• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

তবুও ভালোবাসি

অরণ্য গফুর
|  ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৮:১৪ | আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৮:২৯
সব বাসনা যাবে আমার থেমে

মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে,

দুঃখ-সুখের বিচিত্র জীবনে

তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে।

চাওয়া থেকে পাওয়া, আশা থেকে হতাশা, সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, বিনাস থেকে সৃজন, বাঁচার তীব্র আকাঙ্খা থেকে মৃত্যুকে বরণ করার বাসনা। সব মিলিয়ে বিনা সূতায় বাঁধা এক অদৃশ্য বন্ধনের তীব্র টান হলো ভালোবাসা। এটা মানুষের এক বিশেষ মনোবৃত্তিক অবস্থার নাম। বিধাতার এক বিস্ময়কর মূল্যবান সৃষ্টি ভালোবাসা। এটা চোখে দেখা যায় না; হৃদয়ে হৃদয় রেখে অনুভব করতে হয়। মনের গভীরের তীব্র ভালোলাগা থেকে সৃষ্টি হয় ভালোবাসার। জীবনের পূর্ণতার জন্য এটা আবশ্যিক বিষয়ের অপর নাম। এই ভালোবাসা মানুষের সব কাজের প্রেরণা। অকল্যাণকর কাজেও রয়েছে ভালোবাসা বা প্রেমের নিগূঢ় সম্পর্ক। ভালোবাসা ফকিরকে যেমন রাজার ঐশ্বর্য দান করতে পারে, তেমনি রাজাকে পরিণত করতে পারে পথের ভিখিরিতে। ভালোবাসা রচনা করতে পারে সৃজনশীলতার অমরাবতি। আবার ডেকে আনতে পারে ধ্বংসের অমানিশা।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন: কালের কঙ্কাল: কালের এক কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
--------------------------------------------------------

প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজকে ভালোবেসে একদিকে সম্রাট শাহজাহান গড়েছেন প্রেমের অমর নিদর্শন তাজমহল, অন্যদিকে হেলেন-প্যারিসের প্রেম ঐতিহাসিক ট্রয় সভ্যতাকে করেছে ধ্বংস। সহস্র বছর ধরে প্রেম-ভালোবাসা যেমন সৃষ্টি করেছে শিল্প-সাহিত্য-সভ্যতা, সৃজনশীল কাব্য-কাহিনী, স্মৃতিস্তম্ভ; তেমনি অন্যদিকে সংসার ভেঙে করেছে বৈরাগী, করেছে সন্ন্যাসী, ধর্মান্তর-দেশান্তর-বিদ্রোহী। তবে মানুষ যখন ভালোবাসার সত্ত্বাটির সাথে মনে-প্রাণে জড়িয়ে যায়, তখন অনেক অসাধ্য তার কাছে তুচ্ছ হয়ে ওঠে।

এতকিছুর পরও ভালোবাসার পরিপূর্ণ সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত কেউ বিশ্লেষণ করতে পারেনি বলেই ধরা হয়। আজও প্রেমের রহস্য এত সুকঠিন, সুবিশাল। নানা নিগূঢ় তত্ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ এক বস্তু এই প্রেম। বিচিত্র বলেই একে পুরোপুরি জয় করা সম্ভব হয়নি। তাইতো এই শব্দটিতে সবার দুর্ণিবার আকর্ষণ। তবে ভালোবাসা ও প্রেমকে অনেকে আলদা করতে চেষ্টা করেছেন। ভালোবাসাকে নিষ্কাম আর প্রেমকে কামযুক্ত আখ্যা দিয়েছেন অনেক মনীষী। কিন্তু আমরা সে তর্কে না গিয়ে প্রেম-ভালোবাসাকে একই আয়নায় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

ভালোবাসা কখনো সমুদ্র, কখনো বা আকাশের সিমাহীন শূণ্যতার চেয়ে সীমাহীন। অনেকে বলেছেল, ভালোবাসলে নারী হয় নরম নদী আর পুরুষ জ্বলন্ত কাঠ! আবার কারো কারো মতে প্রেমে নারী হয় সর্বভূক আর পুরুষ রিক্ত। নারীদের মতে প্রেম এবং পুরুষ দুটোই রহস্যময়! তারা ভাবে পুরুষের জটিল মন সমুদ্রের চেয়েও একটু বেশি গভীর; যার কখনও তল খুঁজে পাওয়া যায় না। হেমন্তের আকাশের মতই কখনো মেঘ, কখনো স্বচ্ছ্ব। কখনো পাথরের মত শক্ত, কখনো কাঁদামাটি। একইভাবে পুরুষের কাছেও এক চির রহস্য ও বিস্ময়ের নাম নারী। তাকে চেনা যেন শরতের আকাশের পূর্বাভাস দেবার মতো দুঃসাধ্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা’। জে.বি. ইয়েটস বলেছেন, ‘যে পুরুষ একটি নারীকে বুঝতে পারে, সে পৃথিবীর যেকোনো জিনিস বুঝতে পারার গৌরব করতে পারে’।

প্রেম জীবনকে করে ঐশ্বর্যবান, হৃদয়কে করে বিশাল। সার্থক ভালোবাসা দুঃখ-যন্ত্রণা জয়ের মহৌষধও বটে। ধন-সম্পদ ফুরিয়ে যায়, আরাম-আয়েশ অন্তর্হিত হয়, আশা শুকিয়ে যায়, রূপ-যৌবন সময়ের ব্যবধানে বিবর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসা অবিনশ্বর। মানুষ মরণশীল। তাই মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। কিন্তু ভালোবাসা অমর। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুগে যুগে ফ্যাশনে ও রুচিতে পরিবর্তন এসেছে, বদল এসেছে ভালোবাসা প্রকাশের ধরনেও। তাই বলে প্রেমের তাৎপর্য, পবিত্রতা ভুলে গেলে হবে না। ইদানীংকার বিশেষ করে টিনএজ ছেলেমেয়েরা প্রেমের সঠিক অর্থ এবং যথার্থ মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়ে সাময়িক আবেগে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেহকেন্দ্রিক প্রেমের দিকে বেশি ঝুঁকছে বা ঝুঁকতে চায়। ফলে তারা না বুঝে বিপথগামী হচ্ছে এবং অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়ে সত্যিকার প্রেমের অপমান-অবমূল্যায়ন করছে। প্রেমের আবেগে সব ভুলে তারা মনে করে -

পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে

পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দুজনার মনে!

ভালোবাসা মানে কি হাতে হাত রেখে পার্কে ঘোরা? ভালোবাসা মানে কি কাঁধে বা কোলে মাথা রেখে গল্প বলা? ভালোবাসা মানে কি প্রেমিকার চুলের সুঘ্রাণ? নাকি প্রেমিকের পকেট ফাঁকা করে শপিংমলে পোশাক আর গয়নার সমাহারে মন ভোলানো। অথবা বন্ধুর ফাঁকা বাসায় একান্তে সময় কাটানো?-- না! এসব ব্যাপার-স্যাপারে অন্তত আমার সমর্থন নেই।

তবে ভালোবাসা মানে কি দেহ সীমার বাইরে দুটি শুদ্ধ হৃদয়ের নির্মল আত্মীয়তা? সেইসঙ্গে নিজেকে কষ্টের আগুনে পুড়িয়ে মনকে খাঁটি সোনা করে গড়ে তোলা? কখনও মনে হয় ভালোবাসা মানে অবাধ মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানের কলির মতো— ‘তুমি সুখ যদি নাহি পাও/যাও সুখের সন্ধানে যাও/আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়ও মাঝে/আরো কিছু নাহি চাই গো’। অর্থাৎ তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে মুক্ত করে দাও। সে যদি তোমাকে ভালোবাসে তাহলে তোমার কাছে ফিরে আসবে। ডেল কার্নেগীর মতে, পৃথিবীতে ভালোবাসার একমাত্র উপায় হলো, প্রতিদান পাওয়ার আশা না করে ভালোবেসে যাওয়া। অর্থাৎ সেই ত্যাগের গুণেই মহীয়ান হওয়ার কথা। আবার কখনো ভালবাসা মানে অদৃশ্য সূতোয় বাঁধা পড়া। ‘তোমায় বেঁধে রাখবো চুলে ‘বাঙালি নারীর বহুল প্রচলিত এক রপ্ত-বাক্য।

মনীষীরা ভালোবাসাকে দেখেছেন নানা রঙে-রূপে। কেউ ভালবাসাকে দেখেছেন জীবন হিসেবে কেউ বা বিনাশের অপর নাম হিসেবে। প্লেটোর মতে, ‘প্রেমে পড়লে সবাই কবি হয়ে যায়’। আবার সেন্ট জিরোথী বলেছেন, ‘ভালোবাসার কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিমাপ নেই’। অর্থাৎ এটা এক মায়াজাল। আনাতোল ফ্রাঁস দেখেছেন ‘মানুষের একটি শাশ্বত ও মহান প্রয়োজন হচ্ছে প্রেম’। অস্তিত্বের সাথে ভালোবাসাকে মিলিয়েছেন —ফয়ের বাখ। তাঁর মতে, ‘যেখানে প্রেম নেই, সেখানে সত্যি নেই; কেবলমাত্র তারই মূল্য আছে যেকোনো কিছুকে ভালোবাসে, ভালোবাসা না থাকলে নিজের অস্তিত্ব না থাকারই শামিল। বিরহ-মিলনের সমীকরণ টেনে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘যাকে সত্যিকারের ভালোবাসা যায় সে অতি অপমান, আঘাত করলে, হাজার ব্যথা দিলেও তাকে ভোলা যায় না’। ‘প্রেম হচ্ছে সবকিছুর শুরু, মধ্য এবং অন্ত’ এ মতটি লার্কভেয়ারের। ভালবাসাতেই মানব জীবনের সৌন্দর্য দেখেছেন কীটস। তাঁর কথা- ‘ভালোবাসা যে পেল না, আর ভালোবাসা যে কাউকে দিতে পারল না, সংসারে তার মতো দুর্ভাগা আর নেই’।

ভালোবাসাকে অনেকে নারী-পুরুষের টান বা পরিবারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। এটা কখনো শাশ্বত ভালোবাসা নয়। মানবতার জন্য যার হৃদয়ে টান অনুভূত হয় না, সে প্রেমিক/প্রেমিকা হতে পারে না! প্রেমের সংজ্ঞা যা-ই হোক ‘প্রেম শাশ্বত, প্রেম পবিত্র, প্রেম স্বর্গীয়‘এ বিষয়ে মতদ্বৈততা নেই। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন—যে ভালোবাসা দুজনের দেহকে দুদিক থেকে আকর্ষণ করে মিলিয়ে দেয় তা ভালোবাসা নয়, সেটা অন্য কিছু বা মোহ আর কামনা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, প্রেম হচ্ছে দুটি আত্মার নির্মল আত্মীয়তা; দেহের নয়। ভালোবাসা আছে, থাকবে প্রিয়-প্রেয়সীর হৃদয় জুড়ে, স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কে, বন্ধুত্বে, ভাই-বোনের নির্ভেজাল সম্পর্কে, বাবা-মার নির্ভেজাল স্বার্থহীন আদর-যত্নে। শুভাকাঙ্ক্ষী, কোনো কাছের মানুষের শাসনে-বারণে। আর সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সময়ের অনন্ত স্রোতে প্রগাঢ় আবেগে। রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘প্রেম এমন বস্তু যা শুধু মস্তিষ্কে নয়, বুকের প্রতিটি রক্ত কণিকার মধ্যে উপলব্ধি করতে হয়। তিনি সারাজীবন মানসী প্রতিমার ধ্যানেই মগ্ন থেকেছেন; তাকে স্পর্শ করতে পারেননি। প্রিয়ার বিরহে কাতর কবি নজরুল ইসলামও ধরতে পারেননি রহস্যময়ীর শাড়ির আঁচল। তাইতো তিনি লিখেছেন—

‘নাই-বা পেলাম আমার কণ্ঠে তোমার কণ্ঠহার

তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহংকার’।

সকল ভালোবাসার মধ্যে স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসাই সবচেয়ে নির্মল; শাশ্বত, সুন্দর ও অমলিন।  ভালোবাসাকে পূর্ণাঙ্গ, স্বর্গীয় ও বিস্তৃত রূপ দেয় মূলত স্রষ্টার প্রেমই। এটা ছাড়া অন্যান্য প্রেম হয়ে পরে অনেকটাই অর্থহীন; কখনো কলুষময়। কুরআনে রয়েছে ‘বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার নিজ ফয়সালা প্রকাশ করেন। আর আল্লাহ অবাধ্যদের হেদায়েত করেন না’। (সূরা তাওবাঃ আয়াত ২৪)। এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সবকিছুর ওপর আল্লাহকেই ভালোবাসতে হবে। অর্থাৎ পূর্ণ মুসলিম হতে হলে, সবার চেয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রেমেই বেশি হাবুডুবু খেতে হবে। আর আল্লাহ প্রেম প্রকাশ পায় মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই। তাসাউফের আলেমদের মতে, এখানে যে বিচরণ করতে পারবে সে প্রেমের এমন এক স্বাদ পাবে যে, অন্যান্য সকল চাওয়া-পাওয়া তাকে বিচলিত করতে পারবে না। তার সাথে প্রেয়সীর মন না মিললে, সে সম্পর্কটা স্থায়ী হওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে। ভালোবাসার মাহাত্ম কত বড় তা বোঝা যায় এ হাদিসটি থেকে- ‘যে যার সাথে ভালোবাসা রাখবে, কিয়ামতের দিন সে তার সাথে থাকবে’।  এখানেই হয়তো শ্বাশত আর অস্থায়ীত্বের ব্যবধান।

ভালোবাসার জন্য কোনো দিনকে নির্দিষ্ট করে নেয়া মূলত ভালোবাসাকে সংকীর্ণ করে ফেলারই সামিল। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তই ভালোবাসার জন্য। এ তত্ত্ব মেনে নিলেই ভালোবাসার স্পর্শে পৃথিবীতে যে অশান্তি আছে তা কমিয়ে আনা সম্ভব। একমাত্র ভালোবাসাই পারে পৃথিবীর সব জরাজীর্ণতা দূর করতে। যে ভালোবাসতে জানে, তার মন হয় উদার। সেই কেবল রচনা করতে পারে সুন্দর পরিবার, সমাজ, দেশ ও পৃথিবী। তাই ভালোবাসার মধ্যেই জীর্ণতার মুক্তি নিহিত। আসুন আমরা মন উজার করে ভালোবাসি।

আরও পড়ুন:

জেবি/এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়