logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দারাজের ১ টাকার ফাঁদে লাখ টাকার প্রতারণার টার্গেট!

It is as if a fancy ‘casino’ has opened its daraz, a target of cheating crores of rupees!
১ টাকায় মোটরসাইকেল কিংবা টেলিভিশনের লোভ দেখিয়ে দারাজ এর প্রতারণার ফাঁদ
সাইবার মনিটরিং ও প্রতারণা প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বসেই যেন প্রকাশ্যে অভিনব ক্যাসিনো চালাচ্ছে অনলাইন শপ ‘দারাজ’। মাত্র ১ টাকায় ১৬ লাখ টাকার গাড়ি! তাক লাগানো এমন লোভনীয় অফার-কার না ভাগ্যটা পরীক্ষা করে নিতে ইচ্ছে হয়!

 এমন অভিনব প্রতারণার ফাঁদ পেতে বহু গ্রাহকের কাছে থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার টার্গেটে মাঠে নেমেছে ‘দারাজ’। প্রতারণার ছদ্মবেশ নিতে ‘কুইজ’ আর ‘ক্যাম্পেইন’ নামে জুয়ার আসর চালু করেছে এই প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি। এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি নাকি জানা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের! অনলাইন মাধ্যমে মনিটরের পর্দায় জুয়ার স্পিন ঘুরিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে চতুর প্রতারক ‘দারাজ’।
 
দেশে অনলাইন ক্যাসিনো কিং সেলিম প্রধানের প্রতারণাও যেন হার মানাতে বসেছে ‘দারাজ’। সম্রাট, এনু কিংবা রুপনদের আইনের আওতায় আনা হলেও দারাজের প্রতারণার দিকে নজর দিচ্ছে না কেউই। অথচ প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও টিভি পর্দায় বহুমুখী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। মাত্র ১ টাকায় দামি গাড়ি, মোটরসাইকেল ও মোবাইলসহ বহু অফারের ছড়াছড়ি দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন অনেকেই।

 এমন পরিস্থিতিতে এই অভিনব ‘ক্যাসিনো’ বন্ধে টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা। মানুষকে লোভের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়া, সরাসরি প্রতারণা বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান। 

তিনি বলেন, ‘এই ব্যবসায়িক প্রতারণাকে আমি মনে করি জুয়া বা ক্যাসিনোর শামিল। স্পেশাল টাস্কফোর্স এর কথা আমরা অনেকদিন ধরে বলছি। যদি এটার বাস্তবায়ন করা না হয় তবে প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার যে একটি ব্যবসায়িক কার্যকলাপ শুরু হয়েছে, সেটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তবে, আহ্বান থাকবে লোভে পড়ে প্রতারণার ফাঁদে যেন কেউ পা না দেয়, সেই দিকেই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
 ‘
 কৌশলে এমন অপকর্ম চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে দারাজের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ফুয়াদ আরেফিন বলেন, এখানে এক টাকার গেম রয়েছে। এই এক টাকার গেমে গাড়ির মতো জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। ক্যাম্পেইনের জন্যতো আর অনুমতির প্রয়োজন হয় না। এটাতো ব্যবসায়ীক প্রক্রিয়ার অংশ। এটি আমাদের নরমাল কাজের সঙ্গে যুক্ত। 

দারাজের প্রতারণার বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নজরে আনা হলে তিনি বলেন, ইভেলী বা দারাজ কিভাবে এসব ব্যবসা করছে তার সব কিছুই আমরা দেখবো। বিষয়টি ফলোআপে রয়েছে। অনলাইন ব্যবসা মাধ্যম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এছাড়া আমাদের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণকেও বলতে হবে যে ভোক্তারা যেন প্রতারিত না হয় সে বিষয়টি দেখতে। দারাজ কিভাবে এ ব্যবসা করছে সেটি যেন দেখে।

 করোনায় মাস্ক বিক্রি নিয়ে দারাজের প্রতারণা

করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে ৫০ টাকার মাস্ক ২ হাজার ২৫৫ টাকায় বিক্রি করে আসছিল অনলাইন শপিং মার্কেটপ্লেস দারাজ ডটকম। বাড়তি দামে মাস্ক বিক্রি করার অভিযোগে দারাজকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে রাজধানীর বনানীতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে এ জরিমানা করা হয়।

 র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযানের শুরুতে বনানীতে দারাজের প্রধান কার্যালয়ে যান আদালতের কর্মকর্তারা। এরপর সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটির তেঁজগাও কার্যালয়েও অভিযান চালানো হয়। এ সময় মাস্ক বিক্রিতে স্পষ্টতই দারাজের নজরদারির অভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়। যথাযথ নজরদারির অভাবে চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান দারাজে উচ্চমূল্যে মাস্ক বিক্রি করছিল।

কয়েকজন ভুক্তভোগীর বক্তব্য 
দারাজের প্রতারণার খবর নতুন নয়। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগের স্তূপ। নগদ টাকায় পণ্য পৌঁছে দিলেও পণ্যের মান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ ছাড় দেয়ার নামে তারা গ্রাহকদের নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দিচ্ছে। এই বিশেষ ছাড়কে তাই ‘বিশেষ প্রতারণা’ বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। 

ওয়ারী এলাকার মেহেদী হাসান নামের এক গ্রাহক দারাজ থেকে পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি দারাজ থেকে একটি লুঙ্গি কিনেছিলেন। তার অর্ডার নম্বর-৬০৯০৭৭৫৮৬৮৭৭১০০। সেই লুঙ্গির মান নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘ আমি যে লুঙ্গিটার অর্ডার করেছিলাম তার দাম ছিল ৪৫০ টাকা। ডিসকাউন্ট দিয়ে ২৮৭ টাকা নেয়া হয়। কিন্তু প্যাকেট খোলার পর দেখি সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী। ওরা (দারাজ) সেলারদের কাছ থেকে পণ্য এনে দেয়। সেলার ভালো নাকি মন্দ পণ্য দিল, দারাজ এর কোনও খোঁজ-খবরই রাখে না। দারাজ বলে তারা কোয়ালিটি মেইন্টেইন করে, কিন্তু আসলে ওরা এর কোনও ধার ধারে না।’ 


ধানমণ্ডি এলাকার গ্রাহক বাবুল। তিনি দারাজ থেকে দুটি প্যান্ট এবং পোলো শার্ট ক্রয় করেন। তার অর্ডার নম্বর হলো- ৬০৮৮৮০৬৭৪২০৯২১। উল্লিখিত অর্ডার আইডি থেকে ৩টি পণ্য কেনেন তিনি। ৩টি পণ্যের মানই পশ্নবিদ্ধ বলে জানান এই গ্রাহক। একটি পোলো শার্টের মূল্য ১০০০ টাকা দেয়া আছে। সেই পণ্যের ছাড় দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ২২০ টাকা নেয়া হয়। একটি প্যান্টের মূল ১৩৫০ টাকা, ছাড় দিয়ে ২৪০ টাকা এবং আরেকটি প্যান্টের দাম ৭৯৯ টাকা, ছাড় দিয়ে ২২৮ টাকা। প্রতিটি পণ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য ৬০ টাকা করে ১৮০ টাকা নেয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি ফেসবুকে দারাজের বিজ্ঞাপন দেখে দুটি প্যান্ট ও একটি পোলো টি-শার্টের অর্ডার দিয়েছিলাম। এর দুই দিন পর দারাজের অফিস থেকে জানানো হয় পণ্যগুলো আমার কাছে পাঠানো হচ্ছে। ডেলিভারি বয় আমাকে পণ্যগুলো দিতে এলে আমি তা খুলে দেখে নিতে চাই। তখন ডেলিভারি বয় বলেন, ‘এখন খুলে নিতে পারবেন না। পরে খুলে দেখবেন। সমস্যা থাকলেও রিটার্ন দিতে পারবেন।’ তারপর প্যাকেট খুলে দেখি প্যান্টগুলো একেবারেই লো-কোয়ালিটির। এসব প্যান্ট ভ্যানগাড়িতে যে প্যান্ট বিক্রি করে তার চেয়েও খারাপ। আর পোলো টি-শার্টটির কলারে সমস্যা। তিনটি পণ্যই আমার কাছে মনে হচ্ছে রিজেক্ট মাল।’ তিনি আরও বলেন, ‘দারাজ যে বিশেষ ছাড় দেয় তা আসলে ভাঁওতাবাজি। এক শ টাকার পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিশেষ ছাড় দেয় তারা। আমার মনে হয় ডেলিভারি দেয়ার আগে দারাজের পণ্যের মান নিশ্চিত করা উচিত।’

যাত্রাবাড়ী এলাকার ভুক্তভোগী মোহাম্মদ ইসহান মির্জা বলেন, আমি দারাজ থেকে একটি পাওয়ার ব্যাংক কিনেছিলাম। তার মধ্যে একটা পুরনো ব্যাটারি পেয়েছি। দারাজ আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমার অর্ডার নম্বরটি ছিলো- ৬০৮৭৩৮৪৯৪৯৩৯৯৬২।

 গত বছরের ২৯ শে নভেম্বর ‘দারাজ’ স্মার্টশপ অনলাইন পেজের ইলেকট্রনিকস কম্পোনেন্ট বিভাগ থেকে সিরাজুল ইসলাম হৃদয় একটি লাল কালারের স্মার্ট দেয়াল ঘড়ির অর্ডার করেন। ঘড়িটির দাম ২৯৯ টাকা হলেও শিপিং চার্জ বাবদ যোগ করা হয় আরও ৬০ টাকা। যার অর্ডার নম্বর হলো- ৬০৪৪৭৫০৪১০৩৮৪১। স্ট্যার্টাড কোড-বিডিডেক্সএজিআর। এসএ পরিবহনকে বাড়তি বিল দিয়ে ২০ দিন পর দারাজ অনলাইন থেকে আসা প্যাকেট খুলে মাথায় হাত। এ কী কাণ্ড! দিলেন ঘড়ির অর্ডার আর আসলো ঘড়ির কাঁটা।

 পরক্ষণেই ওই গ্রাহক ‘দারাজ’ এর ফেসবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ করলে ফিরতি মেসেজে জানান, আপনার পণ্যটি আর রিটার্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে পণ্য ক্রয়ের পূর্বে মূল্যসহ, পণ্যের ছবি, রং, বিস্তারিত বিবরণ এবং রিটার্ন পলিসি চেক করুন। দারাজের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। 

ভুক্তভোগী হৃদয় বলেন, ছবি দেখে অর্ডার করেছি। বাক্সটি খুলে ঘড়ির বদলে পেয়েছি তিনটি টি কাঁটা। এরপর থেকেই ওই অনলাইনের নম্বরে কল দিয়েও যোগাযোগ করা যায়নি।


কেএফ/জেবি

RTVPLUS