'ফুটপাতে হাড্ডিসার পথশিশুদের দেখলে কান্না আসতো'

প্রকাশ | ০৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৩:১৮ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৯:৩২

সিয়াম সারোয়ার জামিল

ঘরহীন পথশিশুরা প্রচণ্ড শীতে ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে কিংবা ধুলোমাখা খাবার খাচ্ছে এমন দৃশ্য আকরামুজ্জামান শুভ'র মনে খুব পীড়া দিত। মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে তাই গড়ে তোলেন 'স্বপ্নালোড়ন'। রাজধানীতে ৫টি ক্যাম্পে প্রায় ৩শ' পথশিশুর শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসনসহ তাদের জীবন বদলের দেবার প্রত্যায় নিয়ে কাজ করছেন তিনি। দেশের পথশিশুদের সংকট, সমাধান ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন পথশিশুদের এ বন্ধু। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিয়াম সারোয়ার জামিল।     

স্বপ্নালোড়নের শুরুটা কীভাবে?

ছোটবেলা থেকেই পথশিশুদের ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখে খারাপ লাগতো। হাড্ডিসার ধুলোমাখা পথশিশু দেখলে চোখ ফেটে কান্না আসতো। রাস্তার পাশে খালি গায়ে শুয়ে আছে ওরা, দৌড়ে গিয়ে কোলে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতাম। আরাম পেয়ে চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতো। এসব থেকেই ওদের প্রতি ভালবাসা জন্মে যায়। ২০১৩ সালের শেষের দিকে বন্ধুরা মিলে অধিকারবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করি। খুব কম বয়স, সহযোগী কম হলেও কাজ করতে থাকি। একদম শেকড় থেকে শুরুর চিন্তা ছিল। ধীরে ধীরে একটা কাঠামো দাঁড় করায়। ২০১৫ সালের ২০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে স্বপ্নালোড়নের যাত্রা শুরু হয়।

বাংলাদেশে পথশিশুদের সংকটগুলো কেমন?

বাংলাদেশে অধিকারবঞ্চিত পথশিশু রয়েছে প্রায় ১০ লাখ। এদের একটি বড় অংশ পথে পথে জীবন যাপনে অভ্যস্ত। পথশিশুদের ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকায় বাস করে। বাংলাদেশের পথশিশুদের জন্য বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে সংকট। মৌলিক অধিকারগুলো থেকেই তারা বঞ্চিত। যেগুলো আমরা চোখে দেখি না, আবার সুবিধা বলে ধরিও না। সেটাই ওদের স্বপ্ন। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। অনেক সংগঠনই হয়তো ওদের নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।  

এক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে 'স্বপ্নালোড়ন'?

পথশিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন সবকিছু নিয়েই কাজ করছি আমরা। এখন পর্যন্ত রাজধানীতে ৫টি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে আমাদের। যেখানে অনেকটা খেলতে খেলতে গাইতে গাইতে ওদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আমাদের সাথে মিশতে পেরে ওদের যে ভালো লাগা, আমাদের কথাবার্তার মূল্যায়ন করা, ওদের উৎফুল্ল মুহূর্তগুলো দেখাই আমাদের সফলতা।এই মুহূর্তে প্রায় ৩০০ পথশিশু আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে আসে। অনেকেই স্বপ্নালোড়নের শিক্ষাকেন্দ্র থেকে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে অন্য বড় স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। সেই শিশুদেরও পাশে থাকছি আমরা। 

ছবি : পথশিশুদের জীবন বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন আকরামুজ্জামান শুভ

এ কাজে সাধারণ মানুষের সাড়া পেয়েছেন কেমন?

দেশের মানুষদের মানবিকতা সবসময়ই একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে এসব কাজে। একটা বিষয় খেয়াল করলেই আপনি বুঝতে পারবেন, এতোগুলো সংগঠন আমাদের দেশে। এর বেশিরভাগ সংগঠনই কিন্তু সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় চলছে। আমরাও অনেকের সহযোগিতা পাচ্ছি। যদিও এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দরকার সেটা। কারণ ১০ লাখ পথশিশুর সবার জন্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ কথা নয়। এ জন্য আরো অনেক তরুণ প্রাণ ও সমাজের উচ্চবিত্তের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
 
কাজ করতে গিয়ে বিচিত্র কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে?

সে তো হয়েছেই। অনেকেই হয়তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কেউ পথের ধুলোমাখা শিশুদের জন্য কাজ করার কথা শুনে নাক সিটকিয়েছেন। একটা বিষয় আশ্চর্য লাগে, পথশিশুদের জন্য মানুষের যে একটা বিশেষ আগ্রহ, সহযোগিতার মনোভাব অন্য বিষয়গুলোতে সেটা থাকলেও সেই তুলনায় অনেক কম পাওয়া যায়। 

ছবি : একঝাক তরুণ কাজ করছে স্বপ্নালোড়নে 

সামনে কি কি কর্মসূচি আছে?

আগামী ১২ জানুয়ারি পথশিশুদের জন্য ফান্ড জোগাড় করতে দ্বিতীয়বারের মত 'আলোড়নের কনসার্ট' এর আয়োজন করেছি। এতে শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ, আর্টসেল, নেমেসিস, শুন্য'র মতো ব্যান্ডদলগুলোকে পাচ্ছি আমরা। এরপরই ফেব্রুয়ারিতে পথশিশুদের আঁকা ছবি নিয়ে হবে প্রদর্শনী। এছাড়া পথশিশুদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের নির্মিত শর্টফিল্ম নিয়ে উৎসবের কর্মসূচি আছে আমাদের।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

স্বপ্নালোড়নের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে এখন কেবল প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হয়। খাবার দেয়া হয়। সেজন্যে অনেক খরচ। তা সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের। সেটা কাটিয়ে উঠতে পারলে বড় একটা স্কুল দিতে চাই আমরা। সাধারণত প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার পর মূলধারার স্কুলে পথশিশুদের ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। ওইসময় ওদের পরিবারকে সমর্থন দেয়া বা পড়াশোনা চালিয়ে নিতে যা করা প্রয়োজন সেটা করতে অনেকটাপথ লড়তে হবে আমাদের। 

ছবি: পথশিশুদের নিয়ে স্বপ্নালোড়নের 'বৈশাখ উৎসব'
 
এসজে