সৌদি-কানাডা দ্বন্দ্বের আসল কারণ কী?

প্রকাশ | ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:০৫ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০১৮, ১০:০৭

আরটিভি অনলাইন ডেস্ক
সামার বাদাউয়ি (ফাইল ছবি)

বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ভদ্র দেশ’ হিসেবে পরিচিত কানাডা হঠাৎ করেই সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টুইটকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের শুরু। সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে অটোয়াকে এক হাত নেয় রিয়াদ।

কিন্তু কেন হঠাৎ করে সৌদির সঙ্গে কূটনৈতিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লো কানাডা? আপাতত দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বিষয় মনে হলেও এই দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছেন একজন নারী। সামার বাদাউয়ি নামের এই সৌদি নারী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারী অধিকারকর্মী হিসেবে বেশ সুপরিচিত।

অথচ ২০১২ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়া সামার বাদাউয়ি কয়েক দিন আগ পর্যন্তও কানাডায় খুব পরিচিত কেউ ছিলেন না। তিনি যতটুকু পরিচিত পেয়েছিলেন সেটি তার ভাই ব্লগার রাইফ বাদাউয়ির কল্যাণে। ধর্ম অবমাননার দায়ে রাইফকে ২০১২ সালে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এক হাজার দোররা এবং ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

২০১৫ সাল থেকে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে কানাডায় বসবাস করছে রাইফের পরিবার। সম্প্রতি তার স্ত্রী ও সন্তানরা কানাডার নাগরিকত্বও পেয়েছেন। তারা কানাডা থেকেই রাইফের মুক্তির চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে সামার বাদাউয়ি ও নাসিমা আল-সাদাহকে গ্রেপ্তার করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। মূলত মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা কেন্দ্রে আসার পর তার চারপাশে থাকা বিপদ দূর করছেন। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে দেশটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং প্রিন্সকেও গ্রেপ্তার করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

তবে মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেকে একজন উদারপন্থী সংস্কারক দাবি করে যেসব কাজের কৃতিত্ব নিতে চাইছেন সেগুলো মূলত সামার এবং তার মতো অন্যান্য নারী অধিকারকর্মীদের সুদীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। আর সেই ফসল নিজের ঘরেই তুলতে চাইছেন যুবরাজ মোহাম্মদ।

-------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : তুর্কি অর্থনীতির ওপর হামলা মানেই পতাকায় হামলা: এরদোগান
-------------------------------------------------------

বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্দার সামনে সামার বাদাউয়ি থাকলেও সৌদি-কানাডা দ্বন্দ্বের মূল জায়গা অন্য কোথাও। আর সেটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সৌদির মোড়ল হয়ে ওঠার প্রয়াস। বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের পাশাপাশি কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ, আঞ্চলিক শক্তি ইরানের সঙ্গে বিরোধ এবং ইয়েমেনে হামলা চালানোর মতো বিষয়ও রয়েছে।

কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেসমা মোমানি বলেছেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে এটা নতুন, সাহসী সৌদি আরব যে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের ছাপ ফেলতে চাইছে।

বলা হচ্ছে একটি টুইটকে ঘিরে এই কূটনীতিক জটিলতা শুরু হলেও এর পেছনে রয়েছে যুবরাজ মোহাম্মদের ক্ষমতা অভিলাষ। নিজেকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া যাতে বিরোধীরা তার সমালোচনা করতে না পারে।

ইন্টারন্যাশনাল উইমেন কারেজ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সাবেক দুই ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা (বায়ে) ও হিলারি ক্লিনটনের (ডানে) সঙ্গে সামার বাদাউয়ি

রিয়াদের এই সাহসী কৌশল হয়তো বেশ কার্যকরও হয়েছে। কেননা সৌদি-কানাডা দ্বন্দ্বে অনেকটাই একা হয়ে পড়েছে অটোয়া। মিত্র যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক সমর্থন পায়নি তারা। অন্যদিকে আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশই রিয়াদকে সমর্থন দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অটোয়ার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন লন্ডনভিত্তিক থিং ট্যাংক চ্যাটহ্যাম হাউজের একজন ফেলো পিটার সালিসবারি। তিনি বলেন, এটা হতাশাজনক যে কেউই কানাডাকে সমর্থন করছে না। অথচ কয়েক বছর আগে এমন কিছু ঘটলে সবাই সম্ভবত এটি নিয়ে বেশ সরব হতো।

সংগ্রামী সামার হয়তো একদিন কারামুক্তি পাবেন কিন্তু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা রিয়াদ-অটোয়া দ্বন্দ্বে মানবাধিকারের নতুন এক সংজ্ঞা তৈরি হবে। কারণ বৈশ্বিক মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবের সমালোচনা থেকে বিরত থাকে তাহলে শাসক শ্রেণি আরও নিপীড়নমূলক হয়ে উঠতে পারে।


আরও পড়ুন :