• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

দূরে কোথাও ঘুরে আসি

জোবায়ের মিলন
|  ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১১:৩২ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৬, ১০:৪৬
আহাদ আর অয়ন দুই বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ে। একসঙ্গে খেলা করে, চলে ফেরে। বসবাসও একই দালানে। উপর আর নিচ। আহাদ আর অয়নের মায়েরাও দুই বন্ধু। বন্ধু হলেও দু’জনের মধ্যেই সন্তান নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে। প্রতিবছরই আহাদের মা চান আহাদ ক্লাসে প্রথম হোক। আবার অয়নের মা চান অয়ন প্রথম হোক। দু’জনের পড়ার টাইম, ক্লাস টাইম, টিচার টাইম, রুটিন প্রায় একই। কিন্তু দেখা যায় অয়ন আহাদের চেয়ে এগিয়ে পড়াশোনায়। ক্লাসে প্রথম হওয়া থেকে প্রতিদিনের হোমওয়ার্ক পর্যন্ত অয়ন এগিয়ে থাকে। এ নিয়ে ক্লাসের শিক্ষকদের সন্তুষ্টি আর অয়নের মায়ের খুশির তৃপ্তি থাকলেও আক্ষেপ আছে কিছুটা অয়নের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে। যা আহাদের মায়ের মোটেই নেই।

আহাদ অয়ন দু’জনেই বয়সে শিশু হলেও অয়নের চেয়ে আহাদ পরিবেশ পরিস্থিতি স্থান অবস্থান অনুধাবন করে মানিয়ে নিতে পারে সহজেই। ক্লাসের শিক্ষকরা তাই আহাদকেই ক্লাসের ক্যাপ্টেন বানিয়ে দেন প্রতিবছর। যদিও আহাদ ক্লাসের পঞ্চম। কিন্তু তার রয়েছে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা। ম্যানেজ করার বুদ্ধি। কথায় চটপট, হাসিখুশি, গুছিয়ে বলায় পটু। উপস্থিত বুদ্ধিতে পাকা আহাদ সবার নজরে থাকে প্রথমে। ক্লাস ফাংশন থেকে শুরু করে নেতৃত্বটাও তারই।

অথচ অয়ন পড়াশোনার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে মিশতে খুব একটা আনন্দ পায় না। ঘরেই থাকে বেশি। খেলাধুলায় অংশ নিলেও নীরবই থাকে। হইচই নেই, মাতামাতি নেই। সামনে দাঁড়াবার আগ্রহ বা ইচ্ছা দেখা যায় না তার মধ্যে কখনো। অনেক মানুষ দেখলে আহাদ যেখানে কথা বলে হড়হড় করে, অয়ন সেখানে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে সংকোচে। কেউ কিছু বললে তার মুখ যেন আরও বন্ধ হয়ে যায় জড়তায়। আর এ কারণে অয়নের মা-বাবার দুশ্চিন্তাই বেশি। কেননা, সময় এখন চটুলতার।

ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ আরনল্ড হ্যারিস বলেছেন, পুঁথিবিদ্যাই জীবনের পুরো কথা নয়, দক্ষতা ও বিচক্ষণতাও জরুরি। অস্ট্রেলিয় শিশু মনোচিকিৎসক বলেছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি যে শিশু চাক্ষুষ পৃথিবীকে দেখে তার কাছে পড়াশোনা যেমন আনন্দের তেমনি জীবন অনেক নির্ভার। সুইডিস পর্যটক লিয়ান থ্রট এর উক্তি হলো, শিশু পুস্তক পড়ে যা শেখে, চোখে দেখে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি শেখে এবং জীবনে সে তা প্রয়োগ করার সাহস সঞ্চার করে। আর ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী অনিল ভট্টাচার্য শিশুদের সম্পর্কে বলেছেন, আজকাল শুধু পড়াশোনা দিয়ে কিছু হয় না, বিশ্ব ভ্রমণ খুব প্রয়োজন।

শুধু পড়াশোনা দিয়ে সত্যি আজকাল কিছু হয় না। পড়াশোনার সঙ্গে বহির্মুখী দৃষ্টিও যেন প্রয়োজন খুব। পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে পৃথিবীটাকেও চিনতে হয়, জানতে হয়। চোখ কান খুলতে হয়। বুঝতে হয়। বিবেচনা করতে হয়। সে জন্য শিশুকে শুধু ক্লাসের ফার্স্ট করার জন্য উঠেপড়ে না লেগে তার ভালোলাগা মন্দলাগার দিকে খেয়াল করে শিশুকে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত করাটাও জরুরি। পাহাড় কিভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, ঝরনা কিভাবে ঝরে, মানুষ কিভাবে আকাশে যায়, বিমান কিভাবে ওড়ে- শিশুরা এসব চোখে দেখলে বুঝতে শেখে, জানতে শেখে, অনুধাবন করতে শেখে। ঘর আর শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বাহির আছে, আছে আনন্দের অনেক কিছু।

তাই শিশুকে নিয়ে ঘরের বাহির হবার সুযোগ হয়তো এই ছুটির সময়টাতেই। ব্যস্ত নগরজীবনে সময় কোথায় সময় করার! উৎসবে পার্বণে যে কয়েকটা দিন বেশি ছুটি পাওয়া যায়, তাই হতে পারে স্নেহের শিশুটিকে নিয়ে উড়াল দেবার সময়। ঘুরে আসা যেতে পারে দূরে কোথাও, যেখানে যাওয়া যায় না অল্প সময়ে। শিশুর বিকাশের জন্যই অভিভাবকের তা করা উচিত।

১. সময় এখন প্রতিযোগিতার। প্রতিটি ক্ষেত্রে টিকে থাকতে হয় প্রতিযোগিতা করেই। সেই শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে একটি ভালো কর্মসংস্থান পর্যন্ত। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি বিচক্ষণতাও জরুরি। ভ্রমণ চোখ খুলে দেয়। বুদ্ধিকে শাণিত করে।

২. ছুটির কয়েকটা দিন হতে পারে শিশুকে নিয়ে ভ্রমণের উত্তম সময়। বাড়ির কাছে অথবা যেখানে যাওয়া হয়নি সেখানে যাওয়া যেতে পারে।

৩. বাংলাদেশের প্রতি জেলাতেই আছে পর্যটনকেন্দ্র। ভ্রমণের মতো যথেষ্ট জায়গা আছে।

৪. যাদের অবস্থা সচ্ছল তারা চাইলেই শিশুকে দেখিয়ে আনতে পারেন বিখ্যাত কোনো জায়গা।

৫. ভ্রমণের জায়গা যদি ঘরের কাছেও হয় শিশুর হাতে ছেড়ে দিন দায়িত্বের কিছুটা অংশ। নেতৃত্ব দিতে দিন তাকে যতটুকু সম্ভব। আর না হলে তাকে আগে আগে হাঁটতে দিন।

৬. যেখানেই শিশুকে নিয়ে যাবেন সে জায়গাটি সম্পর্কে আপনি আগে জেনে নিন বিস্তারিত, তার ইতিহাস, ঐতিহ্য। যেন শিশুর প্রশ্নের উত্তর আপনি দিতে পারেন নির্ভুল।

৭. আমরা সবাই জানি, বিদেশে অভিভাবকরা তাদের একাধিক শিশুকে একাধিক স্কুলে ভর্তি করান, যেন তারা বিভিন্ন জায়গা অবস্থান পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে, বুঝতে ও শিখতে পারে।

৮. উন্নত দেশের নাগরিকরা ভ্রমণকে শিক্ষার অন্যতম উপাদান মনে করেন। তাই ছুটির সময়গুলো তারা কখনোই বাড়িতে বসে কাটান না। এমনকি তারা ভ্রমণের জন্য সারা বছর সঞ্চয় করেন।

৯. ভ্রমণ শিশুর ইন্দ্রিয়গুলো খুলে দেয়। জড়তাহীন জীবনের জন্য ভ্রমণের বিকল্প নেই।

১০. জ্ঞান সমৃদ্ধ করার জন্য ভ্রমণই একমাত্র উপায়। শিশুকে যতটুকু সম্ভব সে সুযোগ করে দেয়া উচিত অভিভাবকের।

১১. আর কিছু না হোক বছরে অন্তত দুই থেকে তিনটি উৎসবের সময় হওয়া উচিত শিশুকে নিয়ে ভ্রমণের। শিশুর বিকাশের জন্যই তা মন্দ নয় কিছুতেই।

১২. ছুটির সময়টুকু কেবল ঘুম আর খাওয়া দাওয়া না করে শিশুকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। ঠিক করুন উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিমের যে কোনো একটি দর্শনীয় স্থান। পাহাড়, পর্বত, ঝরনা, সমুদ্র কিংবা কোনো গাঁয়ের মাঠই হোক না সে অদেখা স্থান।


একটি সত্যি গল্পের কথা বলি, ছোট্টবেলা আমাদের খেলার সাথী সবুজ অয়নের মতোই পড়ায় পটু ছিল। শুধু পড়ত আর পড়ত। কারো সাথে মিশত না, খেলত না, বেড়াতে যেত না। তার মা যেতে দিত না। আমরা খেলতাম, বেড়াতাম, ঝগড়া করতাম, এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় টইটই করতাম। আবার পড়তামও। বড় হয়ে আমাদের সবারই ভালো কিছু হয়ে গেল। কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা, কেউ শিল্পী, কেউ ওকালতি; সবুজের কিছুই হলো না। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েও মানুষ দেখলে সবুজ ভয় পায়। কথা বলতে গেলে তো তো করে। ইন্টারভিউয়ে বাদ হয়ে যায়। ব্যবসা ম্যানেজ করতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কঙ্গো রাজ্যের নাড়ি-নক্ষত্র তার জানা। সবুজ এখন একটি স্থানীয় কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষক!

শিশুর জন্য বাহির একটি বিশাল ক্ষেত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুকে বাহির পৃথিবীর সাথে মিশতে দিতে হবে। জানতে দিতে হবে। দেখতে দিতে হবে। যত বেশি দেখানো যায়, ঘোরানো যায়, তা শিশুর জানাকে সমৃদ্ধ করে। শিশু সাবলীলভাবে বেড়ে ওঠে। আনন্দ নিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে শেখে। শিশুর সঠিক বেড়ে ওঠার জন্য, মানসিক বিকাশের জন্য ভ্রমন একটি জরুরি উপাদন। তাই ছুটির কয়েকটি দিন ঘুরে আসুন না, কাছে দূরে কোথাও থেকে?
 

আরকে / এম

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়