ভালো লাগতো না। লকডাউনে সবাই একসঙ্গে আছি সময় যেমন ভালো কাটছে তেমনি একাকীত্ব, মানসিক চাপও দূর হয়ে গেছে।’

একটি কর্পোরেট কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা উত্তম রায় এবং সরকারি কৃষি কর্মকর্তা ফাল্গুনী মজুমদার দম্পতি জানান, রান্না, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া দুজন ভাগাভাগি করে করছেন। কাপড় ধোয়ার দায়িত্ব বেশিদিন নিয়েছেন উত্তম রায়। এছাড়া একমাত্র সন্তানকে রাতে পড়ান উত্তম রায়, দিনে পড়ান ফাল্গুনী মজুমদার। শাশুড়িকে দেখাশোনার দায়িত্বও নিয়েছেন উত্তম রায়।

মোবাইল ফাইনালসিয়াল সার্ভিস কর্মকর্তা শাকিল মাহবুব ও রিয়া দম্পতি থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়। তারাও আগের রুটিন বদলে ফেলেছেন। শাকিল মাহবুব বলেন, আমি আমার ছোট ছেলেকে তিনবেলা খাওয়াই। ঘর মোছা, রান্না ও কাপড় ধোয়ার দায়িত্বও নিয়েছি। খাওয়া শেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও আমি করি।

সন্তানকে খাইয়ে দিচ্ছেন শাকিল মাহবুব। 

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান মাহবুব পারভেজ বলেন, ‘আমি এখন বাসার সব কাজ করি। সহধর্মিণীকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করি। আসলে এই সময়টাতে শরীরকে সচল রাখতে এই ধরণের কাজগুলো করা জরুরি। আমার একমাত্র ছেলেও এখন অনেক কাজ করে। সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

রান্না করছেন মাহবুব পারভেজ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুমিত আল রশীদ বলেন, ‘আমি এখন মা ও ভাইয়ের সঙ্গেই আছি। আমার সহধর্মিণী দেশের বাইরে। আমি চেষ্টা করছি এই সময়ে নিজের কাজ নিজে করার। ঘর পরিষ্কারের কাজ নিজেই করি।’

তবে পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট বিলকিস খানম বলেন, ‘যেহেতু আমাদের সমাজে গৃহকর্মের অধিকাংশ দায়িত্ব মূলত গৃহকর্তীর উপর বর্তিত থাকে তাই লকডাউনের এই সময়টাতে সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। যারা ঘরের বাইরে কাজে যেত তারাও এখন ঘরে অবস্থান করছে। অন্য সময় দেখা যেত স্বামী-সন্তানরা অফিস-স্কুলে গেলে গৃহের কাজ সেরে তারা একটু বিশ্রাম নিতে পারতেন এখন সেই সুযোগও কমে এসেছে। তবে স্বেচ্ছায় অনেক পুরুষ এখন গৃহের কাজ ভাগাভাগি করে করছেন। এতে গৃহকর্তীর উপর কাজের চাপ কমছে এবং সম্পর্কে আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গা বেড়ে গেছে। এই লকডাউন আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। একদিকে চীনে যেমন দেখা গেছে এই সময়টাতে ডিভোর্স ফাইলের সংখ্যা বেড়ে গেছে তেমনি অনেক ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক পুনর্নির্মাণও হচ্ছে। আসলে আমরা যখন বুঝতে পারি পৃথিবীতে আমাদের সময় কমে এসেছে তখন আমরা সম্পর্কের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেই। তাই এই সময়টাতে অনেকদিনের ভেঙে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্কগুলো পুনরায় ঠিক করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউনের এই সময়টাতে আমাদের সম্পর্কগুলোর প্রতি একটু বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। আমাদের বুঝতে হবে এটা কিন্তু অবকাশ যাপনের সময় না, আমাদের দৈনন্দিন জীবন যেমন ছিল তেমনই আছে শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা করোনাভাইরাস থেকে সমাজের মানুষদের রক্ষার তাগিদে ঘরে অবস্থান করছি। তাই এই সময়টাতে আমাদের একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে, যতটা সম্ভব গৃহের কাজগুলো ভাগ করে নিতে হবে, অন্যের অনুভূতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে’ 

এসএস

RTVPLUS
  • জাতীয় এর পাঠক প্রিয়