• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫

ইতিহাসের দুর্ভাগা ৫ ফুটবলার

কুশল ইয়াসির
|  ১৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৯:২০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৮, ১০:৫৯
আগামী ১৪ জুন মস্কোর লুজিনিকি স্টেডিয়ামে সৌদি আরব বনাম স্বাগতিক রাশিয়ার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮। এটি বিশ্বকাপের ২১তম আসর হবে। এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ৩২টি দল খেলবে, যেখানে রাশিয়া স্বাগতিক দল হিসেবে এবং বাকি ৩১টি দল বাছাইপর্বের প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে খেলবে। 

১১টি শহরের ১২টি স্টেডিয়ামে সর্বমোট ৬৪টি খেলা সম্পন্ন হবে। ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামেই এই আসরের ফাইনাল হবে।

১৯৩০ সাল থেকে শুরুর পর ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ওই দুইবার বন্ধ ছিল এই মহাআসর। এ যাত্রায় ফুটবলপ্রেমীরা দেখেছেন অনেক বড় বড় তারকাকে। শৈল্পিক নৈপুণ্য দেখিয়ে ভক্তদের মন জয় করে নিয়েছেন তারা। কেউ গোল করে কেউ গোল করিয়ে পৌঁছেছেন সর্বোচ্চ শিখরে। তবে বিশ্ব ফুটবলে এমন বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি আছেন যারা বিশ্বখ্যাত তারকা হয়েও খেলতে পারেননি বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে।

রায়ান গিগস (ওয়েলস)

সময়ের সেরাদের সেরা হয়েও এ বিশ্বকাপে কখনই অংশ নিতে পারেননি রায়ান গিগস। ওয়েলেসের সাবেক এই ফরোয়ার্ড কয়েকদিন আগেই জাতীয় দলের কোচ হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (ইপিএল) ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের খাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন। ১৩ বার প্রিমিয়ার লিগ, দুই বার ইউরোপ সেরা ও ৪ বার এফএ কাপ ট্রফি জয় করেছেন।

১৯৮৭ সালে রেডডেভিলসদের হয়ে জুনিয়র লেভেলে খেলতে এসে আর ফিরে যাননি। তিন বছর পর সিনিয়র লেভেল শুরু করার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত ক্যারিয়ারে মোট ১১৪টি গোল করেন।

এখানেই শেষ নয় ওল্ডট্রাফোডেই শুরু হয় কোচিং ক্যারিয়ার। টানা দুই বছর অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার পর সম্প্রতি যোগ দেন নিজ দেশ ওয়েলসে।

অন্যদিকে মাতৃভূমির হয়ে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ৬৪টি ম্যাচে মোট ১২টি গোল করেন গিগস। দীর্ঘদিন পালন করেছেন  অধিনায়কের দায়িত্বও। তবে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তার ক্যারিয়ারে দল কখনো বিশ্বকাপ কিংবা ইউরোর মূল আসরে পৌঁছাতে পারেনি।

এরিক কান্তোনা (ফ্রান্স)

চার চারটি প্রিমিয়ার লিগ ও দুটি এফএ কাপের শিরোপা জিতেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নির্ভরযোগ্য এরিক কান্তোনা। ইংলিশ দলটির হয়ে প্রায় পাঁচ বছরে নিজের সেরাটা দিয়ে পেয়েছেন ‘কিং কান্তোনা’ বিশেষণ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই ফ্রেঞ্চ তারকা ১৪৩ ম্যাচে মোট গোল করেছেন ৬৪টি।

৯০ এর দশকে মাঠে জার্সির কলার উঁচু করে নামতেন এই ফরোয়ার্ড। ৭ নম্বর জার্সিতে মাতিয়েছেন ওল্ডট্রাফোর্ডের মঞ্চ। ১৯৯৫ সালে ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে থাকা দর্শককে কুংফু কিক মেরে শিরোনাম হয়েছিলেন ম্যানইউ তারকা। আর সে কারণে শ্রীঘরেও যেতে হয়েছিল তাকে।

১৯৮৭ সালে জাতীয় দলে যোগ দিয়ে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪৫ ম্যাচে ২০ গোল করেন কান্তোনা। অভিষেক হবার পরের বছর দল থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় তৎকালীন কোচ হেনরি মিশেলকে গালি দিয়ে সবার নজরে প্রথমবারের মতো আসেন এই ফরোয়ার্ড।

যদিও ১৯৯০ সালে মিশেল ফ্রান্সকে মূল পর্বে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। চার বছর পর নতুন কোচ জেরাড হউলিয়ারের অধীনেও বাছাই পর্ব পার করতে পারেনি ইউরোপের দলটি।

এতে তৎকালীন ইউরোপের অন্যতম এই সেরা তারকাকে কখনই বিশ্বকাপে দেখতে পাওয়া যায়নি। তার জায়গায় দলের প্লে-মেকারের ভূমিকায় নেমে ১৯৯৮ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে নায়ক হয়ে যান তরুণ তারকা জিনেদিন জিদান।

জর্জ ওয়েহা (লাইবেরিয়া)

১৯৯৪-৯৫ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৯৯৫ সালের ফিফ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার এবং ব্যালন ডি’অর জিতে নেন। আর এই কারণে আফ্রিকার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেন। ইংল্যান্ড, ইতালি ও ফ্রান্সে ঘরোয়া লিগের পরিচিত মুখ জর্জ ওয়েহা কখনোই বিশ্বকাপের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারেননি।

মোনাকো, প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি), এসি মিলান, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটির মতো দলগুলোতে গোলের বন্যা ভাসিয়েছেন। আর তাই তাকে ‘কিং জর্জ’ বলে ডাকা হতো।

ফুটবলের মাঠের রাজা ১৯৮৭ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত লাইবেরিয়ার জয়ে ৬০ ম্যাচে ২২ গোল করেন। ২০০৭ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার পর পুরো দমে দেশ সেবায় নেমে পড়েন।

২০১৭ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ফিফার সর্বকালের সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের লিস্টে থাকা এই স্ট্রাইকার।  

জর্জ বেস্ট (নর্দান আয়ারল্যান্ড)

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলা আরেক তারকা ফুটবলার বিশ্ব সেরার লড়াইয়ের খুব কাছে গিয়েও বাছাই পর্বে থামতে হয়েছে। ষাটের দশকে জর্জ বেস্ট দেখিয়েছেন দুই পায়ের ফুটবলের জাদু। স্পিড, স্কিল ও ব্যালেন্সের জন্য নামের মতো তার কাজ ছিল। 

১৯৬৪-৬৫ ও ১৯৬৬-৭ পর পর দুই বার নর্দান আয়ারল্যান্ডের এই তারকার হাত ধরে দুটি ফার্স্ট ডিভিশন শিরোপা ঘরে তোলে ইংলিশ ক্লাবটি। ১৯৬৮ সালে দলকে ইউরোপিয়ান কাপও উপহার দেন এই ফরোয়ার্ড। সে বছর ইউরোপিয়ান সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্টাইলিশ এই তারকা। 

১৯৬৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হবার পর ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত মোট ৯টি গোল দেন। 

১৯৬৬, ১৯৭০ ও ১৯৭৪ সালে ব্যর্থ হন বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে। তবে ১৯৮২ সালে সুযোগ পায় দল। সেসময় ৩৬ বছর বয়সী বেস্টকে ফেরাতে আগ্রহ দেখায়নি দল। এমনিতেও মদের প্রতি আসক্তি থাকার কারণে বেশ কয়েকবার শিরোনাম হতে হয় বেস্টকে।
 
আল ফ্রেডো ডি স্টেফানো (আর্জেন্টিনা ও স্পেন)

স্বপ্ন ভঙ্গের আরেকটি ইতিহাস। তিনি তো দুই দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। শুধু তাই নয় দুই দলের হয়ে গোল করেছেন। তবে গ্রেটেস্ট  ‘শো অন আর্থে’ দেখা যায়নি এই কিংবদন্তিকে। মজার বিষয় হচ্ছে এই ফুটবলার কলম্বিয়া একাদশের হয়েও মাঠ মাতিয়েছিলেন যদিও সেগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচের তকমা পায়নি।

১৯৪৭ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয় স্টেফানোর। ১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পাড়ি জমানোর সুযোগ ছিল এই আর্জেন্টাইনের কাছে। সেবার দল মূল আসর খেলতে রাজি হয়নি। আর তাই সৌভাগ্য হয়নি ২৪ বছরের তরুণের। পরেরবার একই অবস্থা হয়। ১৯৫৪ সালেও আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বকাপ খেলতে অপরাগতা জানায়।

দুই বছর পর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলতে ডাক আসে। পাড়ি জমান স্পেনে। ১৯৫৭ সালে লা লিগার ক্লাবটির হয়ে খেলার সময় স্পেনের নাগরিক হবার সূত্রে জাতীয় দলে সুযোগ হয় তার। অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে দলকে ৫-১ গোলের বড় জয় এনে দেন।

যদিও পরের বছর বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব উতরাতে পারেনি স্প্যানিশরা। তবে দমে যাননি স্টেফানো। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত লস ব্লাঙ্কোসদের হয়ে মোট পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতে নেন। ১৯৬২ বিশ্বকাপে স্পেন জাতীয় দলকে নিয়ে যান বিশ্বসেরাদের চূড়ান্ত মঞ্চে। তবে শেষ মুহূর্তে ইনজুরির কারণে আর দলের সঙ্গে ব্রাজিল বিশ্বকাপে যেতে পারেননি। সেখানেই আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেন এই তারকা।

আর্জেন্টিনার হয়ে ৬ ম্যাচে ৬ গোল ও স্পেনের হয়ে ৩১ ম্যাচে মোট ২৩ গোল করেন এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে খেলেছেন। মোট ২৮২ ম্যাচে ২১৬টি গোল করে দলটির সর্বকালের সেরা ফুটবলার বনে যান। পরের দুবছর স্প্যানিওলের হয়ে খেলেও আরও ১১টি গোল করেন।

ব্লন্ড অ্যারো খ্যাত এই ফুটবলারকে অনেকেই বিশ্বে সবচেয়ে  ‘দুর্ভাগা’ ফুটবলারও বলে থাকেন।

ওয়াই/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়