• ঢাকা শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫

পাহাড় চূড়ায় বুদ্ধের চোখ

লাইফস্টাইল ডেস্ক
|  ০৬ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:০০
নেপালের কাঠমান্ডু শহরের পশ্চিমে কাঠমান্ডু উপত্যকা নামের এক পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ম্ভুনাথ স্তুপা বা মন্দির। এটি নেপালের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি। কেবল নেপালের জন্যই নয়; সারা পৃথিবীতে এ জাতীয় বৌদ্ধমন্দির বিরল। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে এটি। সেখান থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন গাজী মুনছুর আজিজ।

মন্দিরে ঢুকতেই দেখি প্রচুর বানরের ঘোরাঘুরি। বুঝলাম এজন্যই এ মন্দিরকে অনেকে বানর মন্দির বলেন। বিশেষ করে পর্যটকের কাছে এ মন্দির বানর মন্দির নামেই বেশি পরিচিত। তবে এ বৌদ্ধমন্দিরটির পোশাকি নাম স্বয়ম্ভুনাথ স্তুপা। আর এটি ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও স্থান পেয়েছে।

বিকেলের দিক হওয়াতে মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে পূণ্যার্থী আর পর্যটকের বেশ ভিড়। সেই ভিড় ঠেলেই আমরা প্রবেশ করি। মূল মন্দিরে যাওয়ার আগে; প্রবেশ প্রাঙ্গণে আরও কয়েকটি ছোট ছোট মন্দির আছে। সেইসঙ্গে বাঁধা আছে বিশাল একটি ঘণ্টা। এর পাশেই আছে ছোট্ট একটি পুকুর। বিশ্ব শান্তি নামের এ পুকুরের মাঝখানে আছে গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। আর মূর্তির পায়ের কিছুটা দূরে একটা গ্লোব আছে। গ্লোবের গায়েও লেখা আছে ওয়ার্ল্ড পিস বা বিশ্ব শান্তি। এ মূর্তির পায়ের কাছে দেখি অনেক পূণ্যার্থী নেপালি রুপির কয়েন ছুঁড়ে দিচ্ছেন এবং এটা তারা করেন পূণ্যের আশায়।

মূল মন্দিরে যাওয়ার জন্য আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি। পাহাড় কেটে এ সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। বেশ দীর্ঘ সিঁড়ি। মূল মন্দিরের আশপাশে আরও অনেক ছোট ছোট মন্দির আছে। আর মন্দিরের পাশে আছে অনেক দোকান। এসব দোকানে সাজানো নানা ধরনের অ্যান্টিক, গহনা, পর্যটন-স্মারকসহ নেপালের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্য। রেস্টুরেন্টও আছে কিছু। সব জায়গাতেই আছে পূণ্যার্থী আর পর্যটকের ভিড়।

ইতিহাস ঘেঁটে পাই এ মন্দির নেপালের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি। কেবল নেপালের জন্যই নয়, সারা পৃথিবীতে এ জাতীয় বৌদ্ধমন্দির বিরল। সেজন্য বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের কাছে এ মন্দির পবিত্র স্থান। আর বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপাল বলেও এ মন্দির বৌদ্ধদের কাছে পূণ্যের তীর্থস্থান। নেপালের গোপালরাজাবংশাবলীর মতে, রাজা মানদেবের (৪৬৪-৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) দাদা এ মন্দির তৈরি শুরু করেন। এছাড়া এ মন্দিরে খুঁজে পাওয়া একটি পতিত নামফলক থেকে জানা যায়, যেখানে রাজা মানদেব কর্তৃক কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেয়া আছে। যদিও রাজা অশোক তৃতীয় শতাব্দীতে এ স্থান পরিদর্শন করেন এবং একটি মন্দির তৈরি করেন যা পরে ধ্বংস হয়ে যায়।

মূল বৌদ্ধমন্দিরটির কিছুটা পাশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার স্থান আছে। ফলে দুই ধর্মের পূণ্যার্থীদের কাছেই এ মন্দির বিশেষ স্থান। এছাড়া বহু হিন্দু রাজা বিভিন্ন সময় এ মন্দির পুনঃনির্মাণে অর্থলগ্নি করেছেন, যার মধ্যে কাঠমান্ডুর প্রতাপশালী রাজা প্রতাপ মাল্লাও আছেন; যিনি ১৭ শতাব্দীতে মন্দিরের পূর্বদিকের সিঁড়ির রাস্তাটি সংস্কার করেন। অবশ্য এরপরে আরও কয়েকবার এ মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পেও এ মন্দিরের কিছুটা ক্ষতি হয়। তারপর আবার সংস্কার করে বর্তমান অবস্থায় আনা হয় মন্দিরটি।

মন্দিরটি মূলত একটি গম্বুজ দ্বারা গঠিত। গোলাকার একটি ইট-সিমেন্টের তৈরি গম্বুজের উপর চতুর্ভুজাকৃতি চূড়া উঠে গেছে। সোনালি রঙের এ চূড়া বিভিন্ন ধাতবের তৈরি। এ চূড়ার প্রথম কিছুটা অংশ সমান। এ সমান অংশের চারপাশে দু’টি করে চোখ এক একটি করে নাক আঁকা আছে। বলা হয় বুদ্ধের চোখ ও নাক। এ চোখ ও নাক বিশেষ কিছু বাণীর প্রতীক। তারপর ১৩টি ধাপে অনেকটা পিরামিডের মতো চূড়া উপরে উঠে গেছে। এ ধাপগুলোও বুদ্ধের বিশেষ বাণীর প্রতীক। এরপরের অংশ পদ্ম, তারপরের অংশ ছাতা এবং চূড়ার শেষ বিন্দু বা শেষ অংশটুকু আলাদা আলাদা বাণীর প্রতীকী বহন করে।

স্তুপা বা মন্দিরটির চারপাশে পাঁচ বুদ্ধের মূর্তিও আছে। এছাড়া মূল মন্দিরের পাশে কয়েকটি মন্দির আছে যেগুলো পুরোটাই বিভিন্ন ধাতবের তৈরি।

আমরা ঘুরে ঘুরে এসে দাঁড়াই মন্দিরের একটি পাশে, যেখান থেকে কাঠমান্ডু শহরটিকে দেখা যায় পাখির চোখে। এ ভিউটা সত্যিই দারুণ। আর এ ভিউ দেখার জন্য এখানে প্রচুর পর্যটকের ভিড়ও আছে। এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার ঘুরতে শুরু করি। সত্যিই মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে অসংখ্য বানরের ঘোরাঘুরি আছে। এরা বেশ শান্তভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্যটক বা পূণ্যার্থী কাউকে বিরক্ত করছে না।

মন্দিরের প্রায় সর্বত্রই আছে প্রার্থনার হুইলার। পূণ্যের আশায় পূণ্যার্থীরা এটা ঘুরান। ড্রাম আকৃতির এ হুইলার কাঁসাপাতিল বা বিভিন্ন ধাতবের তৈরি। প্রতিটি হুইলারের গায়ে বৌদ্ধধর্মের বাণী খোদাই করে লেখা আছে। ঘুরে ঘুরে আমরা আসি মন্দির প্রাঙ্গণের জাদুঘরে। এ জাদুঘরে প্রাচীন আমলের কষ্টি পাথরের এবং পিতলের তৈরি বুদ্ধের বিভিন্ন মূর্তি আছে। সেই সঙ্গে আছে প্রাচীন আমলের আরও নানা নিদর্শন। এছাড়া  মন্দির প্রাঙ্গণে একটি লাইব্রেরিও আছে।

ঘুরতে ঘুরতে আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি মন্দিরের গেটে। গেটের কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্টে বসি দুপুরের খাবার খেতে। রেস্টুরেন্টের মালিক মধ্যবয়স্ক মহিলা দু’প্লেট গরম গরম ফ্রাইড রাইস এনে আমাদের সামনে দেন। ঠাণ্ডা পড়েছে আবার ক্ষুধাও লেগেছে বেশ; তাই শেষ বিকেলের এ গরম গরম ফ্রাইড রাইস যেন অমৃত মনে হলো। খাবার শেষে এবার চায়ের পর্ব। দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে হাজির হলো এক তরুণী। রেস্টুরেন্টের মালিকের মেয়ে তিনি। মূলত ছোট্ট এ রেস্টুরেন্ট মা-মেয়ে মিলেই চালান। চা শেষ করে ট্যাক্সিতে উঠি পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে।

আরকে/পিআর

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়