• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

স্বপ্নের মতো সুন্দর নাপিত্ত্যাছড়া

মিথুন চৌধুরী, আরটিভি অনলাইন
|  ২২ জুন ২০১৮, ১৪:৪১ | আপডেট : ২২ জুন ২০১৮, ১৬:৩০
ইটপাথরের দেয়ালের ভেতর আটকে পড়া পাখির মতো হাসফাস করছে মন? একটু প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চান? তাহলে ঘুরে আসতে পারেন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের নয়দুয়ারে অবস্থিত নাপিত্যাছড়া। যা স্বপ্নের মত সুন্দর। নাপিত্যাছড়ায় রয়েছে ৩টি ঝরনা। শুধু তা নয়, ত্রিপুরাদের (উপজাতি) জীবনযাপনও দেখা যাবে। পাওয়া যাবে ত্রিপুরাদের বাগানের নানান ফল।

নয়দুয়ার হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মাঝখানে। যা মীরসরাইয়ের বড়তাকিয়া ও হাদিফকির হাটের মাঝখানের স্টপেজ। ঢাকা থেকে আসতে হাতের বাম পাশে এবং চট্টগ্রাম থেকে আসতে রাস্তার ওপারে পরে নাপিত্তাছড়ায় যাওয়ার পথ। নয়দুয়ার বাজার থেকে দেখবেন পাহাড়ের দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে। ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করবেন। নয়দুয়ার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নাপিত্যাছড়া। কিছুক্ষণ হাঁটলে রেললাইন পেয়ে যাবেন। ওইটা ক্রস করে একটু হাঁটলে ঝিরি পথ পাবেন। তারপর ঝিরি দিয়ে হাঁটা শুরু করুন। ২০ মিনিট হাঁটলে একটা ক্যাসকেড পাবেন। সেখানে দেখবেন কিছু দোকানপাট। যাদের পাহাড়ে উঠার অভ্যাস খুবই কম তারা সেসব দোকান থেকে ট্রেইলের জন্য লাঠি নিতে পারেন। শুধু তা নয়, নিতে পারেন খাবার পানি, স্যালাইন, মোবাইল রাখার জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগ।
--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : স্ট্রোক ও হৃদরোগ থেকে বাঁচতে ডিম খান প্রতিদিন
--------------------------------------------------------

আশপাশে দেখা পাবেন ত্রিপুরাদের বসতবাড়ি। চট্টগ্রামের এ অঞ্চলে পাহাড়গুলোতে কয়েকশ নৃ-গোষ্ঠী থাকে। তারা মূলত ত্রিপুরা। পাহাড়ের যে অংশ আপনি পাড়ি দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন, হয়তো সেই অংশেই কোনও আদিবাসী নারীর সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে। তারা মাথায় ঝুড়ি বা ভারি কিছু নিয়ে দিব্যি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন। ঝরনায় যাওয়ার পথেও পানিতে আদিবাসী শিশুদের খেলতে দেখবেন।

ছড়া দিয়ে মিনিট ৫ হাঁটার পর শুরু হবে ঝিরিপথের রাস্তা। তবে হাঁটার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অনেক পাথর পুরো এলাকা জুড়ে, পাথরগুলো খুবই ধারালো। সাথে থাকা লাঠি দিয়ে দেখে নেবেন পানির নিচে পাথর নাকি গভীর। ট্রেইল ধরে এগিয়ে যেতে যেতে পাহাড়ের গহীন সৌন্দর্য চোখে পড়বে। কিছুটা ছায়াঢাকা পথগুলোর দুই পাশে পাহাড় আর গাছ। এ যেন পাহাড় আর গাছের সুড়ঙ্গ। আকাশ অনেক দূরেই মনে হবে। দুর্ভেদ্য গাছ-পাহাড়ের দেয়ালও তার বন্য সৌন্দর্যে জন্য ভালো লাগবে।

ঝিরিপথ দিয়ে প্রায় ২০ মিনিট হাটার পর পাবেন প্রথম ঝরনা কুপিকাটাকুম। কি অদ্ভুত নাম! অদ্ভুত তার সৌন্দর্য। মনে হবে পাহাড়ের দেয়াল বেয়ে ঝরনার পানি নেমে আসছে। তবে সাবধান। গিয়েই পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করবেন না। কারণ ঝরনার সামনে বড় বড় পাথরের চাঙড় আছে। যা পানির জন্য চোখে পড়ে না। পাথরের পাড় থেকে সাবধানে পা নামিয়ে পানিতে নামুন। মাঝের জায়গাটিতে পা রাখার জায়গা নেই। সেখানে গভীরতা অনেক। যারা সাঁতার জানেন না, নিজে নিজে ঝরনার দেয়ালের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।  সঙ্গী থাকলে তার সহায়তা নিন।

আনন্দে বাড়তি মাত্রা দেবে কুপিকাটাকুমের এক কোনে থাকা প্রাকৃতিক স্লাইড। মনে হবে কেউ যেন পাথর কেটে স্লাইড তৈরি করেছে। সাবধানে পাথরের গা বেয়ে কিছুটা উপরে উঠে দুই পাশ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে স্লাইডে শরীর ছেড়ে দিন। পাহাড়ি ঝরনার স্লাইডের অনুকরণে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে যেসব স্লাইড তৈরি আছে তার চেয়ে কম আনন্দ পাবেন না এখানে।

কুপিকাটাকুম দেখা আর ছবি তোলা শেষ হলে এবার পুনরায় যাত্রা শুরু করতে পারেন। এখনো আরো ঝরনা বাকি!  সব আনন্দ আর সময় এখানে শেষ করে ফেললে যে অপূর্ণতা থেকে যাবে। তবে যারা ঝরনায় গোসল করে গা ভিজিয়ে ফেলেছেন তাদের আগে ভালো করে পানি ঝরিয়ে নেয়া উচিত। কারণ এখানে থেকেই শুরু পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা।

গা ভেজা থাকলে কুপিকাটাকুমের বাঁ দিক দিয়ে উপরে উঠার রাস্তা দিয়ে সাবধানে চলা উচিত। উপরে উঠেই আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে কেউ। কারণ এর ঠিক উপরেই বাঘবিয়ানি ঝরনা।

বাঘবিয়ানির পাশ দিয়ে শুরু পাহাড়ের মূল অভিযান। সরু মাটির রাস্তা ভিজে পথকে বিপদজ্জনক করে তুলেছে। কারণ আপনার মতই ভেজা শরীর নিয়ে ওঠা অন্য পর্যটকরা। লাঠি দিয়ে সামাল দিতে না পারলে দুই হাত ব্যবহার করুন। হাত দিয়ে মাটি বা গাছ ধরে উপরে উঠুন। ভাগ্য ভালো থাকলে সরু এই পথের উপরের দিকে ওঠার জন্য কারো বেঁধে রাখা লতার দঁড়িও পেয়ে যেতে পারেন। খাড়া এই পথে দুর্বল চিত্তের লোকেরা ভয় পেতে পারেন। তাই সম্ভব না হলে নিচে থেকে যান। কারণ খাড়া পথটি বেয়ে ওঠার সময় হাপিঁয়ে যেতে পারেন।

৫ মিনিটের পথটি শেষে পাহাড়ের সমতল রাস্তায় উঠে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে পারেন। বিশ্রাম শেষ হলে সাথে রাখা লাঠি নিয়ে আবার এগিয়ে চলুন। এবার সামনে পাতলা কাঁদার রাস্তা। পাহাড়ের খাদের পাশ ঘেঁষে যাওয়া রাস্তাটিতে সাবধানে পা গেঁথে গেঁথে চলা উচিত। এসময় কাজে দেবে আপনার হাতের লাঠিটি। তবে আশেপাশের লতা বা গাছের সহায়তা নেবার আগে লক্ষ্য করুন সেটা মজবুত এবং ভার সইতে পারবে কি না।

পথটুকু শেষ হলে আবার স্বস্তির ঝিরিপথ দিয়ে হাঁটা শুরু করতে পারেন। তবে এইখানে একটা অংশে পাথরের খাঁজে গভীরতা আছে। লাঠি দিয়ে চেক করে নিন। মাঝের রাস্তায় গভীর থাকলে পাহাড়ের কিনারে সাবধানে চলুন।  এখানে পাথরের মেঝে দেখতে পাবেন। তবে সামনে আছে ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষরের মত দুটি রাস্তা।  একটি গেছে বান্দরকুম আরেকটি মিঠাছড়ি।  একটি দেখা শেষে আরেকটি দেখতে হলে আবার এই পথে ফিরতে হবে।

মিঠাছড়ির বৈশিষ্ট্য হলো উপর থেকে পানি পড়ার সময় পাহাড়ের দুই ভাগে ভাগ হয়ে নেমেছে। আর বান্দরকুম বা বান্দরছড়া এই সবগুলো ঝরনার মধ্যে উচ্চতম ঝরনা। এখান থেকে ফেরার পথে পাহাড়ের খাদের রাস্তাটি শেষে নিচের দুই ঝরনার উপরে যখন পৌঁছবেন সেখানে আরেকটি শর্টকাট রাস্তা পেয়ে যেতে পারেন। যেটা দিয়ে ঝিরিপথের শুরুর রাস্তাতে এসে পড়বেন।

যেভাবে যাবেন নাপিত্ত্যাছড়া :

বাসে যেভাবে যাওয়া যাবে

১) ঢাকা সায়দাবাদ টু ফেনি মহীপাল - ২৫০ টাকা/২৭০ টাকা, নন এসি । এসি - ৩৫০ টাকা (স্টার লাইন, এনা পরিবহন, কে.কে ট্রাভেলস, সেবা পরিবহন) । ফেনী বাস স্ট্যান্ড থেকে মহীপাল চলে যাবেন । মহীপাল থেকে নয়দুয়ারি মসজিদ - ৩৫ টাকা (লোকাল বাস)।

২) ঢাকা থেকে চিটাগংগামী যে কোন বাসে উঠে বাসের সুপারভাইজার কে বলে রাখবেন নয়দুয়ার মসজিদ এর সামনে নামিয়ে দিতে। এক্ষেত্রে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করলে ভালো হবে।

রেলগাড়িতে যেভাবে যাওয়া যাবে

১) চিটাগাং মেইল ট্রেন কমলাপুর থেকে ১০:৩০ এ ছেড়ে যায়। তাই চেষ্টা করবেন আগে যেতে। কারণ এটা লোকাল ট্রেন সিট নাও পেতে পারেন। ভাড়া ৯০ টাকা।

২) ফেনী পোঁছে যাবেন সকাল ৬ টার আগেই। ইচ্ছে করলে ষ্টেশনে অপেক্ষা করতে পারেন কারণ ৬:৪০ এর দিকে ডেমো ট্রেন আছে ওইটা দিয়ে মিররসরাই যেতে পারবেন (ভাড়া ২০টাকা)। ডেমো ট্রেন দিয়ে গেলে মিররসরাই নেমে লেগুনা দিয়ে নয়দুয়ারি বাজারে চলে যাবেন (ভাড়া ৫টাকা)। অথবা, স্টেশন থেকে টমটমে মহীপাল (ভাড়া ১০টাকা) এবং সেখান থেকে চিটাগাং গামী যেকোনো বাসে উঠে যাবেন। অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন। লোকাল বাস গুলা ৫০ টাকা নিবে এবং ভালোগুলা ১০০ নিতে পারে।

গাইডের প্রয়োজন হলে নয়দুয়ার নামলেই সিজনভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে গাইড পাবেন।

আরও পড়ুন :

এমসি/কেএইচ/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়