• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

৬০তম জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মীর বরকত: আলো হাতে আঁধারের যাত্রী

প্রশান্ত অধিকারী
|  ২৯ জুন ২০১৮, ২৩:২৭ | আপডেট : ৩০ জুন ২০১৮, ১০:২০
মীর বরকতে রহমানকে আবৃত্তি কিংবা নাটকের মানুষ চেনেন মীর বরকত নামে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হকের দেয়া এ নামেই তাঁর দেশজুড়ে খ্যাতি ও পরিচিতি। আবৃত্তি প্রশিক্ষক হিসেবে আমার চেনাটাও সেই নামে, ১৯৯৮ সালের প্রথম দিকে স্বরশীলন আবৃত্তি একাডেমির কর্মশালায়। এরপর আরও খানিকটা কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটে ‘আবৃত্তিলোক’-এর সঙ্গে কাজ করার সুবাদে। তার পর থেকে আবৃত্তি ও সংবাদকর্মী হিসেবে বিভিন্ন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, নানা কাজে তাঁর কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। যতোই কাছে গিয়েছি, ততোই কাছাকাছি হয়েছি। যে কোনও প্রয়োজনে  সহযোগিতা পেয়েছি। টিএসসির আড্ডা থেকে তাঁর ঘরের আড্ডা পর্যন্ত পৌঁছে গেছি কী অনায়াসে। আবৃত্তিকর্মীদের জন্য তাঁর বাসা উন্মুক্ত। আবৃত্তি কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যখনই তাঁর বাসায় গেছি, কখনও খালি মুখে ফেরাননি। সেই স্বরশীলনের ক্লাস থেকে অদ্যাবধি কথা-গল্পে-আড্ডায় কতকিছু যে শিখেছি-জেনেছি, ক্লাসের শিক্ষক থেকে তাই তিনি আমার কাছে জীবনের শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : চরাক্ষেত যেন কৃষকের মৃত্যুফাঁদ
--------------------------------------------------------

প্রায় দুই দশক আগে ‘আবৃত্তিলোক’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে আবৃত্তি নিয়ে লিখে আবৃত্তিভাবনায় একটা মৌলিক পরিবর্তন এনেছিলেন। সেটি যখন ‘আবৃত্তির ক্লাস’ শিরোনামে বই আকারে প্রকাশিত হয়, তখন রীতিমতো তরুণ-প্রবীণ সকল আবৃত্তিশিল্পী-কর্মীদের কাছে অবশ্যপাঠ্য পুস্তক হিসেবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে বইটির তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি শিশু ও বড়দের; সবমিলিয়ে বেশ কয়েকটি আবৃত্তি প্রযোজনা নির্দেশনা দিয়েছেন। আবৃত্তি নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আমি মনে করি, সময় ও প্রয়োজন বিচারে তার ‘আবৃত্তির ক্লাস’ বইটির জন্যই তিনি বেঁচে থাকবেন। যদি কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আবৃত্তি বিভাগ চালু হয়, তখন এই বইটি অন্যতম একাডেমিক পাঠ্য হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

কণ্ঠশীলনের সংকটকালে তাঁকে বিচলিত হতে দেখেছি কিন্তু ভেঙে পড়তে দেখিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক বাজেকথা অনেকে বলেছেন কিন্তু তিনি কখনও মুষড়ে পড়েননি। এমনকি সেই বাজে কথার বিপরীতে কাউকে গালমন্দ করতে শুনিনি। বাকিটা জীবন আবৃত্তি নিয়ে, আবৃত্তির মানুষদের সঙ্গে কাটাবেন বলে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদের চাকরি থেকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে ইস্তফা দিয়েছেন। আবৃত্তির প্রতি তাঁর এই নিষ্ঠার বিপরীতে আবৃত্তির তথাকথিত কিছু মানুষ তাকে যখন প্রবল ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়েছি; তিনি তখন এই আমাদের জন্য উদারতার শিক্ষা দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেকে সেকথা জানেন না, আবার অনেকে সেকথা দেখেও দেখেননি। আমি দূর থেকে অবাক হয়ে শুধু তাঁর উদারতা আর মহানুভবতার পাঠ নিয়েছি।

আমাদের দেশের অনেক কৃতি মানুষেরা নিজে যে কাজ করেন বা যেটা বিশ্বাস করেন, সন্তান কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তাতে মনোযোগ বা বিশ্বাস স্থাপন করাতে পারেন না। সেই ক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রমদের একজন। সকল সন্তানদের তিনি শুধু আবৃত্তির পাঠই নেয়াননি; সাংগঠনিক আবৃত্তি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করেছেন। তাই তাঁর পুরো পরিবারই আবৃত্তির পরিবার।

প্রবল তারুণ্যে ওয়াহিদুল হক আর নরেন বিশ্বাসের যে মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিলেন; আজ তিনি দেশের হাজারও তরুণ প্রজন্মকে সেই বাণী, ছন্দ আর উচ্চারণের দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় এক দশক হলো আবৃত্তি প্রশিক্ষণ, নির্দেশনা ও গবেষণা নিয়ে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন। আবৃত্তিই তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান আর পেশা। আবৃত্তি প্রযোজনা নির্দেশনার পাশাপাশি নাটকও নির্দেশনা দিয়েছেন। অভিনয় করেছেন। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের আবৃত্তি নির্দেশনা দিয়ে রীতিমতো আবৃত্তির একটি অন্য ভাষা তৈরি করেছেন। নিজ সংগঠনের বাইরে গিয়ে আবৃত্তি, নাটক নির্দেশনা দিয়ে নিজেকে শুধু দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি সকল দলের, সকল মানুষের হয়ে উঠেছেন আপন মহিমায়। তাঁর এই জনপ্রিয়তায় ঈর্ষাকাতর হয়ে বিষবাষ্প ছুঁড়ে দিয়েছেন তারই ‘স্নেহধন্য’ কেউ কেউ। সময়ের বিবর্তনে তাদের সেই বিষবাষ্প বাতাসে মিলিয়ে গেছে, তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং দিন দিন তিনি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন। বাংলাদেশের আবৃত্তি গবেষণা ও প্রশিক্ষণে তাই আজ এক অপরিহার্য নাম মীর বরকত।

একবার এক মজার কাণ্ড ঘটেছিলো তাঁর অফিসে, সম্ভবত ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি তখন তাঁর কর্মস্থল সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ভল্টের দায়িত্বে। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ ব্যাংকের পাগলাঘণ্টি বেজে উঠলো। পুলিশ ব্যাংক ঘেরাও করলো। তাঁর ডাক পড়লো। তিনি কর্তব্যের প্রয়োজনে সেই মধ্যরাতে ছুটে গেলেন (যদিও সেই পাগলাঘণ্টি বাজার কারণ ছিল একটি বিড়াল)। এভাবে সারাদেশে দেশপ্রেমিক শুদ্ধ, সংস্কৃতবান নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনে পাগলাঘণ্টি বেজে উঠুক; আর রাতকে দিন করে জাদুরকাঠি হাতে নিয়ে আবৃত্তির আলো ছড়িয়ে দিন দেশজুড়ে। আপনি ছাড়া আমাদের আদর্শ ও সাহসের মূর্ত প্রতীক আর কয়জনই বা আছেন; রাতকে দিন করে, উচ্চতর বেতনের উচ্চপদস্থ চাকরির মোহ ত্যাগ করে, শুধুই আবৃত্তিকে জীবনের ধ্রুবতারা করে ফেরি করে ফিরবেন আবৃত্তির রূপ-রস-ছন্দ মাধুর্য? আপনিই তো আমাদের এ যুগের, এ সময়ের আবৃত্তির আদর্শ ফেরিওয়ালা।

আমাদের মাঝে ওয়াহিদুল হক কিংবা নরেন বিশ্বাস নেই। তাঁদের ছায়া নিয়ে আপনি এখনও আবৃত্তির পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন। আপনি না থাকলে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শিশু থেকে প্রবীণ সবাই কার সঙ্গেই বা আড্ডা দেবে; আর কে-এই বা এমন আপন করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আবৃত্তির কথা বলে বেড়াবে। তাই শুধু ষাটতম নয়, অশীতিপর নয়, শতায়ু হোন। আপনার ছায়ায় বিষমুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠুক আবৃত্তির নতুন প্রজন্ম। জয় হোক আবৃত্তির। জয় হোক আপনার।

লেখক: সাংবাদিক, আবৃত্তিকর্মী

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়