• ঢাকা শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম স্বাধীনতা পদকের ইতিকথা

ইয়াছিন রানা সোহেল
|  ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ২২:২৭
স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন শহীদ এম আবদুল আলী। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ইতিহাস চাপা পড়েছিল দীর্ঘ ৪৪ বছর।

দেশের এক-দশমাংশ অবিভক্ত পার্বত্য জেলা রাঙামাটির এসডিও (Sub-Divisional Officer) তথা মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ১৯৭০ সালের ২০ নভেম্বর যোগদান করেছিলেন এম আবদুল আলী। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর মুক্তিকামী বাঙালিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

পুলিশ সুপার বজলুর রহমানকে সঙ্গে এম আবদুল আলী দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তাদেরকে জেলা সদরের পুলিশ লাইন ও স্টেশন ক্লাবে ছাত্র, যুবক ও আপামর জনসাধারণকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

২৫ মার্চের পর জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ আবদুস সামাদ এবং পুলিশ সুপার বজলুর রহমানসহ প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিরাপদ আশ্রয়ে সীমান্তের ওপারে চলে যান। কিন্তু দেশের মাটি ছেড়ে যাননি এম আবদুল আলী।

১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তায় রাঙামাটি দখলে নেয় হানাদার বাহিনী। এই কথা জানতেন না এম আবদুল আলী। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্পিডবোটে ১৬ এপ্রিল ডিসি বাংলো ঘাটে আসেন তিনি। স্পিডবোটে আসায় বড় সরকারি কর্মকর্তা ভেবে আবদুল আলীকে গ্রেপ্তার করে কমান্ডারের কাছে নিয়ে যায় তারা।

এসময় এম আবদুল আলীর সঙ্গে তাঁর বড় ছেলে ইউসুফ হারুনও ধরা পড়েন। তাদের প্রতি অসহনীয় নির্যাতন দেখে ইউসুফকে পালাতে সাহায্য করেন এই পাকিস্তানি সৈন্য। তবে ১২ দিনের নির্মম নির্যাতন সহ্য করার পর মুক্তি মেলে আবদুল আলীর। ২৭ এপ্রিল ক্ষত-বিক্ষত আবদুল আলীর নিথর দেহটি কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দি করে ফেলে দেয়া হয় কাপ্তাই হ্রদের পানিতে।

এম আবদুল আলী রাঙামাটিতে এসডিও হিসেবে যোগদানের পর শহরের ‘কায়েদে আজম মেমোরিয়াল একাডেমি’ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পড়ে তাঁর কাঁধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই স্কুলের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সবার সম্মতিতে স্কুল পরিচালনা কমিটির সকলে যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী এম আবদুল আলীর নামে নামকরণের প্রস্তাব করেন। ফলে স্কুলটির নাম ‘কায়েদে আজম মেমোরিয়াল একাডেমি’ পরিবর্তন করে ‘শহীদ আবদুল আলী একাডেমি’ নামকরণ করা হয়।

এছাড়া শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামের পাশে আইয়ুব খানের আমলে বসানো একটি ফলক উপড়ে ফেলে স্থানটি শহীদ এম আবদুল আলী বেদী করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী এই বীর সৈনিকের বীরত্বগাঁথা কিংবা যুদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে ছিল না কোনো কাগুজে ডকুমেন্ট। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে তাঁর একটি আঁকা ছবি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও জানতো না যে কে এই শহীদ আবদুল আলী। এমনকি কোনো সংবাদকর্মীও খোঁজেনি এই বীরের ইতিহাস। এই বীর সন্তানকে নিয়ে কারো কাছে তেমন কোনো তথ্যই ছিল না। এই শহীদ পরিবারের সঙ্গে রাঙামাটির কারো যোগাযোগ ছিল না। পালন করা হতো না তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীও। এমনকি জাতীয় দিবসগুলোতেও তাঁর বেদীতে শ্রদ্ধা জানানো হতো না।

অবশেষে ২০০৫ সাল থেকে খুঁজতে থাকি শহীদ এম আবদুল আলীর ইতিহাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। শহরের প্রবীণ অনেক ব্যক্তির কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি বারবার। এখানে-সেখানে তাঁর ইতিহাস ও পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে থাকি।

২০১২ সালের গ্রীষ্মের এক দুপুরে রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের পাশে চায়ের দোকানে বসে আছি। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জানতে চাইলেন- শহীদ এম আবদুল আলীর নামে করা শহীদ বেদীটি কোথায় বলতে পারেন। কথা শুনেই দাঁড়িয়ে গেলাম। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী। একশো গজ দূরে অবস্থিত বেদীতে নিয়ে গেলাম তাঁদের।

ওই ব্যক্তি ছিলেন শহীদ এম আবদুল আলীর ভাগ্নিজামাই। তাঁদের মাধ্যমে খুঁজে পেলাম শহীদ এম আবদুল আলীর সন্তানদের। এরপর যোগাযোগ শুরু করলাম। সংগ্রহ করতে লাগলাম স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এই বীরসেনার তথ্যচিত্র।

অবশেষে ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকাশ করি তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় বীর শহীদ এম আবদুল আলী’ বইটি। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর সর্বত্রই এই বীর শহিদের বীরত্বগাঁথা আলোচিত হতে থাকে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিনের চেষ্টায় বিষয়টি নজরে আসে সরকারের। ফলে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য ও অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শহীদ এম আবদুল আলীকে ২০১৬ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ শহীদ এম আবদুল আলীর কনিষ্ঠ কন্যা নাজমা আকতার পুরস্কার গ্রহণ করেন। আর এটিই তিন পার্বত্য জেলার প্রথম স্বাধীনতা পদক।

কে/এপি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়