• ঢাকা বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর : আদিবাসী ঐতিহ্যের বাতিঘর (ভিডিও)

কাজী মনজুরুল ইসলাম ও মুহাম্মদ শাহীনুজ্জামান
|  ০৮ আগস্ট ২০১৭, ১০:৪৮ | আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৭, ১৭:১২
মুরংদের ঐতিহ্যবাহী সাচিয়াকুম বা গোহত্যা উদযাপন, খাসিয়া পল্লীর জীবনযাত্রা, পাকিস্তানের পাঠান বা সিন্ধি আদিবাসীদের ঘরোয়া জীবন, বমদের ব্যবহৃত বিভিন্ন হাতিয়ার, মরমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদ, পাহাড়ি এলাকায় জুমচাষ বা মাচাং ঘরে বসে থাকা চাকমা নারী-পুরুষের দৃশ্য, অথবা আরো বিভিন্ন সব আদিবাসী গোষ্ঠীর বৈলাসহ (হাতবালা) মনকাড়া সব অলংকার বা নকশা করা তৈজসপত্র এসব সম্পর্কে আমরা কতটাই বা জানি। হয়ত এ ধরনের বৈচিত্র্যময় জীবন সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণাই ছিলো না। কিন্তু জীবন যে কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে তার কিছুটা হলেও আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে এলে। 

এশিয়া মহাদেশে যে দুটি জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর রয়েছে তার একটি রয়েছে জাপানে আর অন্যটি হলো চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের এই জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটি। এক তলা বিশিষ্ট চট্টগ্রামের এই জাদুঘরটিতে একটি কেন্দ্রীয় হলঘরসহ চারটি গ্যালারি রয়েছে। ১১টি কক্ষে বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আদিবাসীদের প্রায় ২ হাজারের উপর নিদর্শন আছে। 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক আচার, ঐতিহ্যের নমুনা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৬৫ সালে নির্মিত জাদুঘরটি ১৯৭৪ সালে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। ১ দশমিক ৩৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটিতে বাংলাদেশের ২৭টি আদিবাসী গোষ্ঠীর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তানসহ ৫টি দেশের জাতিগোষ্ঠীর নিদর্শন রয়েছে। বিভিন্ন মডেল, আলোকচিত্র, মানচিত্র, কৃত্রিম পরিবেশ, দেয়ালচিত্র, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ফলকসহ বিভিন্ন তথ্যচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে এখানে। 

বাঙালি জাতিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক আচার, পোশাক, অলংকারের নিদর্শন রয়েছে এতে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্প্রদায় হলো বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, খুমি, মুরং, ত্রিপুরা, মনিপুরি, হাজং, কোচ, দালু, মান্দাই, সাঁওতাল, রাজবংশী, পাকিস্তানের পাঠান, সিন্ধী, পাঞ্জাবি ভারতের আদি, ফুত্তয়া, মিজো; রাশিয়ার কিরগিজ এবং অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়। ফলে জাদুঘরটি একটি জাতিতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রও বলা যেতে পারে। ব্যতিক্রমী এই যাদুঘরটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। যা দেখতে এসে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা বইয়ের পড়ার সঙ্গে বাস্তবতাকে মিলিয়ে নেন।   

এর মধ্যে ঢাকার বনশ্রী থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, আমাদেরে এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না। তবে এখানে এসে তাদের চাল চলন, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক জীবন সম্পর্কে অনেক ধারণা পেলাম। বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি। ওরাতো বইয়ে অনেক কিছু পড়ে। বইয়ের সঙ্গে বাস্তবে অনেক কিছু মেলানো সম্ভব হয় না। এখন ওরা বইয়ে যা পড়েছে তা মেলাচ্ছে। অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের এখানে নিয়ে আসলে অনেক কিছু শিখতে পারবে।

খাগড়াছড়ির বাসিন্দা মৃণালী চাকমা, পরিবার নিয়ে থাকেন নগরীর আগ্রাবাদে। বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন জাদুঘর পরিদর্শনে। তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, আগে তো অনেকবার এসেছি। এখন বাচ্চা একটু বড় হয়েছে তাই ওকে দেখাতে নিয়ে এসেছি। তবে জাদুঘরটি আরো একটু সংস্করণ করলে ভালো হতো। কারণ এখনতো অনেকের মন-মানসিকতা আধুনিক হয়েছে তাই আরো অনেক কিছু সংযোজন করা গেলে ভালো হতো। 

চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে আসা মোহাম্মদ ইয়াসিন আরটিভি অনলাইনকে জানান, এই জাদুঘরে ঐতিহ্যের অনেক কিছু আছে, যা থেকে শুধু আমাদের দেশের আদিবাসী সম্পর্কে না পৃথিবীর অন্যান্য আদিবাসী সম্পর্কেও জানতে পারছি। এখানে আমাদের দেশের ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটগুলো এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যা আমরা বাস্তবভাবে দেখতে পাচ্ছি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজে তা ব্যবহার করতে পারবো।

আঁখি আক্তার এসেছেন তার বন্ধুদের সঙ্গে। তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, আগের যুগের মানুষের যে জীবনযাত্রা তাতো আমরা দেখতে পারিনি। কিন্তু এখানে এসে তাদের সম্পর্কে আমরা জানতে পারছি। ভালো ধারণা পেয়েছি। এখানে গারোদের সম্পর্কে ধারণা পেলাম এছাড়া বনবিড়ালসহ অনেক জীবজন্তু আছে ফলে সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কেও পরিচিত হলাম।

তবে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত এই জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটির সঙ্গে এখনো অনেকেরই পরিচয় নেই। মূলত প্রচারণার অভাবেই অনেকে জাদুঘরটি সম্পর্কে জানেন না। এমনকি যেসব বিদেশি পর্যটক চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন তাদের জন্য এই জাদুঘরটি হতে পারে আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর উন্নয়নে তেমন একটা সুদৃষ্টি পড়েনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। ফলে অনেকটা অবহেলাতেই পড়ে আছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জাতিতাত্ত্বিক যাদুঘরটি। 

এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলি ইয়াসমিন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, এই জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রধান জাদুঘর। এটি দক্ষিণ এশিয়ারও একটি অন্যতম বড় জাদুঘর, এখানে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে। এই জাদুঘরে ঢুকেই দর্শকরা বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সম্পর্কে তথ্য পাবে। প্রতিটি গ্যালারিতে চাকমা, মারমাসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নিদর্শন সাজানো আছে। এসব নিদর্শন ও ছবি থেকে বর্তমানে তাদের বিবর্তন, তারা এখন কোন পর্যায়ে আছে, আগে কেমন ছিল এই বিবর্তনগুলো দেখতে পারবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের কোথায় কোথায় তাদের বসবাস সে সম্পর্কেও জানতে পারবে। 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এই জাদুঘরের উন্নয়নে। জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং ডিসপ্লে উন্নয়নের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় বিলুপ্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক নিদর্শন এবং ছবি সংগ্রহ করেছি। এছাড়া এ জাদুঘরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং দর্শক চাহিদা বৃদ্ধির জন্য ৪০ কেবি একটি জেনারেটর স্থাপন করেছি, ডিপ টিউবওয়েল, একটি গ্যালারি পরিবর্তন করেছি, ডিসপ্লেগুলোকে নতুন আঙ্গিকে আন্তর্জাতিক মানের করার চেষ্টা করেছি। দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করেছি। জাদুঘরটি একটি আন্তর্জাতিক মানের জাদুঘরে পরিণত করতে ভবিষ্যতে আমরা আরো কর্মসূচি নেবো।

চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার দিকে ৫০ গজের মত হাঁটলেই রাস্তার দক্ষিণ দিকে জাদুঘরটির অবস্থান। জাদুঘরের প্রবেশ পথেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার। দেশীয় প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য টিকেটের মূল্য ধরা হয়েছে ২০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকের জন্য ১০০ টাকা, অন্যান্য দেশের নাগরিকের জন্য ২০০ টাকা। আর ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো টিকেটের প্রয়োজন নেই। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে ৬টা এবং শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। রোববার জাদুঘরটি বন্ধ থাকে এবং সোমবার দুপুর ২টার পর থেকে খোলা থাকে।

 

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়