• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

নাফাখুমের খোঁজে অরণ্যপ্রেমীরা!

সোহেল রানা
|  ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ১৪:০১ | আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ২০:০১
আমি স্বপ্ন ছুঁয়ে হারিয়ে যাব প্রকৃতির কাছে। যেখানে মেঘেরা খেলা করে, পাহাড়ের চূড়ায়। শরীরে দোলা দেয়, জাগায় শিহরণ। বান্দরবানের নীলগিরি ও চিম্বুক পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা সাপের মতো আকা-বাকাঁ পথ যেন, প্রকৃতির স্বপ্ন রাজ্য। বান্দরবান শহর থেকে থানচি উপজেলা পৌঁছাতে জিপে (চাঁন্দের গাড়ি) করে ৪ ঘণ্টার পথ। এ পথের পথিক হলেই স্বপ্ন রূপ নেবে বাস্তবে।

কখনো রোদের হাঁসিতে দেখা মিলবে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে মেঘের ছুটোছুটি। কখনো আবার বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দেবে প্রকৃতিতে হারিয়ে যাওয়া পথভুলা পথিককে।

সবুজের সাজে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি প্রেমীরা কিচ্ছুক্ষণের জন্য আতৎকে উঠতেই পারেন চিম্বুকের চূড়া থেকে সমতলে তাকিয়ে! তখন হয়তো আপনি দাঁড়িয়ে থাকবেন সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ২৭’শ ফুট ওপরে। এর মধ্যেই পাহাড়ের ভাজে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ী জনপদ দেখে অবাক হবার খুব বেশি কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ প্রতিটি ছোট-বড় পাহাড় ঘিরে গড়ে ওঠেছে, পাহাড়ী নৃ-গোষ্ঠির বসতি। যেখানে অবলীলায় বাস করছেন, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মোরংসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ।

৪ ঘণ্টা প্রকৃতির রাজ্যে হারিয়ে যাবার পর আপনার বিশ্রাম যদি হয় সীমান্ত অবকাশ রিসোর্ট তাহলে সোনায় সোহাগা। ২২’শত ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় বসে, জানালা দিয়ে তাকালে দেখা মিলবে সবুজের সমারোহ, মেঘেদের ছুটোছুটি আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার।

ঢাকা থেকে প্রকৃতির টানে ছুটে আসা অরণ্য প্রেমী গ্রুপের সাগর নামের একজন বলেন, ব্যস্ততা থেকে প্রশান্তির জন্য বান্দরবানের থানচিতে ছুটে এসেছি। এখানে পাহাড়, মেঘ আর আকাশ এতো কাছাকাছি দেখবো, স্বপ্নেও ভাবিনী। 

থানচি বাজার থেকে পুলিশ ও বিজিবি’র অনুমতি নিয়ে গাইডের তত্বাবধানে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে ৩ ঘণ্টার ট্রলার যাত্রা। এই যাত্রা পথের পথিক এক দল অরণ্য প্রেমী। যারা যাত্রা শুরু করেছেন, ঢাকা থেকে নাফাখুম জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে।

সবচেয়ে খরস্রোতা নদী, সাঙ্গু। এই নদী পথেই রেমাক্রি বাজার। যতই ট্রলার এগুবে ততই চোখে পড়বে দু’পাশের শিকলের প্যাচের ন্যায় পাহাড়ের মিতালী। এমন দৃশ্য দেখে ট্রলারে থাকা অরণ্য প্রেমী গ্রুপের শাহরুল চিৎকার করে বলেন, মনে হয় রুলার কোস্টারে আছি। পানির এমন ভাবে ট্রলারে ধাক্কা দিচ্ছে মনে হচ্ছে এই বুঝি পানিতে পড়ে যাব। আনন্দের সঙ্গে ভয়ও করছে।

এমনি করে বড় পাথর, ছোট পাথর পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যা গড়ালে রেমাক্রিতে হতে পারে রাত কাটানোর ব্যবস্থা। কাঠের তৈরি দু’তলার রিসোর্টে মেঝেতে গাদাগাদি করে শোবার ব্যবস্থা হলেও উপভোগ করতে পারবেন, ঝিঝি পোকার শব্দ, জোনাকির আলো আর অবিরাম ধারায় প্রবাহিত পাহাড়ী ঝর্ণার পানি পরার শব্দ।

সকালে ঘুম ভাঙলে চোখে পড়তেই পারে পাহাড়ের সবুজ আর রোদের আলোয় মেঘের ছুটোছুটি। এমন দৃশ্য দেখে সহকর্মী জুলহাস কবীর বলেন, বান্দরবানে বহুবার এসেছি কিন্তু রেমাক্রিতে এবারই প্রথম। এখানকার সৌন্দর্য্যে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছি, নাফাখুমের সৌন্দর্য্য দেখে খুঁজে পেয়েছি অপরূপ বাংলায় জন্মানোর স্বার্থকতা।

সকালের নাস্তা শেষে গাইড বীর বাহাদুরের তত্বাবধানে শুকনো খাবার আর পানি নিয়ে ১৭ জন অরণ্য প্রেমীর নাফাখুম যাত্রা। পাহাড়ের গিরিপথ ধরে আমাদের সবার চেয়ে বয়সে বড় সহযাত্রী যাকে সবাই গুরু বলেই স্মমোধন করেন তাঁর নির্দেশে সতর্কতার সঙ্গে হেঁটে চলছেন- জাহিদ, রাসেল, সুইট, শুভ্র, রাজিব, খোকন, ফারুক, সালাউদ্দীন ও কুষ্টিয়ার সাংবাদিক বন্ধু সোহেল রানা।

পথে চোখে পড়বে ছোট বড় ৫-৬টি জলপ্রপাত। সেখানে সেলফি তুলতে ভুল করেনি অরণ্য প্রেমীরা। তবে, পথ চলতে ভ্রমণ প্রেমীদের হতে হবে খুবই সর্তক। কারণ গিরিপথ এতোটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে একটু বেফাস হলেই পরে যেতে পারেন ৩ থেকে ৪’শ ফুট নিচে। এমন পাহাড়ি পথে আগেও যাত্রা করেছেন, শাহাবুদ্দীন শিহাব । তিনি বলেন, এসব গিড়িপথে খুব সতর্ক থাকতে হয়। তাই ভয় না পেয়ে কৌশল অবলম্বন করলে ঝুঁকি মোকাবেলা করা যায় খুব সহজে।

এমন গিড়িপথের বিরতিতে নদী পার হতে হবে বেশ কয়েকবার। যেখানে পানির নীচে পাথর থাকায় পথচলতে হবে খুবই সতর্ক। মাইলের পর মাইল হেঁটেও লোকালয় খুঁজে পাওয়াও দুস্কর। তবে, আশার বিষয় হচ্ছে মাঝপথে যাত্রা বিরতি দেয়া যাবে মারমা সম্প্রদায়ের দু’টি পাড়ায়। যেখানে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে বেশ কিছু দোকান। তবে, খাবার বলতে কলা, চা আর রুটি পাওয়াও কঠিন হতে পারে।

এভাবে ৪ ঘণ্টা হাঁটার পর নাফাখুম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি এসে অরণ্য প্রেমীদের অনেকেই ক্লান্ত। ফিরে আসার জন্য গ্রুপের অন্যদের হতাশ করছেন, কেউ কেউ। এমন সময় অরণ্য প্রেমী রকিব মানিক বলেন, ‘আমরা নাফাখুম জয় করতে এসেছি। আমি জোকের ভয় নিয়েও এত দূরের পথ পাড়ি দিয়েছি। তবে এত কাছাকাছি এসে কখনোই পিছপা হবো না। মানিকের এমন আত্ম বিশ্বাসের পর সবাই আবার চাঙা। কিছুদূর এগুতেই স্বপ্নের হাতছানি। অবশেষে নাফাখুম জয়! এর আগে অনেক পর্যটক এখানে এলেও অরণ্য প্রেমীরা মনের আনন্দেই উড়িয়েছেন, বাংলাদেশের পতাকা।

যেভাবে যাবেন নাফাখুম :

  • ঢাকার কলাবাগান থেকে রাত ১০.৪৫ এর বাসে উঠলে সকাল ৮ টার মধ্যে বান্দরবান শহরে পৌঁছাবেন। 
  • সকালের নাস্তা শেষে বান্দরবান থেকে ৯.৩০টার মধ্যে চাঁন্দের গাড়ি করে থানচি বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৪ ঘণ্টা। যাত্রা পথে নীলগিড়ি, চিম্বুক দেখে যেতে পারেন। একই রাস্তায় পরবে।   
  • থানচি বাজারে দুপুরের খাবার শেষে ৩ টার মধ্যে একজন গাইড ভাড়া করে পুলিশ ও বিজিবির অনুমতি নিয়ে ট্রলার ভাড়া করে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে যাত্রা।
  • ৩ ঘণ্টার ট্রলার যাত্রা শেষে রেমাক্রি বাজারে রিসোর্ট এ রাত্রি যাপন। খাবার ও রিসোর্ট গাইড ঠিক করে দিবেন।
  • পরের দিন সকালে গাইড নিয়ে নাফাখুম পায়ে হেঁটে যাত্রা করতে হবে। দিনে দিনেই ফিরে আসতে হবে তাই সকালেই রওনা হওয়াই ভালো।
এমকে

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়