• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

একদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখি

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল
|  ১১ আগস্ট ২০১৭, ১৯:০৮ | আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৭, ১৯:৩৬
সকালবেলায় একটা দিবা স্বপ্নের মত ব্যাপার ঘটে গেল। ঘুম ভাঙার পর মনে হলো আসলে ঘুম ভাঙেনি। মনে হলো কোনো এক সুন্দর স্বপ্নের মধ্যে আছি। বারান্দায় একটা দোয়েল এসে এক মনে ডেকেই চলেছে। মনে হলো আমার উত্তরমুখো ঘরটিতে হুহু করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, যদিও কয়েকবছর ধরে খুব গরমে কাহিল। বাতাস নেই, আলো এসে ঢুকেনা সেখানে। মনে হলো, রাস্তাগুলো সব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দেশে আর কোনো সন্ত্রাস হানাহানির খবর নেই, প্রধানমন্ত্রী পায়ে হেঁটে ঢাকার ফুটপাতে ঘুরছেন। আর বিরোধী দলগুলো আয়োজন করেছে 'মুক্তির গান' কনসার্টের। 

দেখলাম পুলিশ, র‌্যাব আর সেনাবাহিনী নিরলস পরিশ্রম করছে একটি প্রাকৃতিক জলাধারকে রক্ষা আর সুন্দর করার কাজে। দেখছি একটি গাছের ছায়ায় প্রবীণ দম্পতি কিশোর-কিশোরীদের শুনাচ্ছেন তাদের অতীত দিনের স্বপ্নকথা। যুবক যুবতীরা সাইকেল আর বাইক চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছেন গান গাইতে গাইতে। দেখলাম এক রিকশাচালক সচিবালয়ে বসে কথা বলছেন তার আগামী বছরের পরিকল্পনা নিয়ে। একজন কৃষক প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানাচ্ছেন তার লোকায়ত গবেষণার কথা। আরো কত কিছু! 

ভাবছেন লোকটা পাগল! আর পাগল না হলেও তার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। হ্যাঁ, আমার ইদানীং খুব সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে আমি সকালে টেলিভিশন খুলিনা। কারণ তাতে সকাল বেলায় ঘোষণা আসে ২২ মাসের শিশু ধর্ষিত। পত্রিকায় ছবি ভেসে ওঠে বিভৎস লাশের। দাবি আদায় করতে গিয়ে টিয়ারশেলে চোখ হারানো সিদ্দিকুর আমাকে গালি দেয় সুন্দর সকালটা সে দেখবে না বলে। আমি রাস্তায় হাটতে পারিনা- ময়লা, দুর্গন্ধ, বিকট শব্দ, ভিআইপিদের দৌরাত্বে, যানজটসহ হাজারো সমস্যায়। 

আমি আমার নিজের কথাগুলো বলতে পারিনা। কারণ, আমার মুখ রূদ্ধ করে রাখা হয়। আমার বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সকল সেবা পেতে দিতে হচ্ছে বহুগুণ অর্থ, নেই নিরাপত্তা। এরকম হাজারো দৃশ্যকল্প প্রতিদিন খুব সকাল থেকেই আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। আম জনতা তা দেখে, হা হুতাশ করে। এমন পরিস্থিতি থেকে মানুষ বের হতে চায় কিন্তু পারে না। তাদের বিদ্রোহী মন ডুকরে ডুকরে কাঁদে। 
 
বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের কথাই বলি। কয়েকদিন আগেই এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড'র রায় হয়ে গেল। শুধু বিশ্বজিৎ এর পরিবার নয়, সারা দেশের অধিকাংশ মানুষ এ রায়ে ভয়াবহ রকম ব্যথিত-হতাশ। তারা আরো কঠোর বিচার প্রত্যাশা করেছিলেন। একটি নিরাপরাধ ছেলেকে যেভাবে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল তা জাতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে। এর আগেও আমরা দেখেছি এমন ভয়াবহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ড। কিন্তু আমরা কি দেখতে পেলাম পোস্টমর্টেম আর চার্জশিটে গড়মিল, যেটি মহামান্য কোর্ট উল্লেখ করেছেন। একটি স্বাধীন দেশে এ ধরনের হীন কাজের জন্য আমরা প্রতিমূহুর্তেই লজ্জিত বোধ করি। বিশ্বজিৎ এর বাবা মা’র আকুতিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। আমরা এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শাস্তি দেখতে চাই।

প্রতিদিন নারী-নিপীড়ন, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শিশু ধর্ষণ একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। গুলশান থেকে শুরু করে গাইবান্ধা বা পিরোজপুর থেকে চট্টগ্রাম সর্বত্র এই ঘটনা ঘটেই চলছে। এতো এতো বিকৃত যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে যেনো দেশটা সেই মধ্যযুগে চলে গেছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদক আর ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক প্রভাবই এর প্রধান কারণ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। এছাড়া বিচারহীনতার স্ংস্কৃতিই মূলত অপরাধীদের আরো উৎসাহিত করছে পুনরায় অপরাধ সংগঠিত করতে। কিন্তু আমরা প্রতিমূহূর্ত সরকারের বিভিন্ন মহলে শুনতে পাই দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। কিন্তু এই সকল প্রক্রিয়াগুলো সাধারণের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

প্রতিদিনের বাজার-এখন হয়ে গেছে সাক্ষাৎ যমদূতের জায়গা। বেগুনের দাম ৮০ টাকা কেজি, পটলের দামও ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ টাকা কেজি, পেয়াজ ৬৫ টাকা আর মাছ -মাংসের কথা বাদই দিলাম। মধ্যবিত্ত আর নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি দেখে। একজন সাধারণ বস্তিবাসীর জীবন আরো করুণ। একই অবস্থা বিরাজমান সমাজের সর্বস্তরে। কিন্তু আমরা জানি কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেনা। একটি মধ্যসত্ত্বভোগী শ্রেণি পুরো বাজার ব্যবস্থাকে কব্জায় নিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আমাদের অর্থমন্ত্রী একের পর এক কর আরোপ করেই চলেছেন সাধারণ জনগণের ওপর। এই হলো আমাদের দেশের সার্বিক বাজার আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

প্রতিদিনই মানুষ শিকার হচ্ছেন নানা রকম অত্যাচার-নির্যাতনের। থানা পুলিশ, মাস্তান, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, দলীয় ক্যাডারের হাতে জিম্মি পুরো সমাজ। সমাজের চিরাচরিত যে স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ তা প্রায় বন্ধ। আমরা এখন একজন আরেকজনের সুখে কিংবা দু:খে এগিয়ে যাইনা। বর্তমান প্রজন্মে পুরোপুরি ডুবে আছে মাদক আর ভোগবাদে। যে সমাজ ও দেশের তরুণ সমাজে সৃষ্টি হয়েছিল কালজয়ী সব আন্দোলন সংগ্রাম। সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে তরুণ সমাজে ডুবে গেছে প্রায় অন্ধকারে। যে তারুণ্য স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জ করে মসনদ থেকে নামিয়েছিল- সেই আজ ছুটছে ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ভোগ বিলাসের দিকে। 

আমাদের চিরাচরিত একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। কর্পোরেট পুঁজির প্রভাবে আমরা হয়ে গেছি একক পরিবারের সদস্য। যে কারণে পারিবারিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভয়াবহ অভাব আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। সমাজের সর্বস্তরে আজ অবিচার আর ক্ষমতার প্রভাব। টাকা আছে যার সমাজে সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তাই সমাজের ন্যায়চর্চার জায়গা আজ ভূলুন্ঠিত।

এইরকম হাজারো ইস্যু আমাদের সামনে প্রতিদিন দু:স্বপ্নের মতো হানা দেয়। আমরা সাধারণ জনগণ না পাই এই সব সমস্যার কোনো সমাধান, না কোনো কূল কিনারা। যে কারণে সিদ্দিকুরের মা-বাবা আফসোস করেন বিচারের দাবিতে। গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তির পরিবার রাতের পর রাত জেগে থাকে তার সন্তান কবে বাড়ী ফিরবে। একজন স্বপ্নবান মানুষ প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে এই দেশটা কবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক একটি রূপ নিয়ে এগিয়ে যাবে সেই আশায়। 

তবুও স্বপ্নগুলো আমার দিবাস্বপ্নের মতই প্রতিদিন এদেশের কোটি মানুষের জীবনকে কোনো পরিবর্তন দিতে পারে না। আমরা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করি এ দেশটি সত্যিই একদিন আমাদের স্বপ্নের মতনই হবে। হবে সকল মানুষের প্রত্যাশার এক নতুন দেশ।

*ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন; পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী। 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়