• ঢাকা শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫

চা বাগানে পাক গণহত্যা-পৈশাচিক বর্বরতা

সহুল আহমদ
|  ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৭:৪৬ | আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৮:৫৪

সিলেটের চা বাগানগুলো একদিকে যেমন পর্যটকদের জন্য সৌন্দর্যের বিশালতা বুকে নিয়ে আছে তেমনি এগুলো সাক্ষী হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার, শোষণের এবং নৃশংসতম গণহত্যার। উনিশ শতকের গোড়াতেই চা’র বিকাশ শুরু। ১৮২৩ সালে আসামে প্রথমবারের মতো চা গাছ পাওয়া যায় এবং ১৮৩৯ সালের দিকে কয়েকজন ব্রিটিশ পুঁজিপতি এবং ভারতীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আসাম টি কোম্পানি’। পরবর্তীতে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঔপনিবেশিক শাসক ও ধণাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাছে এ বাগানগুলোর আকর্ষণ এবং দুর্ভিক্ষ ও দরিদ্রপীড়িত অঞ্চল থেকে সস্তা শ্রমিক আনার কারণে চা শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। ‘গাছ হিলায়েগা তো পায়সা মিলেগা’ বলে বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্রিশগড় অঞ্চল থেকে ভূমিহীন দরিদ্র মানুষগুলোকে চা বাগানে নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। পরবর্তীতে যেকোন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে চরম নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত শ্রমিকদের যোগসূত্র পাওয়া যায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিকে ১৯২১ সালে নিজেদের বন্দিদশা ভাঙতে ও নিজেদের অধিকারের দাবিতে ‘মুল্লুকে চল’ আন্দোলনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন শ্রমিকরা। সেই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে তাদের এমন সম্পৃক্ততা একাত্তরেও আবার দেখা যায়।

দেশভাগের পর অধিকাংশ হিন্দু জমিদার দেশত্যাগ করলে বাগান মালিকের শূন্যতা তৈরি হয়। সেখানে জায়গা করে নেন পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতিরা। ১৯৬৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১১৪টি চা বাগানের মধ্যে ৫৬টির মালিক পশ্চিম পাকিস্তানি পুঁজিপতি, ৪৭টির মালিক ইউরোপীয় এবং মাত্র ১১টির মালিক বাঙালি উদ্যোক্তা। ১৯৭০ সালের পরিসংখ্যান বলে, ১৬২টি চা বাগানের মধ্যে ৭৪টির মালিক পশ্চিম পাকিস্তানি উদ্যোক্তা। (সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া)  

চা বাগানে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার জন্য সবসময়ই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলো বিভিন্ন কমিউনিস্ট দল। সেটা আগে যেমন ছিল এখনো তেমন আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ১৯৬৯ সালের পর থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের যে তুমুল জোয়ার শুরু হয় সেখানে যোগ দেন চা শ্রমিকরাও। চা শ্রমিকদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো সংগঠন গড়ে না উঠলেও সত্তরের নির্বাচনে ‘বঙ্গবন্ধু’কে তারা দেখেছিলেন মুক্তির প্রতীক হিসেবে। অবশ্য, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাদের যোগসূত্রতাও ছিল। ১৯৫৬ সালে খাদিমনগর চা বাগানে বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদেরকে একবার বলেছিলেন, ‘তোমাদের সকল দুঃখের খবর রাখি। এসব দুঃখ দূর করার জন্যই চেষ্টা করবো এখন।’

১৮৬৯ সালের দিকে বাগানের বাইরে যেমন মাঠ উত্তপ্ত ছিল আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে, তেমনি বাগানও উত্তপ্ত ছিল শ্রমিকদের বিভিন্ন আন্দোলনে। সত্তরের নির্বাচনেও বাগানজুড়ে চলছিলো মিছিল-মিটিং-সভা-সমাবেশ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিকদের একাত্মতা এতো বেশি ছিল যে, কোনো কোনো বাগানে মুসলিম প্রার্থীদেরকে ঢুকতেই দেননি তারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় চা বাগানের শ্রমিক ও স্টাফদের ছিল অসামান্য অবদান। কখনো কখনো শ্রমিকরা টাকা তুলে পাঠাতন মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে। আমরইলছড়ার শ্রমিকদের কথা উল্লেখযোগ্য এখানে।

২৬ মার্চ পাকিস্তানের আক্রমণের একেবারে শুরুর দিকে চা শ্রমিকরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন অনেক জায়গায়। পরে অনেক চা শ্রমিক যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। গবেষক দীপংকর মোহান্ত চা শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা দিয়েছেন। সে তালিকায় আনুমানিক ৪৪২ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করেছেন। তবে এ সংখ্যাটা আরো বড় হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। 

চা বাগানের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে অবাঙালি ছিলেন সবচেয়ে বেশি কিন্তু কর্মচারিদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালি। অবাঙালি ব্যবস্থাপকের অনেকেই মার্চের শুরুতেই নিরাপদ আস্তানায় চলে যান এবং বাঙালি ব্যবস্থাপক ও কর্মচারিরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে তাদের হাত বাড়িয়ে দেন। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিকদের পাঠিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বাগানের মধ্যদিয়ে নির্বিঘ্ন চলাচলে সাহায্যও করেছিলেন। বৈকণ্ঠপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক তার কর্মচারি ও শ্রমিকদের দিয়ে বাগানের মধ্যে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন যেন মুক্তিযোদ্ধারা যাতায়াত করতে পারেন। কর্মচারিদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও আশ্রয় দেন মুক্তিযোদ্ধাদের। লালাখাল চা বাগানের এম এ সুলেমান তার গাড়ি দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। এ কারণেই গবেষক দীপংকর মোহান্ত বলেন, যুদ্ধের সময় বাঙালি মালিকানাধীন বাগানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক প্রকার আত্মীয়-বাড়ির মতো ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে চা শ্রমিক ও বাগানের কর্মচারিদের এমন সম্পৃক্ততা মোটেও ভালো চোখে নেয়নি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। চা বাগানগুলো ছিল সীমান্তবর্তী এলাকাজুড়ে। এ কারণে পাকিস্তানিদের বিশেষ নজর ছিল এসব এলাকায়। তাই কখনো মুক্তিযোদ্ধা খোঁজার নাম করে, কখনো রেশন কার্ড দেবে বলে, কখনো কিছু না বলেই একাত্তরের সেই ৯ মাসের যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাগানে পাকিস্তানি আর্মি চালায় ভয়ঙ্কর গণহত্যা।

     

সিলেট শহরের তারাপুর চা বাগানে গণহত্যা চালানো হয় ১৮ এপ্রিল। বাগানের মালিক তখন গুপ্ত পরিবার। পাকিস্তানিরা এসে সবাইকে ‘ডান্ডি কার্ড’দেয়ার কথা বলে। বলে যে, এ কার্ড পেলে তারা অবাধে চলাফেরা করতে পারবেন। গুপ্ত পরিবারের সব পুরুষ, বাগানের কর্মচারি ও শ্রমিকদেরকে জড়ো করা হয় গুপ্ত বাবুর বাড়িতে। তারপর কার্ড ইস্যুর জন্য তাদেরকে সিলেট রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের (ক্যাডেট কলেজ) দিকে মালনীছড়া হয়ে রওনা দেয়। তবে স্কুলে যাবার দরকার হয়নি। মালনীছড়া টিলাকেই পাকিস্তানিরা বেছে নেয় তাদের নৃশংস কাজের জন্য। মালিক ও কর্মচারিদের এক ভাগ এবং শ্রমিকদের দু’ভাগে আলাদা করা হয় তাদের। রাজেন্দ্র গুপ্তের ভাই, দু’ছেলে ও ভাইয়ের ছেলেও ছিলেন সেখানে। সঙ্গে ছিলেন মেডিক্যাল অফিসার ডা. ক্ষীতিশ চন্দ্র দে। এরপর মালনীছড়া টিলার পাশেই গুলি করে মালিক, কর্মচারি ও শ্রমিকদের হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। তাদের মাঝে সদানন্দ ও গনেশ হালদার নামে দু’শ্রমিক সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। সেদিনের গণহত্যায় ৩৮ জন শহীদ হন। এ বাগানে নারী নির্যাতনও চালায় পাকিস্তানিরা।

সিলেট শহরের খুব পাশেই লাক্কাতুরা চা বাগান। তখন এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। বাগানের ব্যবস্থাপকের বাসভবনের অদূরেই শ্রমিকদের ঝুপড়ি। মানবেতর জীবনযাপনে অভ্যস্ত এ শ্রমিকরা যেমন ছিল শিক্ষা থেকে অনেক দূরে, তেমনি দূরে ছিল যাবতীয় রাজনীতি থেকে। শ্রমিক কলোনিতে একদিন হাজির হয় পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিলে বাঁচার জন্যে সবাই এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন দলদলি চা বাগানে; কিন্তু রক্ষা হয় না। ভোর বেলাতেই আবার সেখানেই আগমন ঘটে পাকিস্তানিদের। নিঃস্ব শ্রমিকরা এবার আশ্রয় নেন কালাগুল চা বাগানে।

কালাগুল চা বাগান শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যাবার রাস্তাটা খানিক দুর্গম হওয়াতে তখন এ এলাকাটাকে অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেই মনে করতেন। তাই এখানে মোটামুটি অনেকেই এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৩ এপ্রিলের দিকে এখানে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানিরা। বাগানে ঢুকেই ব্যবস্থাপকের বাংলোয় ঢোকে পাকিস্তানিরা। সেখানে অবস্থান নিয়ে চারদিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে চালানো শুরু করে গুলি। প্রাণরক্ষার জন্য বাগানের শ্রমিকরা শুরু করলেন ছোটাছুটি; কেউ কেউ পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। কেউবা পালাতে গিয়ে শহীদ হলেন। আর কেউ কেউ ধরা পড়লেন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে।অনাহারে অর্ধাহারে বেঁচে থাকা হাড্ডিসার মানুষগুলোর ভেতর থেকে তুলনামূলক সজীব শ্রমিকদের আলাদা করে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় বাগানের পাশেই কাঁঠালতলি। একে একে সবাইকে সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন কালোগুনা লোহার, কোষ লোহার, সাধু বাউরি, তুফান লোহার, ভীম লোহার, মিঠাই লোহারসহ অন্তত ১৫ জন।নারী নির্যাতনও চলে নির্বিচারে।

সিলেট শহর থেকে মাইল পাঁচেক পূর্বদিকে হযরত শাহ পরাণের মাজারের পাশে খাদিমনগর চা বাগান একাত্তরের গণহত্যার আরেক সাক্ষী। ২৮ মার্চ খাদিমনগর চা বাগানের ৩ নম্বর বস্তিতে হানা দেয় পাকিস্তানিরা। তখন সবে সকালটা শুরু হয়েছে। ঘুম থেকে তুলে শ্রমিকদের নির্দেশ দেয়া হয় একসঙ্গে জড়ো হতে। বস্তির মাঝামাঝি জায়গায় সবাই জড়ো হলে তাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়; এক দলে নারী-শিশু, আরেক দলে পুরুষ। তারপর নারী-শিশুদের দলটাকে বিশ্বহরির ঘরে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। তাদের গগনবিদারী কান্নার চিৎকারে কিছুটা হলেও দয়ার উদ্রেক হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনার, চুপিসারে পেছনের দরজা খুলে তাদের বের করে দেয়। ঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

পুরুষের দলটিকে নিয়ে যাওয়া হয় একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। মৃত্যুর সামনে মানুষ লড়াই করে কিভাবে প্রাণটা রক্ষা করা যায়। প্রাণরক্ষার্থে তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে অনেকেই প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করেন। কেউ কেউ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর যারা পারেননি তাদেরকে বস্তির পূর্বদিকে একটি ছোট নালার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। কতোজনকে সেদিন হত্যা করা হয় তার ঠিক হিসেব পাওয়া যায়নি তবে সংখ্যাটা অনেক বড়। তারপর পাকিস্তানিরা মেতে ওঠে তাদের বিকৃত যৌনলালসা মেটাতে। ধর্ষণে ধর্ষণে ক্ষতবিক্ষত করে অসহায় স্বামী-পুত্র হারা শ্রমজীবী নারীদের দেহ।

খাদিমনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। তখন তিনিও চলে গেছেন। বাগানের অনেক শ্রমিকরা তখন পাড়ি জমিয়েছে পাশের দেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। এ বাগান তখন আরেক পাকিস্তানি কর্মকর্তার আস্তানা। ১৯ এপ্রিল তার নির্দেশে জড়ো করা হয় বাগানে থেকে যাওয়া সব শ্রমিকদের। রেশন দেয়া হবে বলে তাদের নিয়ে ঢোকানো হয় ব্যবস্থাপকের বাংলোর পেছনের এক কোয়ার্টারে। সবাইকে ভেতরে ঢুকিয়ে তারপর দরজা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানিরা। প্রথমে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মারে টিয়ারশেল। গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে ছটফট করতে থাকে ৪৬টি প্রাণ। তারপর শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। একে একে প্রাণ হারান ৪৪ জন। দু’জন বেঁচে যান অলৌকিকভাবে। দুর্গাহাজং, মতিলালহাজং, দিলীপহাজং, বনোয়ারী লালহাজং, হাড়োছত্রী, ভানুছত্রী, চরু নায়েকসহ আরো অনেকেই ছিলেন সেই ৪৪ জনের মধ্যে। এখানে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধর্ষিত হন বাতাসিয়া রুহিদাসহ আরো অনেক শ্রমজীবী মহিলা।

৬ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মালনীছড়া চা বাগানের সহকারি ব্যবস্থাপকের বাসভবন ঘেরাও করে পাকিস্তানিরা। শওকত নওয়াজ তখন বাগানের সহকারি ব্যবস্থাপক পদে। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক মানুষ, অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনকে। সেদিন শওকত নওয়াজ, তার ছোট ভাই ও ২ বন্ধু মেজবাহউদ্দিন ও আব্দুল কাদেরসহ আরো ৬ কর্মচারিকে ধরে আনে। বন্দি ১০ জনকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি পশুরা। বিজয়ের পর বধ্যভূমি থেকে সন্তানের কঙ্কাল উদ্ধার করেন শওকত নওয়াজের বাবা।

এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে কেওয়াছড়া চা বাগানে গণহত্যা চালানো হয়। আকারে ছোট এ চা বাগান সিলেট বিমান বন্দরের পাশেই অবস্থিত। বাগানে ঢুকেই পাকিস্তানিরা শুরু করে ব্যাপকহারে অগ্নিসংযোগ; শ্রমিক বস্তির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। নির্বিচারে চলে লুটপাট। নিরুপায় খেটে খাওয়া শ্রমিকরা তখন নিজেদের জীবন বাঁচাতে জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। পালাতে গিয়ে পাকিস্তানি জানোয়ারদের হাতে ধরা পড়ে যান সনেশ দাস, বছিয়া দাস, অতুল দাস, মাখন দাস, বিনোদ, রবিয়া, পাটুরিয়া মুড়া, শ্রীরামচরণ দাস ও শ্রীকৃষ্ণ দাস। তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় বাগানের ভেতর তেলচিবড়া বস্তিতে। যে কারণেই হোক, অতুল দাস ও মাখন দাসকে অন্যদের থেকে আলাদা করে বেঁধে রাখা হয়। বাকি শ্রমিকদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে কিছুক্ষণ মানসিক অত্যাচার করে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।

জৈন্তাপুর উপজেলার খান চা বাগানে ১৭ এপ্রিল সারাদিন কাজ করিয়ে রাতের আঁধারে ১৭ জনকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। সেদিন সকালে পাকিস্তানিদের জলপাই রঙের সামরিক কনভয়গুলো রাস্তায় দেখা মাত্রই বাগানের শ্রমিকরা তাড়াহুড়ো করে ভারতে পালিয়ে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেয়। জৈন্তা থেকে সীমান্ত খুব একটা দূরেও নয়। কিন্তু মাইল তিনেক পথ যাবার পরই পথ আটকায় পাকিস্তানিরা। বাগানে ফিরে যেতে বাধ্য করে শ্রমিকদের। তাদের মধ্যে শক্তসামর্থ ১৭ জন যুবককে আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয়। সারাদিন তাদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে রাতে গর্তে ঢুকিয়ে গুলি করে হত্যা করে তারা।

শ্রীমঙ্গল শহরের পাশেই অবস্থিত ভাড়াউড়া চা বাগানে গণহত্যা চালানো হয় ১ মে। অবশ্য তারিখ নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত আছে। ড. এম এ হাসানের ‘যুদ্ধ ও নারী’ বইতে ১ মে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার একাত্তরে সিলেটের যুদ্ধাবস্থা নিয়ে তথ্যবহুল বেশ কয়েকটা বই আছে তাজুল মোহাম্মদের। তার ‘সিলেটে গণহত্যা’ও ‘সিলেটের যুদ্ধকথা’বই দু’টিতে তারিখটা ২৭ মার্চ বলা আছে। মৌলভীবাজারের স্থানীয় কয়েকটি নিউজ পোর্টালে তারিখটা ৩০ এপ্রিল দেয়া আছে। তবে গণহত্যার কথা সব জায়গাতেই একইভাবে বলা আছে। সেদিন প্রাণ বিসর্জন দেন ৪৬ জন নিরীহ শ্রমিক। তবে সঠিক সংখ্যাটা আরো বেশি হতে পারে। অনেকেই সে সংখ্যা ৫৭ পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। রামদাড়ী হাজরা, কেদার হাজরাসহ অনেকেই সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান সেদিন। এ বাগানেও বীভৎস নারী নির্যাতন চালানো হয়। বেঁচে যাওয়া কেদারলাল হাজরা জানান, শুধুমাত্র ভাড়াউড়া বাগানেই ৪৫ জন নারী পাকি আর্মিদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন।

তারাপুর চা বাগানের শ্রমিকদের এখানেই হত্যা করা হয়
 

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দেওরাছড়া চা বাগানে গণহত্যা চালানো হয় ৩ এপ্রিল। এ বাগানের ম্যানেজার ছিলেন একজন বিহারি। ২৫ মার্চের কিছুদিন আগে ম্যানেজার বাগান ছেড়ে চলে যান তিনি। স্থানীয় দালালরা সক্রিয় ছিল এসব হত্যাকাণ্ডে। তারাই পরে শ্রমিক ঝুপড়িগুলোতে লুটপাট চালায়। নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে এখানে।

হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ৪ এপ্রিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী ইউনিটগুলোর কমান্ডাররা একত্রিত হন যুদ্ধের কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে। এখানেই জেনারেল ওসমানীকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। ২৯ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় পাকিস্তানিদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধের পর চরম আক্রোশে পাকিস্তানিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বাগানের শ্রমিকদের ওপর। প্রকাশ্য দিবালোকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় বহু শ্রমিককে। সবার নাম পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। আনন্ত পান, অনন্ত পান, মানব পান, বিরাট পান, ছানি খ্রিষ্টান, অর্জুন ছবরসহ আরো অনেকেই ছিলেন সেদিনের শহীদদের মধ্যে।

সিলেটের প্রতিটা চা বাগানে গণহত্যার পাশাপাশি চালানো হয় ব্যাপক নারী নির্যাতন। তারাপুর চা বাগানে গণহত্যা চালানোর পর আর্মি এসে তুলে নিয়ে যায় বাগানের মালিক রাজেন্দ্রলাল গুপ্তের তিন মেয়েকে। ক্ষতবিক্ষত দেহে পরে তিন বোনকে নামিয়ে দিয়ে যায়। খাদিমনগর চা বাগানে ধর্ষিত হয় অসংখ্য চা শ্রমিক। নির্যাতিত বাতাসিয়া রুহিদাসহ বহু নারীই চলে গেছেন দেশ ছেড়ে।

চা শ্রমিকরা ধর্ষণকে ‘বেইজ্জত’বলে। পার্বতী বুনারজী তখন কালাগুল চা বাগানে স্বামী সন্তানসহ সবাইকে নিয়ে কাজ করতেন। এক মধ্যরাতে পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের ঘরে ঢোকে। তার কথায়, ‘সে রাতে একজন আর্মিই আমার ঘরে ঢুকেছিল। সে ঢুকেই ঘরের দরজা ঠেলে বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার স্বামীর সঙ্গে ঐ মিলিটারির খুব ধস্তাধস্তি হয়। আমার স্বামী শেষ পর্যন্ত আমার শরীরের ওপর শুয়ে পড়ে আমাকে আগলাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেননি। ওরা জোর করে আমাকে নির্যাতন করেছে।’

আমাকে ছাড়াও কালাগুল চা বাগানের আরো অনেক মহিলাকে পাকি আর্মিরা সে সময় নির্যাতন করেছিলো। আমার সামনের ঘরের এক মহিলাকেও তারা বেইজ্জত করে। দুটো বউ ছিল ওই বাড়িতে। একজন তো ভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছে। আর একজনকে তারা ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে নির্যাতন করেছে...।’ 

শ্রীমঙ্গল চা বাগানের পুণ্যবতী ঘাসী বলেছিলেন, ‘নির্যাতনের কিছু বাকী রেখেছে নাকি? ১০টার সময় তো আমাকে আটকালো। আর ১২টার দিকে একজন আর্মি ঘরে ঢুকে আমাকে ধর্ষণ করলো। তখন বাইরে আরো ১০/১২ বারোজন আর্মি দাঁড়িয়েছিল।...তাদের কোনো কথাবার্তা লাগতো না। তারা ধরবে পটাকবে (ফেলে দিবে) তারপর ইজ্জত মেরে যাবে। খেজুরছড়ার লক্ষী নামের একটা মেয়েকে একেবারে আমার চোখের সামনে নির্যাতন করে শেষ করে দিলো।’

চুনারুঘাটের সুপ্রিয়া নায়েক তখন লস্করপুর বাগানে থাকতেন। ৭১ সালে তার বয়স ১৬ বছর। পাকি জানোয়াররা তাদের বাড়িতে ঢুকে তাকে তুলে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। বাগানের ফ্যাক্টরি তখন পাকিদের ক্যাম্প। সেখান থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পে তাকে নিয়ে যাওয়া হতো। চানপুর বাগানের চন্ডীরকীনার বাংলোতে তারা অনেক মেয়েকে আটকে রেখেছিল। বিভিন্ন ক্যাম্পের আর্মি অফিসাররা বাংলোর ক্যাম্পে এসে আমাকে ধর্ষণ করতো। প্রতিরাতে ৪/৫ জন করে পাকিস্তানি আর্মি আমাকে ধর্ষণ করেছে। কোনো রাতেই তারা আমাকে নিষ্কৃতি দেয়নি।’

ভাড়াউড়া চা বাগানেও ভয়ঙ্কর নারী নির্যাতন চালানো হয়। ৫০ জনের বেশি শ্রমিক এ বাগানে চালানো গণহত্যায় শহীদ হবার পর শুধু এখানেই ৪৫ জন নারী পাকিস্তানি আর্মিদের ধর্ষণের শিকার হন। সেই ধর্ষণের বীভৎসতা ফুটে ওঠা গণহত্যা থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কেদারলাল হাজরার কথায়, ‘এমনকি ৫০-৬০ বছরের বৃদ্ধাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি।’

ফুলছড়া চা বাগানের মুটারী নামের এক দেশোয়ালী মেয়েকে বাগানের ভেতরের দিকে নিয়ে গিয়ে ৩ আর্মি ধর্ষণ করেছিল। সেখানে বাগান থেকে ধরে নিয়ে ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো মেয়েদের। কুমারী মৃধা জানান, ‘শিশিরবাড়ি বাগানের এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিলো বেশি। আর্মিদের অত্যাচারে সেখানকার একজন মেয়ে মারা গিয়েছিল। বাগানের লোকজনের সামনেই তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।’

অল্প কয়টা বাগানের কথা উল্লেখ করলাম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এমন কোনো বাগান বাকি ছিল না যেখানে পাকিস্তানি সেনারা বর্বরতা চালায়নি। কিন্তু এ স্বাধীন দেশে চা শ্রমিকেরা কেমন আছেন? যে দেশের জন্য তাদের এতো আত্মত্যাগ সেখানে কিভাবে চলছে তাদের দিনকাল?

চা শ্রমিকদের জীবনে এক বিরাট ছাপ ফেলেছে ১৯৭১। এখনো সেটা তাদের কাছে ‘সংগ্রামের বছর’হিসেবেই চিহ্নিত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও চা বাগানের শ্রমিকরা এখনো মুক্তির স্বাদ পায়নি। তারা এখনো বাংলাদেশের যেকোন গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি বঞ্চনার শিকার। দু’বছর আগের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিতাড়িত হওয়ার পর চা বাগানের কর্তৃত্ব চলে যায় পাকিস্তানি পুঁজিপতিদের হাতে। তবে চলতে থাকে সেই ব্রিটিশ নিয়ম। একাত্তরে শোষক পাকিস্তানিদের বিতাড়নের পর বাঙালিদের কাছে আসে মালিকানা। তবে ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানি ম্যানেজারদের মতো কম যায়নি বাঙালি ম্যানেজার-মালিকরাও। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরুলেও চা বাগানে চলছে নিদারুণ শ্রমিক শোষণ। বাগানে এখনো চলে ব্রিটিশ আইন। মেমসাহেব, সাহেব, সর্দার, আর্দালিসহ চলে সব ব্রিটিশ আমলের ভাষা। শ্রমিকরা এখনো প্রতিমুহূর্তে প্রভাবশালী মালিক, ম্যানেজারের পায়ের নিচে। মাথা তুলে কথা বলার শক্তি তাদের নেই’। (বাংলানিউজ, ৩০ এপ্রিল, ২০১৪)

অনেক আন্দোলনের পর শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬৯ টাকা থেকে মাত্র ৮৫ টাকা হয়েছে। তবে এখনো স্যানিটেশনের ভালো ব্যবস্থা নেই, থাকার জন্যও নেই পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা। মালিকপক্ষ যে রেশনের কথা সবসময় বলে থাকেন সেটাও তাদের প্রতি এক ধরনের পরিহাস। শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাতেও ভয়াবহতার চিত্র সাক্ষ্য দেয় যে, শোষিত হওয়াটাই যেন তাদের নিয়তি।

তথ্যসূত্রঃ  ১. সিলেটে গণহত্যা – তাজুল মোহাম্মদ  ২. সিলেটের যুদ্ধকথা – তাজুল মোহাম্মদ  ৩. যুদ্ধ ও নারী – ড. এম এ হাসান  ৪. মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবনকোষ – বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ  ৫. চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ – অপূর্ব শর্মা  ৬. মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের চা শ্রমিক – দীপংকর মোহান্তে

এম/কে/

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়