logo
  • ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

‘হ্যাকিং নয়, ভিসির দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করাতেই আমাকে বহিষ্কার’

সিয়াম সারোয়ার জামিল, আরটিভি
|  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৫৩ | আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:০৮
ফাতেমা তুজ জিনিয়া
ফাতেমা তুজ জিনিয়া
ফাতেমা তুজ জিনিয়া  গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আইন বিভাগের এই ছাত্রী ইংরেজি দৈনিক 'দ্য ডেইলি সানে' বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন' এবং 'বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের মহাপরিকল্পনা' করার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে তাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইট ও উপাচার্যের আইডি হ্যাকিং পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত। এসব বিষয় নিয়ে আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন জিনিয়া। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার সিয়াম সারোয়ার জামিল।


আরটিভি: আপনার বিরুদ্ধে উপাচার্য অভিযোগ করেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও তার ফেসবুক আইডি হ্যাকিং পরিকল্পনার সঙ্গে আপনি জড়িত। অভিযোগগুলো কতটুকু সত্য?

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: একেবারেই অসত্য অভিযোগ। আমি আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। হ্যাকিং পরিকল্পনার প্রশ্নই ওঠে না। আমার এতো আইটি জ্ঞানও নাই। হ্যাকিং নয়, বরং যেটা হয়েছে, তার দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করার কারণেই তিনি আমার উপরে ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিদ্বেষবশতই তিনি আমাকে বহিষ্কার করেছেন।

আরটিভি: এই অভিযোগ ছাড়াও আপনি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের মহাপরিকল্পনায় জড়িত- এমন​ অভিযোগ আনা হয়েছে। সেগুলোও কি অসত্য?

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: আমার বিরুদ্ধে প্রধানত তিনটি অভিযোগ করা হয়েছে। প্রথম অভিযোগ ছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর লেখালেখি করেছি। দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছি। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, আমি হ্যাকিং পরিকল্পনায় জড়িত বা হুমকি দিয়েছি। কোনও অভিযোগেরই সপক্ষে কোনও প্রকার তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এই অভিযোগগুলোই আনাই হয়েছে, কেবল তার দুর্নীতি বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশন করায়। 

আরটিভি: আপনি বলছেন, বহিষ্কারের কারণ উপাচার্যের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন। কী ধরনের সংবাদ লিখেছেন আপনি?

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে নানা সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও শিক্ষকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করেছি। নতুন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানও করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, শহীদ মিনার, স্টেডিয়াম নির্মাণ টেন্ডার হয়নি। টেন্ডার ছাড়াই এসব প্রকল্প হয়েছে। ম্যুরালে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। শহীদ মিনারে- স্টেডিয়ামে এসবেও কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। বাস্তবে কোনোটিরই টেন্ডার হয়নি। এসব নিয়েই আমি খোঁজ নিচ্ছিলাম। ক্যাম্পাসে উপাচার্যের অনুসারীদের একটি দল আছে, যা ভিসি বাহিনী নামে পরিচিত। যারা ভিসির সমস্ত অপরাধ কর্মকাণ্ডগুলোতে সহায়তা করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র তহবিল থেকে তাদেরকে 'দরিদ্র' হিসেবে টাকা দেয়া হয়। এসব নিয়ে তথ্য চাইলে আমাকে দিতে চায়নি প্রশাসন। উল্টো হুমকি দেয়া হয়েছে। বলা হয়, ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বড় বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ছাত্রীদের গ্যারেজের একাংশে থাকতে দেয়া হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা সেভাবে নাই। বিভাগগুলোতে অবস্থা খুবই খারাপ। সেমিনার-লাইব্রেরি-ল্যাবরেটরি নাই। টিনশেডে ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি হলে ক্লাস করা যায় না। গাদাগাদি করে বসতে হয়। নতুন বিভাগ হচ্ছে, কিন্তু ল্যাব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ছাড়াই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে। অন্য ডিপার্টমেন্টগুলোতেও পর্যাপ্ত নয়। এসব নিয়ে কথা বলতে যখনই উপাচার্যের কমেন্ট নিতে গেছি। তখনই উনি ক্ষিপ্ত হয়েছেন। নিউজ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

আরটিভি: সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে এর আগেও কি হুমকি-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে?
 
ফাতেমা তুজ জিনিয়া: হ্যাঁ। বিভিন্ন সময়েই আমাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। তিনি নিয়মিতই এই কাজটা করেন। গেল আগস্ট মাসের ২৪ তারিখ একটি সংবাদের জন্য উপাচার্যের বক্তব্য নিতে গেলে, উপাচার্য স্যার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে আমাকে গালিগালাজ করেন। আমার পরিবার নিয়েও কটু মন্তব্য করেছেন। এরকম কথাও বলেছেন যে, ‘তোর আব্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে কোনোদিন? আমি খুলছি বলেই তো তোর চান্স হইছে। না হলে তো তুই রাস্তা দিয়া ঘুরে বেড়াতি।’

আরটিভি: কী লিখেছিলেন ফেসবুক স্ট্যাটাসে?

ফাতেমা তুজ জিনিয়ার: 'একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?' শুধু এতটুকুই লিখেছিলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো বিরুদ্ধে কোনও কিছু লিখিনি। বিভিন্ন জনের স্ট্যাটাসে হয়তো কমেন্ট করেছি, সেগুলো তার বিরুদ্ধে গেছে।

আরটিভি: গতকালও তো ক্যাম্পাসে একটি পত্রিকার সংবাদকর্মীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে...

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: হ্যাঁ। তিনি আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিনিধি। ভিসির অনুসারীরা তার ওপর হামলা করেছেন। এর আগে আমার সংবাদের একজন সূত্র বা সোর্স, যিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্র, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যেদিন ছাত্রটিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, ওইদিন রাতে তার মেসেও হামলা চালানো হয়। এসব নিয়ে কোনও কথা বললেও বহিষ্কার করে দেয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারেনা। গত এক মাসে উপাচার্যের নির্দেশে দুই দফায় ৭ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে কোনও মাধ্যমে কথা বলতেই আতঙ্ক বোধ করেন। 

আরটিভি: দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল সাংবাদিক সংগঠনগুলো আপনার পক্ষে বিবৃতি দিলেও আপনার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমিতি উল্টো আপনাকে বহিষ্কার করেছে। বহিষ্কারের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্যকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়ে, কাউকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে বহিষ্কার করতে বাধ্য করেছেন উপাচার্য। সমিতির যে মিটিংয়ে বহিষ্কারাদেশ দেয়া হয়, সেই মিটিংয়ে আমাকে থাকতে দেয়া হয়নি। কোনও প্রকার তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন ও অভিযোগ খণ্ডানোর সুযোগ ছাড়াই বহিষ্কার করা হয়েছে। মিটিংয়ের শুরুতেই সব সদস্যের ফোন বন্ধ করে নিজেদের কাছে নিয়েছিলেন উপাচার্যের অনুসারী শিক্ষকরা। বাইরে ভিসির অনুসারী একদল ছেলেরা পাহারা দিতে থাকে। চার ঘণ্টা মিটিং হয়েছে। আমাকে মিটিংয়ে রাখা হয়নি। আমার পক্ষে কথা বলতে গেলেই তাদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে। সমিতির দু’জন সদস্য উপাচার্যের কাছ অর্থ নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তারাই উত্থাপন করেছেন যে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় মনে করছে, অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাই বহিষ্কার করা হয়েছে। তারাও এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। এসময় জোর করে অন্য সদস্যদের সাক্ষর নেয়া হয়। সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা সময় নিতে চেয়েছিল সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। কিন্তু তাদের তাদের বের হতে দেয়া হয়নি। আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনটিই প্রমাণ করতে না পারলেও উপাচার্য তার অনুসারীদের দিয়ে ফেসবুকে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয় তিনি লিখিয়েছেন। সেগুলো আবার তিনি ওয়ালে শেয়ারও দেন। 

আরটিভি: উপাচার্য বলছেন, আপনি যদি দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবে আপনা বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়া হবে...

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি যেখানে অপরাধই করিনি, সেখানে কেন ক্ষমা চাইবো? তারা ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যে, আমি এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারবো না। কিন্তু আমি কোনও আপোষ করিনি।

আরটিভি: এই পরিস্থিতিতে আপনি কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন? 

ফাতেমা তুজ জিনিয়া: নিরাপত্তাহীনতায় আমি বাসা থেকে গত কয়েকদিন একা বের হতে পারছি না। এর মধ্যে দু'একবার বের হলেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছি। এমন অবস্থায় আজ থানায় নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছি। 

এসজে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়