• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

মিঠে শৈশব

মিথুন চৌধুরী, রুমকি খান
|  ২৩ জানুয়ারি ২০১৭, ১৬:৫৮ | আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৭, ১৯:১৮
পকেটভর্তি ব্যাঙাচি ছানা, দারকিনা ঝাঁক,
শাপলার ডাঁটা, শালুক, ঢ্যাঁপ,
আর কলমি শাক।
স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাহাদুরি,
মৃদু হাওয়ায় উড়াতাম পলিথিনের ঘুড়ি,
বরষার জলে বড়শি লয়ে চন্ডিদাস।

সেই হারানো ধুলোমাখা দিন, বুকের ভেতর আজো রঙিন শৈশব ডাকে শুধু আয়, আয়, আয়। নাগরিক কোলাহলে সবাই কুড়িয়ে তোলে শৈশব। সার্বিকভাবে দুরন্তপনা শৈশবের সঙ্গে আজ হারাতে বসেছে আবহমান গ্রামবাংলার বেশকিছু খেলা। এক সময় গ্রামীণ লোকসমাজের শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা করে সময় কাটাতো। পুরো শৈশবজুড়েই থাকতো দুরন্তপনা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলীন হতে বসেছে বেশকিছু খেলা। চার দেয়ালের খাঁচায় আটকে যাচ্ছে শৈশব।

শিশুবিদরা বলছেন, গ্রামবাংলার খেলাধুলা যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে হারাচ্ছে শিশুদের মেধাবিকাশের উপকরণ। ইউটিউব বা ভিডিও গেমসে আটকে যাচ্ছে শৈশব।

শৈশবের ফেলে আসা কিছু খেলা আজো মনে দোলা দিয়ে যায় সবার প্রাণে। সেসব খেলা যেমন ছিল জনপ্রিয় তেমনি স্মৃতিমধুর।শৈশবের দুরন্তপনা ছিল শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মাধ্যম। গ্রামীণ খেলা আমাদের আদি ক্রীড়া সংস্কৃতি। এক সময় গ্রামীণ খেলাধুলা আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করতো। গ্রামীণ খেলা বিলুপ্ত হতে হতে আজ তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ছেলেবেলার ছোটখাটো কিছু জিনিস, যা আপনাকে স্মৃতিকাতর করবে; সেসব নিয়ে এ আয়োজন-

ইচিং বিচিং :

ইচিং বিচিং’ শৈশবের একটি জনপ্রিয় খেলা। এ খেলায় বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে উঠতো শিশুরা।

হা-ডু-ডু (কাবাডি) খেলা :

প্রতিটি দেশের একটি জাতীয় খেলা থাকে। ইংরেজদের জাতীয় খেলা ক্রিকেট, আমেরিকানদের জাতীয় খেলা বেসবল। আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু। কিন্তু কালক্রমে এ খেলার কদর হারিয়ে যেতে বসেছে।

মার্বেল :

স্কুল ফাঁকি দিয়ে বা বিকেলে রাস্তার পাশে মার্বেল খেলার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? মুঠোভর্তি মার্বেল দাগের বাইরে ছুঁড়ে মেরে, নির্দিষ্ট আরেকটি মার্বেলে লাগানোর সে কী চেষ্টাই না করেছেন এককালে!

লাটিম : 

ডিম্বাকৃতির কাঠের টুকরোর মধ্যে ছোট্ট একটা পেরেক ঠোকা। যেটার বাইরে রশি পেঁচিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে মারলেই ঘুরতে শুরু করে বনবন। এ লাটিম খেলেই অনেকে পার করে দিয়েছেন ছেলেবেলার পুরো দিন।

কুতকুত খেলা: 

কুতকুত খেলা গ্রামবাংলার মেয়েদের খুবই প্রিয় খেলা। স্কুল থেকে আসতে না আসতে দল বেধে মেয়েরা খেলতো এ খেলা। ঘর কেটে মাটির চাড়া দিয়ে লাফানো দিনগুলো মনে পড়লে শৈশবে ফিরতে বাধ্য হন নারীরা।

গুলতি : 

গাছের ডাল কেটে তৈরি করা হতো ইংরেজি ‘ওয়াই’ আকৃতির একটা কাঠামো। ওপরের দুদিকে বেঁকে থাকা ডালের মাথায় শক্ত করে বেঁধে নেয়া হতো ইলাস্টিক। এবার ইলাস্টিকের ঠিক মাঝ বরাবর একটা মার্বেল, শক্ত মাটি বা খোয়া রেখে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুঁড়ে মারলেই ঠুস! লেগে গেলে সে কী আনন্দ!

সুপারিপাতার গাড়ি : 

সুপারি বা নারকেল গাছের শুকনা পাতার গাড়িতে বসে আছেন আপনি। আর সামনে ধুলো উড়িয়ে সেটা টেনে নিয়ে ছুটছে আপনার বন্ধু। হালের ঝাঁ-চকচকে গাড়িতে বসে সেসব দিনের কথা ভাবলে শিহরিত হবেন কি না?

চোর-পুলিশ খেলা : 

চার টুকরো কাগজ। একেকটিতে নম্বরসহ লেখা ‘চোর’, ‘পুলিশ’, ‘ডাকাত’ আর ‘বাবু’। মামুলি সেই কাগজগুলো নিয়েই কেটে যেতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কে চোর হচ্ছে আর কেই-বা বাবু, সেটা নিয়ে অনেক সময় ঝগড়া বেধে যেতো।

কানামাছি : 

কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ...এ লাইনটি কানে আসা মাত্র মনে পড়ে যায় শৈশবের দুরন্তপনার কথা। এ খেলার নাম শুনে নাই, এমন লোক পাওয়া যাবে খুব কম। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ছোট ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে এ খেলায় মেতে উঠতো।

ক্রিকেট : 

শৈশবের কথা মনে পড়লেই এমনি এমনি এসে যায় ক্রিকেট খেলার কথা। গ্রামবাংলায় স্কুল ছুটি বা টিফিনের ফাঁকে জমতো এ খেলা। নারকেল গাছের ডাল বা কাঠ দিয়ে ব্যাট বানিয়ে খেলার চিত্র এখনো গ্রামবাংলায় চলমান।

দড়ি লাফ : 

স্কুল ছুটি হলেই দড়ি লাফ। আর এ খেলাটি বেশি খেলতো মেয়েরা। পায়ে দড়ি বেধে গেলে দিতে হতো পাশে দাড়ানো সঙ্গীকে। সবাই তখন হা করে থাকতো যে লাফাচ্ছে তার দিকে। আর পাশ থেকে একজন গুণতে থাকতো। সবচেয়ে বেশিক্ষণ লাফাতে পারতো, তাকে প্রথম ধরা হতো।

টায়ার দৌড়: 

সাইকেল কিংবা গাড়ির টায়ারকে লাঠি দিয়ে ধাক্কাতে ধাক্কাতে তার সঙ্গে ছুটে যাওয়া শৈশব সবার হৃদয়ে আঁচড় দিয়ে যায়।

বিয়ারিং গাড়ি:

সাইকেল বা রিকশার বিয়ারিং ও কাঠ দিয়ে বানানো গাড়ির কথা কখনো ভুলার নয়। দলে বেধে ঘুরে বেড়ানো। গাড়িতে ওঠার জন্য লাইন ধরা। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটে বেড়ানো দিনগুলো এখনো শৈশব মনে করিয়ে দেয়।

দোকানপাট:

ছোটবেলায় আরেকটি মজার খেলা ছিল মুদি দোকান। লাঠি ও নারকেল কিংবা গাছের পাতার ছাউনি দিয়ে বানানো হতো এ দোকান। বাবার কাছ থেকে চকলেট কেনার জমানো টাকায় পুঁজি ছিল এ ব্যবসার। পরে নানারকম মুদিপণ্য বন্ধুদের কাছে একটু বেশি দামে বিক্রি করাই ছিল এ খেলার মাজেজা।

চড়ুইভাতি : 

চড়ুইভাতি বলতে পিকনিক বোঝায়। এ খেলায় চাঁদা দেয়ার দরকার ছিল না। স্কুল ছুটিকালীন যার যার বাড়ি থেকে রান্নাবান্নার জিনিস এনে এ পিকনিকের আয়োজন করা হতো। এখন আর তা দেখা যায় না।

বাঁদর ঝোলা : 

শৈশব মানে দুরন্তপনা। তাই মন চাইলেই দল বেধে গাছের ডালে বাঁদর ঝোলা হয়ে ঝুলেনি আবহমান বাংলায় সেরকম মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

ঘুড়ি : 

ঘুড়ি শৈশবের সবচেয়ে বড় নিত্যসঙ্গী। পলিথিন কিংবা কাগজের সঙ্গে নারকেলের ডালের সলা দিয়ে বানানো হতো সেসব ঘুড়ি। বোতল আর লাটিম দিয়ে নাটাই বানিয়ে মায়ের কাঁথা সেলাই করার সুতা চুরি করে ঘুড়ি উড়ানোর দিনগুলো সত্যিই স্বপ্নের মতো।

ফুটবল:

স্কুল ফাঁকি দিয়ে গায়ে কাদাপানি মেখে ফুটবল খেলা শৈশবের নিত্যদিনের আয়োজন। কাদা জড়িয়ে চুপি চুপি বাড়ি ফিরে বাবার বকুনি খায়নি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সেসব  দিনগুলো আজও মনে দাগ কেটে যায়।

বউ জামাই:

চুলা বানিয়ে ছেলেমেয়ে স্বামী-স্ত্রী সেজে সংসারের যাবতীয় কিছুর মিছেমিছি রান্নাবান্না খেলাকে বলা হতো বউজামাই খেলা।

ডাংগুলি খেলা : 

এটি শৈশবের প্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে একটি। ২০ গজে ১ শাল। আর ১ গজে গণনা করা হতো যথাক্রমে বাড়ি, দুড়ী, থেড়ী, চাকল, চরব, ঝেক, মেক। এগুলো সবই আঞ্চলিক কথা।

ওপেন-টু-বায়োস্কোপ :

ওপেন-টু-বায়োস্কোপ, নাইন টেন তেইশ কোপ, সুলতানা বিবিয়ানা, সাহেব-বাবুর বৈঠকখানা, সাহেব বলেছে যেতে পান সুপারি খেতে, পানের আগায় মরিচ বাটা, স্প্রিংয়ের চাবি আঁটা যার নাম মণিমালা, তাকে দিবো মুক্তার মালা। এ লাইনগুলো শোনার পরেই সবার মনে পড়ে যাই ফেলে আসার দিনগুলোর কথা।

রসচুরি : 

চুরি করে খেজুরের রস খাওয়ার ঘটনা ডানপিটে সবার জীবনে রয়েছে। খেজুরের গাছের সঙ্গে লাগানো রসের কাঠিতে মুখ দিয়ে খাওয়া যেনো ছিল অমৃত।

মোরগ লড়াই: 

মোরগ লড়াই খেলেনি গ্রামের স্কুলে পড়েছে এমন সংখ্যা খুবই কম। এক পায়ে হাত দিয়ে আরেক পা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হাঁটু দিয়ে ধাক্কা দেয়ায় মোরগ লড়াই।

মাছধরা:

শৈশবে কাদাপানিতে মাছ ধরাও ছিল একটি খেলা। দল বেধে হাত দিয়ে মাছ ধরা আর দিন শেষে কয়েকটা মাছ নিয়ে বাড়িতে দে দৌড় ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এছাড়া শৈশবে বৌ-তোলা, লুকোচুরি, সাতগুটি, চোর-পুলিশসহ নাম না জানা আরো অনেক মজার খেলা অনেকেই খেলেছেন। যা মনে পড়লে স্মৃতিকাতর না হয়ে থাকা যায় না।

এমসি/ডিএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়