• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস: গণতন্ত্রের পথে যাত্রা

অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান
|  ১৬ মে ২০১৮, ১৩:৪৪ | আপডেট : ১৬ মে ২০১৮, ১৪:৩২
আগামীকাল ১৭ মে জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। একটু পেছনে ফিরে তাকাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ছিলো বাঙালি জাতির জন্যে একটি কালো অধ্যায়। এদিন আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারাই। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে যতটুকু অগ্রসর হয়েছিল, তার মৃত্যুতে পশ্চাৎপদ হতে হলো আরো বেশি। ১৯৭৫ এর পরবর্তী সামরিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা শক্ত করতে চাইলো। তারা চাইলো দেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরতরে মুছে ফেলতে। যার প্রেক্ষিতে স্বাধীনতার মূলচেতনা থেকে আমাদের সরানো হলো। লুণ্ঠিত হল আমাদের সংবিধান। ইনড্যামনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় তিন নেতার খুনীর বিচারের পথ বন্ধ করা হলো। কিন্তু ঘাতকরা জানতো না তারা যতই শক্তিশালী হোক, একদিন তাদের পতন ঘটবেই। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সেনাশাসক, রাজাকার আর মীরজাফরদের ক্ষমতা কখনও অবিনশ্বর হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে কখনও রুদ্ধ করা যায় না। তাই বাঙালির স্লোগান ধরলো ‘একমুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’।

পঁচাত্তর পরবর্তীতে শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবকে হত্যার পর নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দেশে ফিরতে দিলো না। কারণ তাদের ভয়, বঙ্গবন্ধুর কন্যারা দেশে আসলে সমস্ত অপশক্তি নস্যাৎ হবে, বাংলাদেশ আবার এগিয়ে যাবে দুর্বার গতিতে, বাস্তবায়িত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং পূরণ হবে জাতির জনকের সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন। দেখতে দেখতে কয়েক বছর চলে গেলো। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল। ১৯৮১ সালের ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সে কাউন্সিলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এ সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, ‘১৯৮১-এর সম্মেলনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জীবনপণ চেষ্টা করে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে আওয়ামী লীগের ঐক্য ধরে রেখে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উপর দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করেছিলাম। দলের শীর্ষ পদে তাকে নির্বাচিত করে আমরা ভারতের রাজধানী দিল্লি গিয়েছিলাম এবং তার সাথে পরামর্শ করে এই আগমন দিনটি নির্ধারণ করেছিলাম। যেদিন তিনি ফিরে এলেন সেদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মনে করেছিল তারা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকেই যেন ফিরে পেয়েছে। সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে সন্ধ্যার প্রাক্কালে সকলের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি যখন দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যার নাম প্রস্তাব করি, তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সে কী আনন্দ-উচ্ছ্বাস! চোখের সামনে সেই ছবি ভেসে ওঠে যা আজ ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না। মনে হয়েছে যে, আবার আমরা বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে, যে রক্তের কাছে আমরা ঋণী, যে ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না সেই রক্তের উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিয়ে ঋণের বোঝা কিছুটা হয়তো হালকা করতে পেরেছি।’

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : 'ছাত্রলীগ মানুষকে উন্নত স্বপ্ন দেখতে শেখায়'
--------------------------------------------------------

১৯৮১ সালের ১৭ মে। আজকের এমন দিনেই অনেক ঝুঁকি নিয়ে অবতরণ করেছিলো জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ভারতীয় এয়ারলাইন্স ৭০৭ বোয়িং বিমানটি। বঙ্গবন্ধুর কন্যা সেদিন সাদা রঙের ওপর কালো ডোরাকাটা তাতের শাড়ি পরে স্বদেশে ফিরলেন। আকাশে বাতাসে প্রকম্পিত হলো ‘জয় বাংলা/জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে। জনসমুদ্রে পরিণত হলো কুর্মিটোলা বিমান বন্দর, শৃংখলা ভেঙে পড়েছিল। সেদিন আবহাওয়া ভালো ছিলো না। শেখ হাসিনা তখন কাঁদছিলেন, প্রকৃতিও যেন তার সঙ্গে কেঁদে চললো। চারদিক অন্ধকার হয়ে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল, সাথে ভীষণ ঝড়। সেই বিরূপ আবহাওয়াও সাধারণ মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। লাখ লাখ মানুষ সেদিন সমবেত হয়ে তাকে ভালোবেসে বরণ করে নিয়েছিলো। দিনটি গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার জন্যে যে বিশেষ ছিলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাতির উদ্দেশ্যে আবেগময় ভাষণ দেন। তার ভাষণে দৃঢ়তার কোনো অভাব ছিলো না। আওয়ামী লীগের মতো স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বৃহৎ সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দানে তিনি নিশ্চিতভাবে সফল হবেন জননেত্রীর বক্তৃতায় তা পরিলক্ষিত হয়েছিল। তার কণ্ঠে জাতির জনকের আদর্শ প্রতিফলিত হলো। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। তেমনি শেখ হাসিনাও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি, আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে, আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ তার নেতৃত্বে শুরু হয় বাংলার মানুষের ভোট ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন, সূচনা হয় স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনের। তার আগমনে গণজোয়ার উদ্বেলিত হয়ে ওঠে সারাদেশ। হতাশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা সুসংগঠিত হতে শুরু করে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা তার জন্যে যেমন আনন্দের ছিলো, তেমনি বেদনারও। বাংলাদেশে সবকিছু রেখে তিনি প্রবাসে গেলেন, কিন্তু যখন দেশে ফিরে এলেন তখন এ দেশে তার পিতা নেই, পরিবার-স্বজন কেউ নেই। তিনি আর ছোট বোন শেখ রেহানা। বাংলাদেশ তখন গৌরব হারাচ্ছে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিকৃত করছে পঁচাত্তরের ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যে সংগ্রাম শুরু করেন। বাংলাদেশে আবার জাতির জনকের সোনার বাংলা নির্মাণের স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮১ সালে দেশে এসে দলের হাল ধরা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার জন্যে চ্যালেঞ্জ ছিলো। কিন্তু তিনিই যে বঙ্গবন্ধু কন্যা। তিনিই বাংলাদেশের যোগ্য উত্তরসূরি। শত প্রতিকূলতাও অবিচল ছিলেন শেখ হাসিনা। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ মনে করেন, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্যে নিঃসন্দেহে একটি আলোকিত অধ্যায়। তার আগমনে ও সংগ্রামে পঁচাত্তরের ঘাতক ও তাদের দোসরদের পতন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং তাদের মধ্যে প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শেষ হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে দেশে কাক্ষ্খিত উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এটি একটি মাইলফলক। সুগম হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং গণতন্ত্র বিকাশে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার অবদান অপরিসীম। তার দূরদৃষ্টি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। সত্যিই তাই, শেখ হাসিনা এদেশে ফিরে না এলে বাংলাদেশ সত্যিই পথ হারাতো। এদেশের মানুষের বহুল কাক্ষ্খিত সোনার বাংলার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেতো।

বঙ্গবন্ধুর মতোই তার কন্যা ক্ষুধা, দারিদ্র, সন্ত্রাস, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদকমুক্ত একটি সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিসহ নানা দিকে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের গুণে বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হয়েছেন। বর্তমান বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি অন্যতম। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি অর্ধশতের বেশি পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। আজকে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তাকে জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমরা তার সুখীজীবন ও দীর্ঘায়ূ কামনা করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম ও জননেত্রী আপনি এগিয়ে যান, আপনিই পারবেন এ দেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র, সন্ত্রাস, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গীবাদ ও মাদকমুক্ত একটি সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গড়তে। আপনার সাথে মহান আল্লাহ্ ও এদেশের আপামর জনগণ আছেন।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান : সদস্য, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন : 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়