close
ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০১ পৌষ ১৪২৪

বাংলাদেশের শিশুদের নিউমোনিয়া থেকে বাঁচায় যে শ্যাম্পুর বোতল

অনলাইন ডেস্ক
|  ১২ অক্টোবর ২০১৭, ২৩:১২ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৭, ২৩:১৬
ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে আমার প্রথম রাত। চোখের সামনেই দেখেছিলাম তিনটি বাচ্চার মৃত্যু। এত অসহায় মনে হয়েছিল নিজেকে যে কেঁদেই ফেলেছিলাম। কথাগুলো বলছিলেন ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিস্তি।

১৯৯৬ সালে তিনি কাজ করছিলেন বাংলাদেশের সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে। সেই সন্ধ্যায় নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে নিউমোনিয়া থেকে শিশুদের বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার শিশু মারা যায় নিউমোনিয়ায়। প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকা মহাদেশে।

দুই দশকের গবেষণার পর ড. চিস্তি এবার নিয়ে এসেছেন একেবারেই সস্তা একটি উপায় যা হাজারো বাচ্চার জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

দামি যন্ত্র

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় ফুসফুস। স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া কিংবা শ্বাসযন্ত্রের সিনসিশিয়াল ভাইরাস(আরএসভি) সংক্রমণ ঘটায় ফুসফুসে যা ফুলে ওঠে, ভরে ওঠে পুঁজে বা তরল পদার্থে, যা অক্সিজেন গ্রহণ করে নিঃশ্বাস নেয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

উন্নত দেশগুলোর হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করানো হয়। কিন্তু সেই যন্ত্রগুলোর প্রতিটির দাম ১৫ হাজার ডলার এবং যন্ত্রগুলো চালানোর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন।

পুরো ব্যাপারটা অনেক বেশি খরচসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অল্পমাত্রায় অক্সিজেনের যোগান বাড়ানো সত্ত্বেও প্রতি সাত শিশুর একটি মারা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে কাজ করার সময় ড. চিস্তি একটি বুদবুদ তৈরির সিপিএপি যন্ত্র দেখেছিলেন। যন্ত্রটি ফুসফুসে নিয়মিত বায়ুর যোগান দিয়ে ইতিবাচক চাপ তৈরি করে যাতে ফুসফুস কাজ করা থামিয়ে না দেয়। শরীরেও পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পৌঁছায়। কিন্তু সেই যন্ত্রও বেশ দামি।

কর্মসূত্রে যখন তিনি ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশের ডায়েরিয়া অসুখের চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে, তিনি কাজ করতে শুরু করেছিলেন সহজ, সস্তা একটি বাবল সিপিএপি যন্ত্র তৈরির ব্যাপারে।

এক সহকর্মীর সঙ্গে তিনি কাজ করছিলেন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে ফেলে দেয়া একটি প্লাস্টিকের শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে। প্রথমে তাতে পানি ভরে অন্যপ্রান্তের খানিকটা প্লাস্টিকের অংশ ডুবিয়ে দিয়েছিলেন অন্য একটি টিউবে।

তিনি দেখেন, বাচ্চারা অক্সিজেন টেনে নেয় একটি জলাধার থেকে এবং নিঃশ্বাস ছাড়ে একটি টিউবের মাধ্যমে যা ডোবানো থাকে একটি পানির বোতলের মধ্যে, যার ফলে বাতাসে বুদবুদ সৃষ্টি হয়। বুদবুদ থেকে সৃষ্ট চাপ ফুসফুসের মধ্যে ছোট বায়ুথলিগুলোকে খুলে রাখতে সাহায্য করে।

চার-পাঁচটি রুগ্ন বাচ্চার ওপর পরীক্ষা করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আশাতীত উন্নতি দেখতে পান

সফল পরীক্ষা

রুনা নামের যে কন্যাশিশুর চিকিৎসা করানো হচ্ছিল তার মা কোহিনূর বেগম বলেন, চিকিৎসকদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। অক্সিজেন পাঠানোর নল, শরীরে খাদ্য সরবরাহের জন্য একটি নল এবং সাদা গোল একটি বোতল যুক্ত করা হচ্ছিল বাইরে যেখানে বুদবুদ তৈরি হচ্ছে তার সঙ্গে। চিকিৎসা শেষে যখন বাচ্চা সুস্থ হয়েছিল, খুব খুশি হয়েছিলাম।

দু-বছর পড়াশোনার পর ড. চিস্তি তার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন দ্য ল্যান্সেট পত্রিকায়। তার পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের যন্ত্রের মাধ্যমে অল্পমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের চেয়েও এই বাবল সিপিএপি যন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসা করিয়ে শিশুমৃত্যুর হার অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। মাত্র ১.২৫ ডলার বা ১ পাউন্ড খরচে। যন্ত্রটি ব্যবহারে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যাচ্ছিল ৭৫ শতাংশ।

আর এই নতুন যন্ত্র অক্সিজেনের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল, যা বুঝিয়ে দিয়েছিল হাসপাতালে অক্সিজেনজনিত খরচের পরিমাণ আগে বছরে যেখানে ৩০ হাজার ডলার খরচ হচ্ছিল, এই যন্ত্রের ব্যবহারে তা নেমে এসেছিল ৬০০০ ডলার বা ৪ হাজার ৬০ পাউন্ডে।

আদ-দিন মহিলা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ড. এআরএম লুৎফুল কবীর জানান, দেশব্যাপী আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে এ পর্যন্ত যে ফল পাওয়া গিয়েছে, তা যথেষ্ট উৎসাহজনক।

তিনি জানান, আমার তো মনে হয়, নতুন এই যন্ত্রের মাধ্যমে শিশু মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব, কারণ কম খরচের কারণে হাসপাতালগুলোও এটা ব্যবহার করতে পারবে বেশি করে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বাচ্চা উপকৃত হয়েছে এই কম দামি যন্ত্রের ব্যবহারে।

ড. চিস্তির পদোন্নতি হয়েছে। নিজের হাসপাতালে তিনি এখন ক্লিনিক্যাল রিসার্চ বিভাগের প্রধান। কিন্তু তিন সন্তানের জনক এখনো হাসপাতালের ওয়ার্ডে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলার সময় ঠিকই বের করে ফেলেন।

যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কুড়ি বছর আগের প্রতিজ্ঞা পালন করতে পেরে কেমন লাগছে, উত্তরে বলেন, আমার বলার কোনো ভাষা নেই।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিটি হাসপাতালে তিনি এই সিপিএপি যন্ত্র দেখতে চান। হাসপাতালগুলো যাতে এই যন্ত্র সুলভে পেতে পারে তার ব্যবস্থাও করতে চান।

তিনি বলেন, যখন সেই দিনটা আসবে, আমরা বোধহয় বলতে পারব যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুমৃত্যুর হার প্রায় শূন্যে পৌঁছেছে।

গত মঙ্গলবার বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

কে/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়