• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

স্বর্গীয় উদ্যান ‘ভিলা ভিজকায়া’য় একদিন

সৈয়দ আশিক রহমান
|  ১৪ জুন ২০১৭, ১২:১৪ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৭, ১২:৩৬
আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে বেশ সাজানো গোছানো শহর ফ্লোরিডার মায়ামি। গাড়ির জানালা দিয়ে যতটুকু দেখলাম তাতে মনে হলো সত্যিই এ শহরের আভিজাত্য বিশ্বের অনেক শহরের তুলনায় আলাদা! ২০০৭ সালে জাতিসংঘ মূল্যায়ন করেছিল নিউইয়র্ক সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগোর পরে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম শহর এই মায়ামি।

তার প্রমাণ পেলাম রাস্তা-ঘাট, শপিং মল আর আকাশ ছোঁয়া অত্যাধুনিক বিল্ডিং দেখে। টেলিভিশন, সংগীত, ফ্যাশন, সিনেমা, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে মায়ামি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। মায়ামির সমুদ্র বন্দরও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন্দর।

এপ্রিলের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর মায়ামিতে যেতে হয়েছিল আরটিভি ও বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম অব মায়ামি আয়োজিত ‘প্রবাসী আলোকিত নারী’ সম্মাননা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

`প্রবাসী আলোকিত নারী’ সম্মাননা অনুষ্ঠান শেষে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফিরলাম। ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক হয়ে ফ্লোরিডার মিয়ামি আসতে শরীরের ওপর ভ্রমণের বেশ ধকল গেছে তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক ঘণ্টা ঘুমের দরকার। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পেলাম না।

ঘুমের পর যখন সকালে চোখ মেললাম দেখি শরীর-মন এক্কেবারে ফিট! ভ্রমণ পিয়াসী মনটা ছটফট করে উঠলো কোথাও বেরিয়ে পড়বার জন্য। আমার এক নিকটাত্মীয় শোভন আনোয়ার এই শহরেই থাকে এরইমধ্যে সে হোটেলে এসে পৌঁছে গেছে। তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মায়ামির দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে।

আমাদের গাড়ি ছুটলো দক্ষিণ মায়ামির পশ্চিম দিকে। ঘন্টাখানেক চলার পর নাগরিক  কোলাহল পেছনে ফেলে পৌঁছে গেলাম শহরের উপকণ্ঠে। হাইওয়ের একপাশে সাজানো-গোছানো আধুনিক শহর, অন্যপাশে ঘন সবুজ অরণ্য। এবারে, আমাদের গাড়ি এগিয়ে গেল অরণ্যের পথ ধরে। পথের দুপাশে উঁচু উঁচু শতবর্ষী গাছ, যেন এক একটা নির্মল অক্সিজেন উৎপাদনের ফ্যাক্টরি। বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছি আর এগিয়ে যাচ্ছি বিস্কেইন উপসাগরের (Biscayne Bay) মাঝে ‘ভিলা ভিজকায়া’ (Villa Vizcaya)-র দিকে। 

ফ্লোরিডার শিল্পরসিক ধনকুবের ব্যবসায়ী জেমস ডিরিং ৭,৩০,০০০ বর্গমিটারের এই প্রসাদ-উদ্যানটি শীতকালীন আবাসস্থল হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপনাটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯১৪ সালে। আর শেষ হয়েছিল ১৯২২ সালে। জেমস ডিরিং ১৯২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এই প্রসাদেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন শিল্পবোদ্ধা, শিল্প-সংগ্রাহক এবং রুচিশীল মানুষ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। জেমস ডিরিং এর মৃত্যুর পর তার বংশধরেরা ১৯৫২ সালে এই এস্টেটটি জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেয়। আজ এই জাদুঘর এবং উদ্যানটি সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্য, বাগান এবং শিল্প ও জীবন্ত সংগ্রহ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পর্যটন কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে গণ্য।

এই প্রসাদ-উদ্যানে অনেক বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র ও মিউজিক ভিডিওর সুটিং হয়েছে। মনে পড়লো কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম Tony Rome, Bad Boys II, Iron Man 3 ইত্যাদি। এসব কথা ভাবতে ভাবতে এসে পড়লাম ভিজকায়া জাদুঘর ও উদ্যানের ‘এস্টেট এন্ট্রান্স’ অর্থাৎ সিংহদুয়োরের সামনে। নাম না জানা শতবর্ষী গাছপালায় ঘেরা চারদিক। সুনসান পরিবেশ। পাখিদের কূজন আর বিস্কেইন উপসাগরের মৃদুমন্দ বাতাসে কেঁপে ওঠা পাতার শন শন শব্দ নিস্তব্ধতাকে আরও গাঢ় ও রহস্যময় করে তুলেছে।

পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে অন্যান্য পর্যটকদের সঙ্গে আমরাও প্রবেশ করলাম ভিজকায়া চত্বরে। হাঁটতে হবে অনেকখানি পথ। আঁকা বাঁকা হাঁটা পথ ধরে শুকনো পাতার ওপর পা ফেলে মর্মর শব্দ তুলে এগিয়ে চলছি সামনে। চোখে পড়লো পথের দুপাশে গাছের আলোছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নিপুণ কারুকার্যে গড়া ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যগুলো। ভাস্কর্যগুলোর সামনে না দাঁড়িয়ে উপায় নেই। চোখ ভরে দেখলাম এর সৌন্দর্য। দেখে মনে হলো কত মমতায় কঠিন পাথর কেটে কেটে শিল্পীরা নির্মাণ করেছেন এই নিখুঁত শিল্পকর্মগুলো। ভাস্কর্যগুলো ছুঁয়ে নাম-না-জানা সেসব শিল্পীর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জানালাম।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসে পড়েছি একেবারে ভিজকায়া জাদুঘর ও উদ্যান চত্বরে। আমাদের পেছনে ভিজকায়া প্রসাদ-জাদুঘর। আর সামনে বিস্কেইন উপসাগরের নীল জল। এগিয়ে গেলাম বিস্কেইন উপসাগরের দিকে। বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে সমুদ্রের পাড় বেঁধে নির্মাণ করা হয়েছে রাজকীয় বিশ্রাম চত্বর। বয়সের ছাপ পড়েছে পাথরগুলোর ওপরেও। নোনা ঢেউয়ের ঘর্ষণে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে পাথরের কিনারাগুলো। কয়েকটি স্তম্ভ দেখলাম বয়সের চাপে হেলে পড়েছে। তবে একসময় এগুলো যে সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়াতো সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রমোদতরী বেঁধে রাখবার স্তম্ভগুলো কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একাকী। প্রাসাদের পাড় থেকে কিছুটা দূরে বিস্কেইন উপসাগরের নীল জলের মধ্যে রয়েছে রেলিং ঘেরা কারুকার্যময় পাথরের উঁচু বিশ্রাম স্থল। বাঁধানো পাথরের সেতু পার হয়ে সেখানে যেতে হয়। বিস্কেইন উপসাগরের খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম শত বর্ষ আগে এখানকার পরিবেশ কেমন ছিল!  

এবারে আমরা এলাম তিনতলা বিশিষ্ট মূল প্রসাদের সামনে। এটাই মূল জাদুঘর। সমতল থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় তৈরি হয়েছে প্রাসাদগুলো। কেন্দ্রে অবস্থিত মূল প্রাসাদটি টালির দোচালা বিশিষ্ট তিনতলা। দুপাশের প্রসাদগুলো কোনটি একতলা কোনটি দোতলা তবে ছাদগুলো সমতল। রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি না থাকলেও বয়সের ছাপ পড়েছে দেয়ালের গায়ে। বৃষ্টি আর সাগরের আদ্র আবহাওয়ায় শেওলা জমেছে প্রাসাদের দেয়ালে আর বাগান-দেয়ালচিত্রে।

সিঁড়ির ষোলটি ধাপ বেয়ে দাঁড়ালাম প্রাসাদের ব্যালকনিতে। এই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি রাখলাম। দেখলাম গাছপালায় ঘেরা সবুজ চত্বর আর পানির ফোয়ারা। অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য আর স্বচ্ছ পানির নহর। পানির আরশিতে গাছ আর আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে এক চমৎকার ছবির ক্যানভাস তৈরি হয়েছে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে মনে হলো আমি যেন উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কোন নাটকের সেটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। কলেজ জীবনে পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পনেরো-আনা’ প্রবন্ধের প্রথম দুটো লাইন মনে পড়ে গেল। তিনি লিখেছিলেন, ‘যে লোক ধনী, ঘরের চেয়ে তাহার বাগান বড়ো হইয়া থাকে। ঘর অত্যাবশ্যক; বাগান অতিরিক্ত, না হইলেও চলে। সম্পদের উদারতা অনাবশ্যকেই আপনাকে সপ্রমাণ করে’।

এবার আমরা প্রবেশ করলাম মূল প্রাসাদে। বারান্দা পেরিয়ে উঠোন। উঠোনে রয়েছে পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য সুবন্দোবস্ত। কারুকাজ করা লোহার টেবিল-চেয়ার-বেঞ্চ পাতা। সুভ্যেনির শপ রয়েছে একটি। একটু বিশ্রাম নিয়ে ঢুকবো মূল জাদুঘরে। শুনেছি কক্ষগুলোতে রয়েছে ধনকুবের জেমস ডিরিং এর সংগৃহীত পেইন্টিংস-এর বিশাল আয়োজন।

প্রাসাদটির ভেতরে রয়েছে সত্তরটি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষ ইউরোপীয় গৃহসজ্জা ও শিল্পসজ্জায় সাজানো। ছাদ, মেঝে আর দেয়ালের কারুকাজ আর স্থাপত্যশৈলী দেখে আমাদের চক্ষু স্থির হবার যোগাড়। কী অপার সৌন্দর্যবোধ থাকলে এমন নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলা যায়! ছাদ, মেঝে, দরজা, জানালা, পিলারের ডিজাইন এবং রং এক কথায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবার মতো। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজকীয় ডিজাইনের আসবাবপত্র, বিশাল দেয়ালজোড়া পেইন্টিংস, নিখুঁত কারুকাজে গড়া ঝাড়বাতি, ঝলমলে পর্দা, ব্রেকফার্স্ট রুম, টি রুম, মিউজিক রুমের আদ্যিকালের গ্র্যান্ড পিয়ানো ও হার্প। এখানকার স্থাপত্যশৈলীর সমন্বিত আয়োজন যেকোনো পর্যটককে মোহাবিষ্ট করে রাখবে দীর্ঘদিন। একেকটি কক্ষ যেন একেকটি আর্ট মিউজিয়াম।

ভিজকায়া প্রসাদে ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ এক ভয়ংকর চুরি হয়েছিল। প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ঐতিহাসিক আর্টওয়ার্ক ও রৌপ্য নির্মিত আইটেম নিউ ইয়র্ক সিটির তিনজন ব্যক্তি চুরি করেছিল। অবশ্য নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের সার্জেন্ট টম কানলোলি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে ম্যানহাটন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সেগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

মিউজিয়ামের সত্তরটি কক্ষ আর বাইরের চারপাশ সবটুকু ঘুরে দেখা সম্ভব হলো না এটুকু সময়ের মধ্যে। তবে যেটুকু দেখলাম তাতেই মন ভরে গেল। ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি দিয়েগো সুয়ারেজ এবং আর্ট কিউরেটর, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ও চিত্রশিল্পী পল চার্ফিন এর নান্দনিক ডিজাইনে নির্মিত হয়েছে এই ‘ভিলা ভিজকায়া’।

যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে তাঁদের এই মহৎ সৃষ্টি। হেলে পড়া সূর্যের গোধূলি আলোর রং গায়ে মেখে ফিরলাম হোটেলের পথে।

অনুলিখন : সৈয়দ সাবাব আলী আরজু

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়