জিয়া আমাকে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল: রাষ্ট্রপতি

প্রকাশ | ১৫ আগস্ট ২০২০, ১৫:৪১ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২০, ১৫:৫৯

আরটিভি নিউজ
রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আমাকে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।বললেন রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ। 

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেয়া রেকর্ডকৃত এক সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধুর কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কর্ণেল মাহফুজুর রহমানের মাধ্যমে জিয়া আমাকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি যদি প্রস্তাবে রাজি না হই তাহলে একই সময়ে সে আমাকে ২৫ বছর জেল বন্দী রাখার হুমকি দিয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে আবদুল হামিদ বলেন, আমি ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জে আয়োজিত আলোচনা সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করি। বক্তৃতায় আমি বলেছিলাম, হিটলার-মুসোলিনি থেকে শুরু করে কোনো স্বৈরাচারই টিকেনি, এ দেশেও স্বৈরাচার টিকবে না। এসময় তিনি জেলখানায় দুর্বিসহ কষ্টের ইঙ্গিত দেন।

তৎকালীন ছাত্র নেতা ও তরুণ সংসদ সদস্য হামিদ আরও বলেন, এই অপরাধেই বোধহয় কিছুদিন পর আমি গ্রেপ্তার হই। জেলখানার ভেতরেই জিয়াউর রহমান তার সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজুর রহমানের মাধ্যমে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পাঠান। বলা হয়েছিল, প্রস্তাবটি না মানলে ২৫ বছর জেলে থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে পারিনি বলে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই। জীবনভর বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে তার আদর্শ আঁকড়ে ধরেই থাকতে চেয়েছি।

রাষ্ট্র প্রধান বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে আমি তার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমি শোকাহত চিত্তে আরও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তার তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ শহিদদের প্রতি যারা ১৯৭৫ সালের এ দিনে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ঘাতকচক্রের হাতে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। ১৫ আগস্ট জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতা ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। তারা শুরু করেছিল বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির পালা। ইতিহাসের নারকীয় হত্যাকা-ের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ঘাতচক্র কুখ্যাত “ইনডেমনিটি আইন” পাশ করে।

আবদুল হামিদ বলেন, ১৫ আগস্ট বর্বরোচিত ঘটনা কেবল বাঙালির ইতিহাসের নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা বিরোধী চক্র পরাজিত হলেও দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে তাদের চক্রান্ত কখনো থেমে থাকেনি। স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ঘাতকচক্রের চক্রান্তের চূড়ান্ত বহি:প্রকাশই হচ্ছে ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ড।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করেছেন। দেশের মানুষকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশ ভালবেসে গেছেন। তিনি কখনো ভাবতেও পারেননি যে, কোন বাঙালি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে বা তাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সবসময়ই সুযোগ খুঁজতে থাকে। এসময় ছোটখাট কিছু ঘটনা ঘটলেও বঙ্গবন্ধু কখনোই সেসব আমলে নিতেন না।

আবদুল হামিদ বলেন, নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে কোন দেশের জন্যই সম্পদ। তাই তাদেরকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিজের দেশ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে হবে। বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। আর বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখন আর শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি কালজয়ী ইতিহাস ও একটি সত্ত্বা। বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন তার রাজনৈতিক দর্শন, নীতি ও আদর্শ যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সকলকে আলোর পথ দেখাবে, উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে সাহস যোগাবে।

তিনি উল্লেখ করেন, জেলজুলুম, নির্যাতন আর অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করে গেছেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতির পুর্নগঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য উন্নয়ন ও অগ্রগতির রূপরেখা রেখে গেছেন। রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনারবাংলা প্রতিষ্ঠাই ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ যেন সবসময় বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ’৭৫-র ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে দেয়নি।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তার নীতি ও আদর্শ মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু তাদের সে চক্রান্ত এ দেশের মুক্তিকামী জনগণ সফল হতে দেয়নি। তাইতো জীবিত মুজিবের চেয়ে অন্তরালের মুজিব অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশ ও জনগণের যে কোন ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শই আমাদেরকে পথের দিশা দেখায়।সূত্র: বাসস

এমকে