• ঢাকা বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

ওদের ভুলে আমাদের স্বজন মৃত্যুর মিছিলে

সাজ্জাদ শোভন, আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট
|  ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১০:০৩ | আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১৪:৩০
মানুষ মাত্রই ভুল। তবে কিছু ভুলে পার পেয়ে গেলে সেটি বারবার হয়। তার মাশুল দিতে হয় অন্যজনকে। সড়ক দুর্ঘটনা এর অন্যতম উদাহারণ। এমন কোনো দিন নেই, গাড়িচালকদের ভুলে যেদিন অকালে প্রাণ ঝরছে না কিংবা প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বাতাস ভারী হয়ে উঠছে না। কেউবা চিরতরে হয়ে যাচ্ছেন পঙ্গু। ঈদ এলেই এর মাত্রা বেড়ে হয় দ্বিগুণ। এ দুর্ঘটনার জন্য নিয়ম না মানার প্রবণতাকেই দায়ী করছে বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসন সচেতন থাকলে এসব দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো সহজেই।

whirpool
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিসংখ্যান মতে, এ বছর (২০১৬) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১শ’ ৮২ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪৪৬ জন। আহত অন্তত ১১শ’ ২৪। ঈদের আগে ও পরের ১৫ দিনের দুর্ঘটনানুযায়ী এ পরিসংখ্যান।

অন্যদিকে যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, এ বছরের দুই ঈদে ৩শ’ ১৪ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪শ’ ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮০২ জন। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা ও টেলিভিশন চ্যানেলের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তারা এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। গেলো কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ঈদ এলেই বেড়ে যায় সড়ক দুর্ঘটনা। হতাহত মানুষের রক্তে লাল হয়ে যায় মহাসড়কের কালো পিচ।
 
এআরআই’য়ে থাকা পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১ সালে দু’ঈদে ২শ’ ৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ২শ’ ৪৩ জন। ২০১২ সালে দু’ঈদে ১শ’ ৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ২শ’ ২৫ জন। অবশ্য সচেতনতা বাড়ানোয় ২০১৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। ওই বছর ১শ’ ৭৭টি দুর্ঘটনায় মারা যান ১শ’ ৭০ জন। ২০১৪ সালে আবার তা বেড়ে যায়। ১শ’ ৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ২শ’ ৪০ জন। পরের বছরগুলোতে দুর্ঘটনা ও মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ে। অর্থাৎ ২০১৫ সালে ২শ’ ৬১টি দুর্ঘটনায় মারা যান ৪শ’ ৭ জন। ঈদের আগে ও পরের ১১ দিনের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান এটি।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মানুষ মারা যায়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এআরসি)-এর তথ্য মতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে ১২ হাজার মানুষ মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়।

সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু একটি প্রাণেরই মৃত্যু হচ্ছে না, এতে ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হওয়া জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬০ ভাগ কর্মক্ষম, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন সেন্টার ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেশে ৬৯ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য বাস ও ট্রাক দায়ী। হতাহতদের মধ্যে বাস ও প্রাইভেটকারের যাত্রী ১৯ শতাংশ। তিন চাকার গাড়ির আরোহী ১৬ ভাগ এবং সাইকেল চালক ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ এ ব্যাপারে আরটিভি অনলাইনকে বললেন, মহাসড়কে ডিভাইডার ও সার্ভিস লেন না থাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া ঈদের সময় অভ্যন্তরীণ (মহানগরের গাড়িচালক) পথের চালকদের দিয়ে দূরপাল্লায় বাস চালানোর কারণে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।

তার মতে, দ্রুতগতি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করায় ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ ওভার টেকিং, ওভার স্পিড ও ওভার লোড। এছাড়াও রয়েছে ধীরগতির যানবাহন নসিমন-করিমন। এগুলোর কারণে ঈদে সড়ক পথে দেখা দেয় হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

সাইফুন নেওয়াজ আরও বললেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে চালকের পাশাপাশি যাত্রীদেরও দোষ থাকে। বিশেষ করে ঈদের সময় দেখা যায় যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রো বা প্রাইভেটকার ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। তবে যানজট ছাড়ার পর যাত্রীদের তাগিদে চালক গতি বাড়াতে এবং ওভারটেক করতে বাধ্য হয়।
    
তিনি আশা প্রকাশ করে বললেন, বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন নতুন আইডিয়ায় সড়ক পথে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব।

১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারিয়েছেন চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর ব্যথা আজও কাঁদায় তাকে। এরপর থেকেই সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলনে নামেন। ইলিয়াস কাঞ্চনের স্বপ্ন, আর কোনো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাবে না। প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ নামের একটি সংগঠন। প্রতি বছর স্ত্রীর প্রয়াণ দিনটিতে পালন করে আসছেন ‘নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে।

সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে নিসচা’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন আরটিভি অনলাইনকে বললেন, প্রতি বছর ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। বড় দুঘর্টনাগুলো প্রায় একই জায়গায় ঘটছে। এর কারণ চিহ্নিত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনেকবার বলাও হয়েছে। কিন্তু যেখানে সরকারের অবহেলা রয়েছে সেখানে কর্মচারীরা কী কাজ করবে?

তিনি বললেন, সরকারের মন্ত্রী যখন অদক্ষ চালকের পক্ষ নেন তখন কিন্তু এ সমস্যা সমাধানের আশা করা যায় না। স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি। যাদের হারিয়েছে তারাও বুঝে। কিন্তু বোঝেন না মন্ত্রী বা কর্তৃপক্ষ।

এসএস/ এমকে/ এস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়