• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

বাংলা চলচ্চিত্র এবং আমাদের ঐতিহ্য

সৈয়দ অহিদুজ্জমান ডায়মন্ড
|  ১২ জুলাই ২০১৭, ১৮:৩৫ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৭, ১৩:০৯
যৌথ প্রযোজনার আড়ালে যৌথ প্রতারণা। অতঃপর চলচ্চিত্র পরিবারের প্রতিরোধ আন্দোলন। তারপর আপাতত স্হগিত যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গ।

আমাদের এই সোনার বাংলায় দৃশ্যত সোনার খনি আমরা দেখিনা সত্য। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা আছে! যার কারণে অতি প্রাচীন কাল থেকেই এদেশটাকে লুটেপুটে খাবার জন্য বারবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে বর্গী আগমণ ঘটেছে। তবে আশার কথা, কোনো কালেই কোনো বর্গীগোষ্ঠী এখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি, কারণ নিজের অগোচরে আমাদের চেতনা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে বলেই, এদেশের জনগণ মুহূর্তের মধ্যে লড়াকু সৈনিকে রূপান্তরিত হয়ে বারুদের স্ফুলিঙ্গের মত বিস্ফোরিত হয়।

আমাদের পূর্বসুরী থেকে আমরা, ধারাবাহিক জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় থেকেছি অটল। পাল সেন মোগল পাঠান ইংরেজদের মত মহাশক্তির সঙ্গে কখনো ইচ্ছায় কখনো অনিচ্ছায় আমাদেরকে সাপলুডু খেলতে হয়েছে। জীবনবাজি রেখে খেলেছেন, নবাব সিরাজ, তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ, খেলছেন ক্ষুদিরাম, মাষ্টার দ্য সূর্য্যসেন। সবশেষ পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

কালু গাজী চম্পাবতী অথবা নিশ্ছিদ্র লোহার বাসরে সাপে কাটা স্বামী লক্ষ্মীন্দরের লাশ নিয়ে ভেলায় চেপে বেহুলার স্বর্গ যাত্রা। আধুনিক বিশ্বে, বাংলার এসব উপাখ্যানের কোনো মূল্য না থাকলেও, এগুলো আমাদের অমূল্য সম্পদ। টারজানের এ্যাডভেঞ্চার আমাদেরকে যতটা না পুলকিত করে তার থেকে অনেক বেশি কাঁদায় বারো দিনের রহিম বাদশাহকে কোলে নিয়ে রূপবানের বনবাস।

জারি সারি মুর্শিদী মহুয়া পল্লীগীতি আলকাপ গম্ভীরা ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালি কীর্তন আর জ্যোৎস্না রাতে গৃহস্থের নিকানো উঠানে পুঁথি পাঠের আসর পৃথিবীর বুকে আমাদের সংস্কৃতিকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। মাছ ভাত লাল শাক মুসুরের ডাল কিংবা কৃষকের নুন ছিটানো ভোরের পান্তার সঙ্গে পেঁয়াজ কামড়, এত কেবলই বাংলার, বাঙালি সংস্কৃতি। ঘামে ভেজা প্রচণ্ড গরমে বৈশাখের ঢাক। ঝিরঝির বৃষ্টি ভেজা রথযাত্রার মেলা। এ সবই তো আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য।

এখানে মাথার চুল ঝাঁকিয়ে দুই পায়ের মাঝে বালিশ নিয়ে কুদ্দুস বয়াতির 'আমার পাগলা ঘোড়া', সুরের কাছে পরাজিত মাইকেল জ্যাকসনের 'থ্রিলার'। আবার সাকিরার বিশ্ব মাতানো 'ওয়াকা ওয়াকা', কি পেরেছে মমতাজের 'পোলাত নয় যেন আগুনের গোলা' অথবা ফরিদা পারভিনের কন্ঠে লালনের 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি', হৃদয় ছোঁয়া সুরকে পরাভূত করতে? আব্বাসউদ্দীনের 'ওকি গাড়িয়াল ভাই কত রইব পন্থের পানে চাহিয়া', বাঙালির এ আবেগ জড়ানো সুরকে পরাজিত করে গোলাম আলীর 'চুপকে চুপকে রাতদিন আঁশু বাহানা ইয়াদ হ্যায়', কতনা উঁচু মাপের সঙ্গীত, তবুও কি পেরেছে বাঙালি মনে আসন করে নিতে? পারেনি। কারণ আবহমান বাংলার নিজস্ব চেতনায় বাঙালি জাতি বড়ই আত্মকেন্দ্রিক, অদ্বিতীয়ও বটে। বাঙালি মনে ভিনদেশী সংস্কৃতির কোনো ঠাঁই নাই বললেই চলে। এর অনেক বড় প্রমাণ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন।

অতএব আজ যদি কেউ শহীদ নূর হোসেনদের কথা ভুলে অতি মুনাফা অর্জনের আশায় যৌথ প্রতারণার নেশায় বিভোর হয়ে এ জাতিকে শুনায়, 'বেটা শো'যা, শো'যা বেটা, নাহিতো গাব্বার সিং আয্যায়েগা'। তাহলে তাদের ভাষায় বলতে হয়, পাঁচাশ পাঁচাশ কোড়স দূর গাঁওকা, গাব্বার সিংয়ের খবর তোমরা রাখ, কিন্তু ঘরের পাশে ডাকাত সর্দার কালীকিংকর স্যানালের উপাখ্যান তোমরা জান না। জানবে কেনো? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো এদেশে এসেছিল ব্যবসা করার জন্য, দেশত্ববোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে না। অতএব ক্লাইভের দোসর মীর জাফরের কাছে দেশপ্রেম আশা করাও তো ছিল নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌলার রাজনৈতিক ব্যর্থতা।

তাই বলছি, নীতিমালা ঠিক রেখে যৌথ প্রযোজনা অতীতে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। এ নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু অতীত ইতিহাস বলে যৌথ প্রতারণার যাঁতাকলে বাংলার ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হতে দেখলে এজাতি বসে থাকবে না। বুকের রক্ত দিয়ে হলেও তা রুখে দিবে। নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষায় বাংলার মানুষ যখন রাজপথে, বাংলা চলচ্চিত্রের জয় তখন অনিবার্য।

দেরিতে হলেও যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ স্হগিত করে পুনরায় নীতিমালা গঠনের উদ্যোগ নেয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

এইচএম

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়