'যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ৩টি ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ'

প্রকাশ | ২৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৭:১৭ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৯:৩১

সিয়াম সারোয়ার জামিল
প্রতিদিন নিপীড়নের শিকার হয়ে খবর হয় শিশুরা। সেসব পড়ে নিপীড়িত শিশুদের জন্য কিছু করার কথা ক'জন ভাবেন? ইফফাত জাহান তুষার ভেবেছেন। সেই কিছু করার ভাবনা থেকেই গড়ে তুলেছেন  'টিম গ্রাউন্ড জিরো'। স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হাতে নিয়েছেন 'নিরাপদ শৈশবের উদ্দেশ্যে-নিশু' শীর্ষক প্রকল্প। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বিওয়াইএলসি'র পুরস্কারও। শিশুদের না বলা কথা, বয়ঃসন্ধিকালের সংকট ও সেসব নিয়ে 'গ্রাউন্ড জিরো'র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা আরটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন এ তরুণী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিয়াম সারোয়ার জামিল।​
 

নিশু’র শুরুটা কীভাবে?

প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজটা যখন খুলি, তখন শিশুর প্রতি নির্যাতনের খবরগুলোই চোখে পড়ে। এসব দেখে আমি ছটফট করতাম। ভাবতাম, কিছুই কি করার নেই? সেই প্রশ্ন থেকেই 'কিছু করার' ভাবনাটা আসে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি। কথা বলতে গিয়ে আরো পরিষ্কার হয় বিষয়টা। ভেবে দেখলাম, নিরাপদ শৈশব গড়তে শিশুদের সচেতনতা জরুরি। এক্ষেত্রে বাবা-মা ও শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকেই নিশুর শুরুটা। 

বাংলাদেশে নিরাপদ শৈশব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলো কী কী?

দেশের সব শিশুর জন্য এখনো নিরাপদ সমাজ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তারা শারীরিক, মানসিক ও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যৌন নির্যাতনটাই বেশি। তবে নিপীড়নের ঘটনার খুব অল্পই আমরা জানতে পারি। বেশির ভাগই গোপন থেকে যায়। এক্ষেত্রে অভিভাবক-শিক্ষক সবারই সচেতনতা প্রয়োজন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যৌনশিক্ষার বিষয়টাকে এখনো ট্যাবু মনে করা হয়। বয়ঃসন্ধিকালের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও সে সম্পর্কে ধারণা রাখে না। ফলে নীরবে এক ধরনের নির্যাতন চললেও তা প্রকাশ হয় না। সব শিশু একইরকম নয়। সবাই মন খুলে কথা বলে না। সব অভিভাবকও একইরকম নয়। শিশুদের কথা শোনার ধৈর্য অনেকেরই নেই। অথচ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে নিপীড়নের কথা সহজেই জানা যায়। এক্ষেত্রে মায়েরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। 

আপনি বললেন দেশে যৌনশিক্ষা এখনো একটা 'ট্যাবু'। পাঠ্যপুস্তকে তো যৌনশিক্ষা নিয়ে কিছু বিষয় তুলে আনা হয়েছে। স্কুলগুলোতে এর কোনো প্রভাব বা সচেতনতা দেখেছেন?

দেশের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বেশির ভাগ বয়ঃসন্ধি সংক্রান্ত তথ্য আছে। যেটা খুবই দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিক্ষকেরা এসব নিয়ে আলোচনা করেনও না, করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধও করেন না। তাদের যৌন নির্যাতনের মতো বিষয় নিয়ে ধারণাও দেয়া হয় না। অথচ এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারণা দেয়া খুব জরুরি। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকরা এ ব্যাপারে সচেতন কিন্ত কীভাবে নিজের শিশুর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবেন তা বুঝতে উঠতে পারেন না। এজন্য মা-বাবারও এক ধরনের সচেতনতা প্রয়োজন। অভিভাবক, শিক্ষক, পাঠ্যবই- এ তিনটিতেই শিশু শিক্ষার্থীরা আস্থা রাখতে পারে। তাই এই তিনটি ফ্যাক্টর আমাদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

'টিম গ্রাউন্ড জিরো' যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতার কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে কি কোনো বাধার মুখোমুখী হচ্ছেন?

এ বিষয়ে কাজ করার সময় আমরা বাধার সম্মুখীন হবো- এটা বিশ্বাস করেই আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। আমাদের জন্য দুটো চ্যালেঞ্জ ছিল একসঙ্গে, এক. শিশুদের সচেতন করা, দুই. বড়দের এই সমস্যাটার গুরুত্ব বোঝানো। অভিভাবকদের ধারণা, এসব নিয়ে জ্ঞান দিলে ছেলেমেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। এ কারণে প্রথমে আমাদের কাজে অনেকেই বাধা দিয়েছেন। তবে যখন পুরোটা বর্ণনা করি তখন অনেকেই সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। 

 

কোনো বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হয়েছেন?

যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয় তাই আমরা বিষয়গুলো একটু সাবধানে হ্যান্ডেল করি। একটা ছোট ঘটনা বলি, যখন আমরা স্কুলগুলোতে সেশন নিতে যাই তখন সেশনগুলো শেষ করে ওদেরকে আমাদের যোগাযোগের একটা নম্বর দিয়ে আসি। ঢাকার একটা প্রাইমারি স্কুলে সেশন নেয়ার ৫-৬ দিন পরে এক অভিভাবকের কাছ থেকে ফোন পাই আমরা। এক অভিভাবক আমাদের ফোন দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন- আমরা সেশন নিয়ে চলে আসার ২-৩ দিন পর তার মেয়ে তার কাছে যৌন নিপীড়নের একটি ঘটনা খুলে বলে। নিজের ছোট চাচার কাছ থেকে অনেকদিন ধরেই মেয়েটি এবিউজের শিকার হয়ে আসছিল। ঘটনাটি জেনে যদিও মেয়েটির মা ভেঙে পড়েছিলেন কিন্তু এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে।

'গ্রাউন্ড জিরো'র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

গেলো এক বছরে বাংলাদেশের ৯টি স্কুলের প্রায় ১২ শ’ শিশুর সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। চেষ্টা করেছি ওদের সঙ্গে কথা বলার। ওদের সামনেও এটি অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি স্কুলে আমরা একবার যেতে চাই। তাছাড়া যেসব শিশু ভিক্টিমাইজড তাদের জন্য পোস্টট্রমা সাপোর্টের ব্যবস্থা করা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা। পাশাপাশি বাংলাদেশের 'স্পেশাল নিড' এর শিশুদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষদিকে এ নিয়ে একটি কনফারেন্স করার পরিকল্পনাও রয়েছে আমাদের। সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর শৈশব নিরাপদ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে নিশু।

ছবি: টিম গ্রাউন্ড জিরো

এসজে/সি