• ঢাকা রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

অস্ট্রেলিয়ার গহীন মরুতে ১৮ শতাব্দীর বাংলা পুঁথি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
|  ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১০:১৬ | আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১০:৩৪
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলের প্রায় ৫০০ কিলোমিটার গভীর মরুভূমির একটি মসজিদে ৫০ বছরেরও আগে হঠাৎ একটি প্রাচীন গ্রন্থ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ব্রোকেন হিল নামে ওই মসজিদে এটিকে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন মনে করে এতদিন ধরে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।

কিন্তু একজন অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি গবেষক সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন সেটি আসলে বাংলা ভাষায় লেখা শত বছরেরও আগের একটি পুঁথি। বিবিসি বাংলা, এবিসি ও এসবিএসের অবলম্বনে।

গবেষক ড. সামিয়া খাতুন এই গবেষণার সূত্র ধরেই ২০ শতকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় তৎকালীন বাংলা এবং ভারতবর্ষ থেকে মানুষের অভিবাসনের চমকপ্রদ এক ইতিহাসেরও সন্ধান পেয়েছেন। যা নিয়ে শীঘ্রই লন্ডন থেকে তার একটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

১৯৬০-এর দশকে বইটি প্রথম যখন মসজিদটিতে পাওয়া যায়। তখন সেটিকে কোরআন হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। স্থানীয় একজন অপেশাদার ইতিহাসবিদ মার্গারেট প্রাইস বলেন, সবাই মনে করেছিল এটা কোরআন।

ড. সামিয়া খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ইতিহাসের বইয়ে যখন তিনি ওই কোরআনের কথা পড়েন। তখন তিনি তা দেখতে পাড়ি জমিয়েছিলেন সেখানে।

"পাঁচশ কিলোমিটার পথ গিয়ে বইটি খুঁজে বের করার পর খুলে দেখি সেটি কোরআন নয়, বাংলা কবিতা," বলেছেন ড. সামিয়া খাতুন।

ড. সামিয়া তার গবেষণায় দেখেছেন বহু জাহাজী সেসময় ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। উটের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বহু বাঙ্গালি। অনেক বাঙ্গালি সেসময় আয়ার (গৃহকর্মী) কাজ করতে সেখানে গিয়েছিলেন বলে তিনি তার গবেষণায় জেনেছেন।

এরা সেসময় অস্ট্রেলিয়ার গভীরে দুর্গম মরু অঞ্চলে কাজ করতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, "প্রথমে লেখাটি ছাপা হয়েছিল ১৮৬১ সালে, পরে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কয়েকবার পুর্নমুদ্রিত হয়ে যে কপিটি আমার হাতে আসে সেটি ১৮৯৫ সালে ছাপা।"

এসব মানুষের কাজ ও বসতির সূত্র ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্রোকেন হিল শহরে তাদের প্রথম অভিবাসী হয়ে আসার চমকপ্রদ তথ্যও পেয়েছেন এই গবেষক।

"এদের অনেকে উট নিয়ে কাজ করতে করতে সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি লোক জাহাজে কাজ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিলেন। এরপর যে কোন একটা কাজ জুটিয়ে নিয়ে মরুভূমি এলাকায় বা অস্ট্রেলিয়ার গহীন অঞ্চলে পৌঁছে যান।"

ড. সামিয়া বলেন, সেখানে যে মসজিদগুলো ছিল এই লোকেরা সেই মসজিদগুলোতে ঈদের সময় জড়ো হতেন। এভাবেই ব্রোকেন হিলসহ আশপাশের দুর্গম এলাকাগুলোয় তখন বাঙ্গালিদের একটা বসতি গড়ে ওঠে ।

১৮ এবং ১৯ শতকে বিশ্ব জুড়ে একটা ব্যাপক অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের লোক সেসময় নানা জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন।

ড. সামিয়া খাতুন 

ড. সামিয়া বলেন, অস্ট্রেলিয়াতেও ওই সময় একই ঘটনা ঘটেছিল। এই বাঙ্গালি অভিবাসীরা তখন অস্ট্রেলিয়ার গহীন এলাকায় পুঁথিপাঠ করতেন।

"এই বইয়ে যে বাংলা কবিতাগুলো রয়েছে সেগুলো গান করে অন্যদের পড়ে শোনানো হত- যেমনটা প্রাচীনকালে পুঁথিপাঠের ধারা ছিল।"

তিনি বলেন, এটা থেকে বোঝা যায় ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে বাঙ্গালিদের মধ্যে পুঁথিপাঠের একটা সংস্কৃতি চালু ছিল।

তার গবেষণায় ড. সামিয়া দেখেছেন সেখানে ওই সময় একটা বড়সড় বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী ছিল। এর ফলে সেখানে এই পুঁথিপাঠের চর্চা গড়ে উঠেছিল। এছাড়া অন্য দেশ থেকে সেখানে যাওয়া অনেক মানুষ সেই পুঁথিপাঠ শুনতে আসতেন। যারা বাঙ্গালি ছিলেন না। তাদের জন্য অনুবাদ করে এইসব কবিতা শোনানো হতো।

তবে সেইসময় যেসব বাঙ্গালি ওই দুর্গম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাদের বংশধররা এখনও সেখানে আছেন।

সেসময় স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে এরকম অনেক বাঙ্গালির বিয়ে হয়েছিল। তারা অবশ্য তখন ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে যাওয়া বাঙ্গালি ছিলেন।

"ফলে তাদের বংশধরদের এখন পাওয়া যায় আদিবাসী অ্যাবোরোজিন সম্প্রদায়ের মধ্যে যেহেতু ওই বাঙালিদের মধ্যে অনেক মিশ্র বিয়ের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়।"

ড. সামিয়া খাতুন বলেছেন সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই মিশ্র বিয়ের কারণে ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অ্যাবোরোজিন সম্প্রদায়ের ভাষায় ঢুকে গেছে বহু বাংলা শব্দ।

"যেমন চাপাটি শব্দকে ওরা বলে জাপাটি, ট্যাংক হয়ে গেছে টাংকি- এরকম বহু শব্দ রয়েছে। তারপর উট নিয়ে যেহেতু তারা কাজ করতেন, তাই উটকে তারা উট বলে।"

সেসময় যে মসজিদগুলো সেখানে ছিল, সেগুলোর কয়েকটা ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটা এখনও টিকে আছে। ওই মরু এলাকা খুবই শুষ্ক হওয়ার কারণে যেগুলো টিকে আছে। সেগুলোর ভেতরে "সবকিছু এখনও খুব ভালভাবেই টিকে আছে।"

 

​এ/ওয়াই

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়