• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শাঁখারীবাজারবাসী

কুশল ইয়াসির
|  ২৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১২:৩০ | আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:০৯
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার। প্রায় ৪শ’বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। এলাকার নামটি এসেছে শাঁখারীদের বংশগত পেশা শাঁখা তৈরি থেকে।

২০০৯ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকার ৯৩টি ভবন ও পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারসহ কয়েকটি এলাকা সংরক্ষিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। গেজেটে আছে শাঁখারীবাজারের ১শ’ ৪২ টি সংরক্ষিত (হেরিটেজ) বাড়ি। তবে ভবনগুলোর প্রায় সবগুলোই বিপজ্জনক।

এর মধ্যে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২৬টি বাড়ি যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি বাড়ির দেয়াল ও ছাদে মারাত্মক ফাটল দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে বৃক্ষলতা।

ভবনগুলো সংস্কার করতে গেলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত 'নগর উন্নয়ন কমিটি'র অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি না মিললে নিজস্ব সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও সংস্কার কাজে হাত দেয়া যায় না। আর নিজস্ব ভবনগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লেও ভবনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় না। এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কার কাজ করলেই কপালে জোটে রাজউকের মামলা।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘নগর উন্নয়ন কমিটি’।  গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে করা হয়েছে কমিটির প্রধান।

শাঁখারী বাজারকে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ২০০৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০ কোটি টাকায় একটি প্রকল্প চালু হয়। এর আওতায় শাঁখারী বাজারের ঝুকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার এবং পয়ঃনিষ্কাশনসহ আধুনিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। যদিও প্রকল্পটি পরে চালু হয়নি।

২০০৯ সালের গেজেটে নগর উন্নয়ন কমিটি অনুমোদন ব্যতীত আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ, পুনঃর্নিমাণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন অথবা সংযোজনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০০৪ সালে ছয়তলা বাড়ি ধসে ১৮ জন নিহত হবার ঘটনায় দেশ-বিদেশে বহুল আলোচিত শাঁখারীবাজার এখন আরও বিপজ্জনক। সেখানে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ছাড়া একের পর এক বহুতল ভবন তৈরি হচ্ছে।

হেরিটেজ ভবন পুনরায় তালিকা করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক শিরিন আক্তারকে আহ্বায়ক করে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও বুয়েটের প্রকৌশলী ও স্থানীয় বাড়ীওয়ালা নিয়ে একটি কমিটি করা হয়।

পরে আরবান স্টাডি গ্রুপের (এএসজি) প্রধান নির্বাহী তৈমুর ইসলামকে পুনঃতালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়ে একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়।

তৈমুর ইসলাম সোমবার আরটিভি অনলাইনকে বলেন, সাব কমিটির প্রতিবেদন আসছে দু’সপ্তাহের মধ্যে জমা দেয়া হবে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর হেরিটেজ রক্ষা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্প ছাড়াও ভবনগুলো সংরক্ষণে কয়েকটি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এতে ঋণ নিয়ে ভবন সংরক্ষণ করা সম্ভব। সরকার ও স্থানীয়দের কারোই ক্ষতি হবে না।

রাজউক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় হেরিটেজ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৫শ’ ৭৩টি। এর মধ্যে ৩শ’ ২১টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২শ’ ৫২টি হেরিটেজ ভবন তালিকাভুক্ত রয়েছে। রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙা নিয়ে আইনি জটিলতার পাশাপাশি রাজউক ও ডিএসসিসির মধ্যে বিরোধ রয়েছে। রাজউক বলেছে, পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজউকই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে গেলো বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শাঁখারীবাজার মোড়ে ‘জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি’শীর্ষক অনুষ্ঠানে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকার সড়ক সংস্কারের ঘোষণা দেন মেয়র সাঈদ খোকন। এসময় তিনি শহরের প্রতিটি অলিগলি সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করে দেয়ার আশ্বাস দেন।

শাঁখারী বাজার ভূমি মালিক স্বার্থ রক্ষা পঞ্চায়েত কমিটির আহ্বায়ক অজয় নন্দী জানান, গেলো বছরের ২১ আগস্ট শাঁখারীবাজার মোড়ে শনি পূজার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এসময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের বলে, শাঁখারীবাজারকে হেরিটেজ ঘোষণা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আছে।

অজয় কুমার নন্দী বলেন, এলাকার বাসিন্দারা বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষ। আমরা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে চাই। তার সঙ্গে আমাদের  ভবিষ্যত নিয়েও ভাবতে চাই। ১শ’ ৪২ টি ভবনের মধ্যে দিন দিন বসবাসকারীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। ভবনগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় যে কোন সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নয় বরং সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত চাই আমরা।

ওয়াই/এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়