• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

মন ভোলানো রাঙামাটির পথে

দিগন্ত সৌরভ
|  ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৭:৫৪ | আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৩৫
এবার ডিসেম্বরের শীতে প্রায় এক সপ্তাহের সময় নিয়ে গিয়েছিলাম রাঙামাটির কাপ্তাই। রাত সাড়ে এগারোটায় ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে বাসে রওনা দেই। কুয়াশাভেজা ভোরে বন্দরনগরীতে নেমেই টের পাই শীতের একরোখা দাপট। পিঠে ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে মঈন মাহমুদ ভাইয়ের পিছু হেঁটে সোজা চলে যাই তাদের  নাসিরাবাদ বাসায়। সেখানে ঘণ্টাদুয়েক ঘুমিয়ে নেই। নাওয়া খাওয়া শেষ করে আবার চট্টগ্রাম শহর থেকে রওনা হই কাপ্তাইয়ের উদ্দেশ্যে। সিএনজি নিয়ে লিচুবাগান গিয়ে আবার অন্য একটি সিএনজি নিয়ে কাপ্তাই বরইছড়ি নেমে পড়ি। কাপ্তাইয়ের উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন ভাই আগে থেকেই উপজেলা রেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সেখানে উঠে ব্যাগপত্র রেখে হাত-মুখ ধুয়ে নেই। উপজেলার পাশে একটি খাবার দোকানে গিয়ে পেটপুরে গরম ভাজি-পরোটা খেয়ে খিদা নিবারণ করি। পাহাড়ি বিকেলটা কাটিয়ে দেই বরইছড়ির বাজার ঘুরে ঘুরে। ছোট এ বাজারে এক-দুটি মাছের এবং ক’টি মুদি দোকান রয়েছে।

চারপাশ টিলা ও পাহাড় ঘেরা। মাঝ দিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। সিএনজি ছাড়া অন্য যানবাহন খুব একটা চোখে পড়ে না। সন্ধ্যার পরেই কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন ভাই আমাদের নিয়ে ঘুরতে বের হলেন। একটি জিপ গাড়ি করে  চললেন কাপ্তাই লেকের উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে পাহাড়ি ঠান্ডায় যেন জমে গিয়েছে আমাদের শরীর। প্রথমদিন এভাবেই কাটিয়ে রাতে রেস্ট হাউসে এসে ঘুমিয়ে পড়ি।

কাপ্তাইয়ে অবস্থানের দ্বিতীয়দিন বিকেলে ঢাকা থেকে এসে যোগ দেন আমাদের আমিনুল ইসলাম তুষার ভাই ও মোমেন চৌধুরী। এখন আমাদের দলে মোট ৪ সদস্য। ওইদিন বিকেলেই সবাই বেরিয়ে পড়ি কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি এলাকার ভিতরে। প্রথমে চন্দ্রঘোনার লিচুবাগান ফেরিঘাট। সেখান থেকে খ্রিস্টান অধ্যুষিত মিশন খিয়াংপাড়া ঘুরে পাহাড়ি একটি দোকানে ৪ জন চা খেতে বসি। চা খেয়ে উঁচুনিচু পাহাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে অবিরাম হাঁটতে থাকি। যদিও খিয়াং মিশনপাড়া ছাড়া আশপাশের এলাকা সম্পর্কে আমাদের দলের কেউ কিছু বলতে পারে না। স্থানীয় আদিবাসী বাড়িগুলো থেকে তথ্য নিয়ে এগুতে থাকি। উঁচুনিচু টিলা পাহাড় পেরিয়ে আমরা যত যেতে থাকি শীতের সন্ধ্যা ততই ঘনিয়ে আসতে থাকে। এভাবে এগিয়ে যেতে যেতে একসময় আরেকটি ছোট পাহাড়ি বাজারে পৌঁছে যাই। ঘণ্টাখানেক সেখানে ঘুরে ফিরে আমাদের অস্থায়ী আবাস উপজেলা রেস্ট হাউসের পথ ধরি।

কাপ্তাইয়ের সৌন্দর্য

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি সম্পর্কিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধটি পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত। বাঁধের অবস্থানস্থল কাপ্তাইয়ের নাম অনুসারে। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে কাপ্তাই হ্রদ বলে থাকেন। বাঁধ তৈরির আগে বর্তমান হ্রদটি ছিল ছোট-বড় পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা পরিবেষ্টিত এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যময় স্থলভূমি। আসামের লুসাই পাহাড় থেকে সৃষ্ট কর্ণফুলী নদী বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা কাসালং, মাইনি, রিংকং এবং চেঙ্গী নদীর মিলিত প্রবাহ স্থলভাগের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী নামে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হতো।

কাপ্তাইয়ে বাঁধ দেয়ার ফলে এসব নদী ও আশপাশের নিচু এলাকাসহ বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে এ হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। আকৃতির দিক থেকে কাপ্তাই হ্রদ অনেকটা ইংরেজি H অক্ষরের মতো। মাইনি ও কাসালং খালের মিলিত প্রবাহের সঙ্গে নিম্নাঞ্চলে মূল কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ যোগে হ্রদটির ডানদিকের সুদীর্ঘ ও বৃহত্তর অংশটি সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদের এই বিশাল জলধারা দুটির মাঝখানে সরু ও সুগভীর শুভলং চ্যানেলে যুক্ত। এ হ্রদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য মূলত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। অবস্থানগত কারণে পার্বত্য জেলাগুলোর বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এ হ্রদ শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। এখানে আছে পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, কৃষি খামার, শুভলং ঝরনা ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য, পেদা টিংটিং রেস্টুরেন্ট, সাংফাং রেস্টুরেন্ট, চাকমা রাজবাড়ি, রাজ বনবিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, জেলা প্রশাসকের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধিসৌধ এবং উপজাতি পাড়া। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সেগুন কাঠের বাগান, পাহাড়ি ও বুনো ফুল-ফলের সমাহার রয়েছে রাঙামাটিতে। রাঙামাটি থেকে শুভলংয়ের উদ্দেশ্যে এগোতে থাকলে দেখতে পাবেন কিছু আদিবাসী গ্রাম। ঝরনার পানি পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য। এখানে ইচ্ছে করলে গোসল করা যায়। ঝর্ণা দেখা শেষে শুভলং বাজার ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে সেনাবাহিনীর একটি মনোরম ক্যান্টিনও রয়েছে। বরকল, লংগদু, মাইনিমুখ ও কাসালংসহ আরও অনেক এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য রাঙামাটির আকর্ষণ।

শুভলং যেতেই রাঙামাটি শহরের অদূরে একটি সবুজ দ্বীপ দেখা যায়। সেখানে রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট, চাকমা ভাষায় এর নাম ‘পেদা টিংটিং। এর অর্থ হলো পেট ভরে খাওয়া। এখানে পাওয়া যায় কাঁচা বাঁশের ভেতর রান্না করা বিশেষ খাবার সুমত কোরায়রা। মুরগি ও মাছ দিয়ে তৈরি হয় এ খাবার। এছাড়া লেকের টাটকা মাছের তৈরি বিভিন্ন ভর্তা ও মাছ পাওয়া যায় এখানে। পেদা টিংটিং থেকে একটু দূরে নতুন গড়ে উঠেছে আরেকটি রেস্টুরেন্ট সাংপাং। এখানকার হুর হেবাং (বাঁশের ভেতর রান্না করা মুরগির তরকারি) ও বদা হেবাং (কলাপাতায় রান্না করা ডিম তরকারি) ইত্যাদি খাবার বেশ আকর্ষণীয়। নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকায় রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধ, সাংফাং রেস্টুরেন্ট, টুকটুক ইকো ভিলেজ ও কৃষি খামার। এসব পর্যটন স্পট দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করতে হবে। ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ মুক্তিযুদ্ধের সময় নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে শহীদ হন। স্থানীয় এক উপজাতি তাকে ওই স্থানে কবর দিয়েছিলেন। রাঙামাটির বিডিআর ওই স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে। এছারাও উপজাতিদের হাতে তৈরি নানা ধরনের কাপড় ও বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগ্রহ করা যায় রাঙামাটি থেকে। তবলছড়ি, বনরূপা ও রাজবাড়ি এলাকায় এসব পণ্যের বেশ কয়েকটি দোকান ও শোরুম রয়েছে। এসব শোরুম থেকে কম দামে বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনতে পারেন। রাঙামাটি-কাপ্তাই সড়ক পর্যটকদের বেশ আকর্ষণ করে। একদিকে সুবিশাল পাহাড়, উঁচু-নিচু পাহাড়ি সড়ক; অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আঁকাবাঁকা এই সড়কটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই সড়ক ধরে যেতে পারেন কাপ্তাই। কাপ্তাই না গেলে রাঙামাটি দেখা অপূর্ণ থেকে যায়। এখানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী নদীর অপূর্ব দৃশ্য,

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল দেখার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। টানা চারদিন ঘুরে-ফিরে নানান অভিজ্ঞতায় কেটে যায় কাপ্তইয়ের দিনগুলি। এবার আমাদের ঢাকায় ফেরার পালা। সন্ধ্যায় আমরা বাসে চড়ে চট্টগ্রাম শহরের পথ ধরি।

যাতায়াত

ঢাকা থেকে কাপ্তাইয়ে শহরের বিভিন্ন স্থান হতে প্রতিদিন অসংখ্য বাস ছেড়ে যায়। তবে সরাসরি ঢাকা থেকে বাসে করেই আপনি কাপ্তাই যেতে পারবেন। সায়েদাবাদ অথবা কমলাপুর থেকে বাসে করে কাপ্তাই যেতে সময় লাগে ৮ ঘণ্টার মতো। এছাড়া যেকোনো উপায়ে চট্টগ্রাম পৌঁছে বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ড থেকে কাপ্তাইয়ের বাস পাবেন প্রতি ৩০ মিনিট পর পর।

কোথায় থাকবেন

কাপ্তাইয়ে রাত্রিযাপনের জন্য ভালোমানের বাণিজ্যিক কোনো হোটেল মোটেল নেই। আপনাকে আগে থেকেই কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন সরকারি রেস্ট হাউজ বা বিশ্রামাগারের সন্ধান করতে হবে। সেনাবাহিনী, পিডিবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বন বিভাগের রেস্ট হাউজগুলোতে থাকতে পারবেন খুবই কম খরচে। কিন্তু এ জন্য আপনাকে সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসের অনুমতি নিতে হবে।

আরকে/এসজেড

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়