logo
  • ঢাকা শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮

আনুশকার মৃত্যুর ফলোআপ

ঢাকায় সেক্স টয় বিক্রেতা ও সরবরাহকারী ৬ জন গ্রেপ্তার

Follow-up of Anushka's death  6 arrested for selling and supplying sex toys in Dhaka
ফাইল ছবি

দেশের চাঞ্চল্যকর ঘটনা রাজধানী ঢাকার কলাবাগানে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী আনুশকা নূর আমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সূত্র ধরে নতুন একটি বিষয় ‘ফরেন বডি’ সম্পর্কে জানতে পারে দেশের মানুষ। যে তথ্যটি সর্বপ্রথম আরটিভি নিউজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। মূলত ‘ফরেন বডি’ হলো মেডিকেল সংক্রান্ত একটি বিষয়। এই ফরেন বডির মধ্যে সেক্স টয়ও একটি পণ্য।

ওই ঘটনার পর থেকে দেশের বাজারে সেক্স টয়ের অবাধ ব্যবসা ও সরবরাহের বিষয়টি “আনুশকার শরীরে মিলেছে রহস্যজনক ‘ফরেন বডির’ আলামত” শিরোনামে সর্বপ্রথম তুলে আনে আরটিভি নিউজ। বিশেষ করে অনলাইনে এই পণ্যের সহজলভ্যতার বিষয়টি “বাজারে বিপজ্জনক যৌনপণ্য ‘ফরেন বডি’ ও অন্যান্য উপাদানে ছড়াছড়ি!” শিরোনামে তুলে ধরে আরটিভির নিউজ। এরপর ‘পর্নোগ্রাফি থেকে ফরেন ফ্যান্টাসি, ধ্বংসের পথে তরুণ-তরুণীরা’ এই শিরোনামেও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আরটিভি নিউজ। পরিস্থিতিতে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গণমাধ্যমও এ সংক্রান্তে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখন থেকেই সেক্সটয়ের বিষয়ে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাইবার এক্সপার্ট টিম। সেই তৎপরতার ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যেই সেক্সটয় বিক্রি ও সরবরাহকারী চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এ বিষয়ে আগামীকাল রোববার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২ টায় সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবে সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টার। সেক্সটয় ব্যবসা ও সরবরাহকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আজ শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেছেন সিআইডি’র সিনিয়র এএসপি (মিডিয়া) জিসানুল হক জিসান।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি দুপুরের পর ওই ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় রাতেই কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করেন ছাত্রীর বাবা আল আমিন আহম্মেদ। মামলার এজহারে মেয়েটির বাবা জানান, গত ৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টায় তার স্ত্রী অফিসের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হন। তিনি ব্যবসায়িক কাজে বের হন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে তার স্ত্রীকে ফোন করে মেয়ে জানায়, সে কোচিং থেকে পড়ালেখার পেপার্স আনতে যাচ্ছে।

বেলা ১টা ১৮ মিনিটে মেয়ের মায়ের মোবাইল ফোনে কল আসে। ফারদিন ইফতেখার দিহান (১৮) নিজের পরিচয় দেয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘আমার স্ত্রীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করে বলে, ‘সে দিহান। আমার মেয়ে তার বাসাতে গিয়েছিল। আকস্মিকভাবে আমার মেয়ে তার বাসাতে অচেতন হয়ে পড়লে সে আমার মেয়েকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়।’

এই খবর পেয়ে মেয়েটির মা অফিস থেকে বের হয়ে বেলা ১টা ৫২ মিনিটে হাসপাতালে ছুটে যান। এজাহারে আনুশকার বাবা আরও উল্লেখ করেন, ‘সেখানে থাকা কর্তব্যরত ডাক্তারের কাছ থেকে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে মর্মে আমার স্ত্রী জানতে পারেন।’

বেলা ১টা ৫৭ মিনিটে বিষয়টি মেয়ের বাবা আল আমিনকে জানান স্ত্রী। এরপর তিনি পুরান ঢাকার নবাবপুরের ব্যবসাস্থল থেকে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। এজাহারে বাবা উল্লেখ করেন, ‘জরুরি বিভাগে থাকা কর্তব্যরত ডাক্তার নার্স হাসপাতালে অন্যান্য কর্মচারীসহ উপস্থিত অন্যান্য লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি যে উপরে বর্ণিত বিবাদী ফারদিন ইফতেখার দিহান দুপুরে ১২ টার দিকে বড় মেয়ে আনুশকা নূর আমিনকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে মোবাইল ফোনে তার কলাবাগান ডলফিন গলির, লেকসার্কাসের ফাঁকা বাসায় ধর্ষণের উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়।’

রক্তক্ষরণে মেয়ে অচেতন হয়ে পড়লে দিহান ধর্ষণের বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে বেলা একটা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে পৌনে ২টার দিকে মারা যায় মেয়েটি। পরে কলাবাগান থানা পুলিশের একটি দল হাসপাতালে যায়। তারা মেয়েটির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে পাঠায়।

ওই ছাত্রীর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ আরটিভি নিউজকে বলেন, আনুশকার শরীরের নিম্নাঙ্গে ‘কোন ফরেন বডি’ কিছু একটা ব্যবহার করা হয়েছে। এক কথায় সেখানে বিকৃত যৌনাচার করা হয়েছে। আমি আমার পোস্টমর্টেম জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, স্বাভাবিক পেনিস (পুরুষাঙ্গ) দ্বারা এই ইনজুরি মোটেও সম্ভব না। ওটা পেনিসের বাইরে অন্য কিছু ছিল। যৌনিপথ ও পায়ুপথ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ তার (আনুশকার) মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় সে ‘হাইপো ভোলেমিক’ শকে মারা গেছে। মানুষের মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দেহ থেকে অতিরিক্ত তরল বের হয়ে গেলে হৃদপিণ্ড স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। এ কারণে হৃদযন্ত্র শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে পারে না, মানুষ মারা যেতে পারে।

বিকৃত যৌনাচারের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বলেন, মেয়েটির যোনিপথ ও পায়ুপথ দুই রাস্তা থেকেই আমরা রক্তক্ষরণের আলামত পেয়েছি। আমরা জোর জবরদস্তির কোনো আলামত পাইনি। তবে যোনিপথ ও পায়ুপথে কিছু ইনজুরি আমরা পেয়েছি। মূলত সেই ইনজুরিগুলোর জন্যই সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কিন্তু বডির অন্য কোথাও জোরাজুরির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

পর্ণগ্রাফি থেকে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে আরটিভি নিউজের সঙ্গে কথা হয়েছিলো শিশু, কৈশোর ও পারিবারিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের। তিনি বলেছিলেন, পর্ণগ্রাফিতে রয়েছে সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি, যাকে বলা যায় ‘বিক্রিত যৌনাচার’। এই সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে বিভিন্ন ‘ফরেন বডি’ বা ‘সেক্স টয়’ ব্যবহার করা হয়। এরমধ্যে কিছু রয়েছে মেশিনারি (ভাইব্রেটর) আবার কিছু রয়েছে নন মেশিনারি।

স্বাভাবিক যৌন উপভোগ থেকে মানুষ যখন হারিয়ে যায়, তখনই বিক্রিত যৌন উপভোগে উপনীত হয়, আবার যখন বিক্রিত যৌন উপভোগ আরও বাড়াতে চায় তখন বিকৃতির চরম অবস্থায় চলে যায়। এই চরম উপভোগের ভয়ঙ্কর ও ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা হলো যৌনাঙ্গ আকৃতির ‘ফরেন বডি’ ব্যবহার করা।

এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আরটিভি নিউজকে আরও বলেন, মানুষ পর্ণ দেখে ‘সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি’ শেখে এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করে। কলাবাগানের ঘটনায় এর প্রয়োগ করা হয়েছে কিনা সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে মনোরোগ নিয়ে কাজ করার ফলে আমি, পর্ণ দেখে সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি বা বিক্রিত যৌনাচারে আসক্ত অনেক রোগীই পাচ্ছি। এর বড় একটি অংশ তরুণ বয়সী। আমাদের দেশে ক্রমেই এর বিস্তৃতি ঘটছে।

কেএফ

RTV Drama
RTVPLUS