দর্শকসারি থেকে

‘শিকারে’র বুকে কাঁপন সত্যিই ধরে গেছে!

প্রকাশ | ২৮ আগস্ট ২০১৭, ১৮:৪৮ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০১৭, ২০:১৯

জাফর উল্লাহ সোহেল

‘শেষ বিকেলের ঝলক’-ঢাকা টেস্টের প্রথমদিন শেষে একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের স্ট্যাটাস ছিল এমন। ৩ শব্দের স্ট্যাটাস হাওলাত নিয়ে এ লেখা শুরুর কারণ হলো-এরকম একটা অনুভূতি কাজ করছিল আমার মধ্যেও। হয়তো আপনাদের অনেকের মধ্যেও এমন অনুভূতি কাজ করে থাকবে। রোববার বিকেলে শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটসম্যানদের যেভাবে মুরগি নাচন নাচালো মেহেদি হাসান মিরাজ আর সাকিব আল হাসান; তাতে এটিকে অপূর্ব এক ‘ঝলক’ই বলা যায় বৈকি।

প্রথম দিন যদি ‘ঝলক’ দেখিয়ে শেষ করেছে বলা হয়, তবে দ্বিতীয় দিন শেষে কী উপমা পেতে পারে টিম টাইগার্স? আমার কাছে সেটাও একটা ঝলকই বটে। কারণ, যে উইকেটে দিনের শেষ সেশন মানেই সীমাহীন আতংকের নাম সেখানে মাত্র ১ উইকেটের বিনিময়ে দিনটা শেষ করাও একটা বিশেষ কিছু। গতকালই যেখানে শেষ সেশনে ৯ নয়টি উইকেটের পতন ঘটেছে। এছাড়া প্রথম ইনিংসের চিন্তা করলে, বাংলাদেশের জন্য এটা বেশ উন্নতিই ধরে নিতে হবে। মাত্র ১০ রানেই ৩ ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফিরেছিল প্রথম ইনিংসে। অতীতে বরং দ্বিতীয় ইনিংসেই বিপর্যয়টা বেশি চোখ রাঙাতো টাইগারদের। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এটাও আরেকটা পরিবর্তন বলতে পারেন।   

নজর কাড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে আরো অনেক জায়গায়। একটি বলা যায়, পরিকল্পনা মতো পারফরম করা। এ সিরিজ শুরুর অন্তত মাসখানেক আগে থেকে যেসব আলোচনা শুরু হয়েছে তার একটি ছিল স্পিন বিষে অজিদের নীল করা। সে পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত কক্ষপথেই আছে। দিকভ্রষ্ট হয়নি। আর এ পরিকল্পনার শেষ গন্তব্য যে আরেকটা ‘বাংলাওয়াশ’ সেদিকেও ঠিকঠাক এগিয়ে যাচ্ছে মুশফিক বাহিনী বলেই মনে হচ্ছে। একের পর এক পরিকল্পনা কাজে লেগে যাওয়ার সুখে আজ রাতের নিদ্রাটা ভালোই হবে সাকিব-মিরাজদের। বিপরীতে ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার কথা অতিথিদের!

অবশ্য ইদানিং বঙ্গদেশে যারাই অতিথি হয়ে এসেছেন, বাঙালিরা তাদের কাউকেই ঠিকঠাক ঘুমাতে দেয়নি। সবশেষ টেস্টে ক্রিকেটের কুলীন দল ইংল্যান্ডও নিয়ে গেছে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এমন আতিথ্য। উপরি হিসেবে ইংরেজ অলরাউন্ডার বেন স্টোকস নিয়ে গেছেন সাকিবের ঐতিহাসিক ‘স্যালুট’ও। সে যাক, বাঘের ডেরায় এখন যেই পা দেবে তাকেই সম্ভাব্য শিকারে পরিণত করার শক্তি ও সামর্থ্য যে বাংলাদেশ অর্জন করে ফেলেছে তার প্রমাণ হাতেনাতে পেতে শুরু করেছে ভয়ে ভয়ে নানা অজুহাতে ২ বছর পরে আসা ‘টিম অস্ট্রেলিয়া’। এক অর্থে কি ভালোই হলো-অস্ট্রেলিয়ার এ দেরিতে বাঙাল মুলুকে পা রাখা? ২ বছর আগের বাংলাদেশ কি এমন চোখ রাঙাতে পারতো পেশাদার টেস্ট খেলুড়ে দলটিকে? এমন ঔদ্ধত্যের সুরে হাথুরুসিংহে কিংবা সাকিব-তামিমরাও কি তুলে দিতে পারতেন ‘২-০ রব’? আমার মনে হয়, না।

তবে যে ‘রব’ এখন উঠেছে শিকারি বাঘের মুখে তা এতোদিন না হলেও ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনের শেষ বিকেলের পর থেকে ‘শিকারে’র বুকে যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় দিন শেষে সেই কম্পন অজিদের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে দিতেও শুরু করেছে বলা যায়। বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকেরা এরই মধ্যে ঘাঁটতে শুরু করেছিলেন  পরিসংখ্যান; উদ্দেশ্য অজিদের সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ডটা খুঁজে বের করা! রেকর্ড ঘেঁটে পাওয়া গেলো, সেটা হলো ৩৬! তা অবশ্য ১ শতাব্দী আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। কাছাকাছি সময়ে এবং উপমহাদেশে তাদের সর্বনিম্ন স্কোর ছিল ৮০, পাকিস্তানের বিপক্ষে। মিরপুরের উইকেটে মেরুণ রঙের বল যেভাবে ‘আপ অ্যান্ড ডাউন’ খেলা শুরু করেছে, তাতে দ্বিতীয় স্কোরটাকে নাগালের মধ্যেই ভাবা শুরু করেছিলেন অনেকে! যদিও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে যা হয়েছে তাও কম নয়। ২১৭ রানে অলআউট করে অস্ট্রেলিয়ানদের খাদের কিনারেই ঠেলে দিয়েছেন সাকিব-মিরাজরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে এটিই অজিদের সর্বনিম্ন স্কোর। 

দিন শেষে তামিম আর সৌম্য যেভাবে খেলছিলেন তাতে মনেই হয়নি আজ উইকেটের পতন হতে পারে। দারুণ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল দু’জনকেই। কিন্তু হাথুরুর আদরের সোনামানিক ‘সৌম্য’ যেভাবে আউট হলেন তাতে ফের তার গুরুর ভরসাটাই ব্যাঘাত পেলো। আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হলো দল নির্বাচন। তামিমের পার্টনার ইমরুলকে করে মুমিনুলকে তো অনায়াসেই দলে রাখা যেতো- এ ধরনের আলাপ আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তবু সৌম্যের প্রতি আমদের এ কৃতজ্ঞতা যে, নেমেইে ড্রেসিংরুমে হাঁটা ধরেননি তিনি; কিছুক্ষণ ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে!

এবার আসুন ‘শিকার’ আর ‘শিকারি’র ব্যবচ্ছেদ করি। ২০১৫ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পরে যতো দল বাংলাদেশে এসেছে সবাইকেই কোনো না কোনো ফরমেটে ‘শিকার’ বানিয়েছে দিনে দিনে সত্যিকারের বাঘে পরিণত হওয়া ‘টিম টাইগারস’। দেশের মাটিতে যেই সামনে আসুক তাকে ‘শিকার’ বানাতেই হবে, তা যেকোনোভাবেই; এমন একটা পণ যেনো নিজেদের অজান্তেই করে ফেলেছে টাইগাররা। যদিও বেশিরভাগ সাফল্য ধরা দিয়েছে ওয়ানডে ক্রিকেটে, তবু টেস্টেও যে সমান ক্ষুধা নিয়ে বসে আছে মুশিফিক বাহিনী তা আধেক প্রমাণিত হয়েছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বাকি আধেক প্রমাণের পালা এ সিরিজে।

এখানে যদি পরিকল্পনা মতো খেলা যায়, তবে টেস্ট ক্রিকেটেও বৃত্ত পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হবে। এর আগে আইসিসির সব পূর্ণ সদস্যকে হারিয়ে ওয়ানডেতে বৃত্তপূরণের কাজ সফলভাবে শেষ করেছে বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের ইতিহাসের সেরা ‘শিকার’ বানিয়ে টেস্ট ক্রিকেটেও বৃত্তপূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। ৫ দিনের লড়াইয়ের ২ দিন শেষে সেই সুযোগ লুফে নেয়ার ইঙ্গিতও মিলছে বেশ। অন্তত এটুকু বলা যায়- নতুন এবং ‘দামি শিকারে’র বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছেন সাকিব-মিরাজ। বাকিরাও সামর্থ্যের পুরোটা দিতে পারলে পালানোর আসলে পথ নেই স্মিথ-ওয়ার্নারদের!

শেষটা সাকিবেই করি। বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা নানা কারণে বিভিন্ন সময় তাকে বেশ খ্যাপান। খ্যাপাটে সকিব কখনো মাঠে আর কখনো মাঠের বাইরে মেজাজি জবাবও দেন। তবে ইদানিংকালে তিনি যেনো মাঠেই বেশি জবাব দেয়ার পণ করেছেন; বাইরে কথা বলছেন খুব কম। যদিও শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করে দলকে জেতানোর পর তার হয়ে মাঠের বাইরের জবাবটা দিয়েছিলেন স্ত্রী শিশির।

ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন- “সাকিব, তুমি তো দেশের জন্য খেলো না, এক কাজ করো, সেঞ্চুরিটা বাসায় নিয়ে এসো, আমরা তরকারি রান্না করে খাব!” তো সেই সাকিব অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দেখাতেই ব্যাটে-বলে যেভাবে খেলছেন তাতে আমরা ভক্তরা আশার পালে একটু বাড়তি হাওয়া পেতেই পারি। একে তো এটি তার এবং তামিমের ৫০তম টেস্ট, এর ওপর সব ফরমেট মিলিয়ে বাংলাদেশের ৫০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সামনে আবার ঈদও আছে। উপলক্ষের অভাব নেই। ব্যাট হাতে ফিফটি আর বল হাতে ৫টি শিকার বগলদাবা করা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার যে উপলক্ষ এলে বেশি করে জ্বলে ওঠেন - তা বোধ হয় আর মুখে বলে দিতে হবে না। সাকিবে অনুরক্তরা তা এমনিতেই বুঝে নেবেন। আর বিরক্তরা? দয়া করে আপনারাও বুঝুন আর প্রার্থনা করুন সিরিজজুড়েই যেনো এমন তাকেই পায় টিম বাংলাদেশ। তাহলে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ‘২-০’ বা ‘বাংলা ওয়াশে’র গুঞ্জন আর গুঞ্জন থাকবে না।

লেখক- সাংবাদকর্মী