close
ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ০৬ কার্তিক ১৪২৪

কার চলচ্চিত্র কে রক্ষা করবে?

সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড, চলচ্চিত্র নির্মাতা
|  ১৪ জুন ২০১৭, ১৩:৫৩ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৭, ১৪:২৮
সত্তর, আশি বা নব্বই দশকে অথবা তার আগের চলচ্চিত্র সংশিষ্ট ব্যক্তিরা কোনোদিন ভাবেননি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এমন একটা সময় আসবে যখন নিজ দেশের চলচ্চিত্র কিছু স্বদেশী অর্থলোভি মানুষের কারণে ভারতের চলচ্চিত্রের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। আজকে আমাদের প্রায় সাড়ে ৩শ' পরিচালক, ডজন ডজন প্রযোজক, শত শত অভিনেতা-অভিনেত্রী, হাজারও কলাকুশলী এবং কোটি কোটি দেশপ্রেমিক দর্শক যারা সিনেমায় নিজ দেশের গল্প দেখে অভ্যস্ত তারাও কখনো ভাবেননি এমন প্রতিকুল স্রোতের বিপরীতে আমাদেরকে সাঁতার কাটতে হবে। 

কি আশ্চর্য, যখনই আমাদের কোনো ছবি মুক্তির জন্য একটি সপ্তাহকে বেছে নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করি, ঠিক তখনই ওই সপ্তাহেই কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ি বসে ভারতীয় তথা কলকাতার বাংলা ছবি। তারপর, নিজ দেশের ছবি পায় দশ থেকে বারোটা হল আর কলকাতার ছবি পায় একশ'রও অধিক হল। অথচ তারা নিজেদের দেশে এত হল পায় কি না সন্দেহ। এই পরিস্হিতিতে বাংলাদেশে কোনো পরিচালক প্রযোজক আছেন যিনি সাহস করে তার ছবি মুক্তি দেবেন? নিকট অতীতে এর যথেষ্ট উদাহরণ আমাদের রয়েছে। 

দেশীয় ছবি মুক্তির সঙ্গে কলকাতার ছবি রিলিজ করে কিভাবে নিজ দেশের সিনেমাকে দাবিয়ে দেয়া হচ্ছে। একটি মহলের এ যেন নিজের দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা! এটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা কে জানে। আমার দেশের সমাজ ব্যবস্হা আমার ইতিহাস ঐতিহ্য আর ভারতের কালচার তো এক নয়। আমার গল্পে, ইতিহাসে, কাঙ্গাল হরিনাথ আছেন, লালন আছেন, আছেন পাগলা কানাই। আমাদের আছে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস, আছে বীরাঙ্গনার গৌরবময় আত্মকাহিনি, আছে পারিবারিক অটুট বন্ধনের গল্প, আরো কত কি। 

আমাদের ছবি দেখে আমরা নায়কের প্রশংসা করবো না হয় বকা দিবো, নায়িকার দুর্বল অভিনয়ের জন্য সমালোচনা করবো অথবা ভালো অভিনয়ের জন্য সুনাম করবো। গালি দিয়ে পরিচালকে তুলা ধুনা করবো তারপরেও দেশের কাহিনি দেশের ছবি, মানে আমার ছবি। যারা কলকাতার বাংলা ছবি আমদানি করে দেশের বাংলা ছবির বারোটা বাজাচ্ছেন তাঁরাই আবার গলা উঁচু করে বলেন কলকাতা থেকে ছবি না আসতে দিলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। এ তো পাগলের প্রলাপ। 

এখন তো কলকাতার পরিচালকরা নিজেরাই তাদের বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি নিয়ে চোখে সরিষার ফুল দেখছেন। এইতো সেদিন সাউথ ইন্ডিয়া থেকে বাহুবলি টু এসে কলকাতার যে ক'টা হলে বাংলা ছবি ছিলো সব উল্টে দিলো! কই গেলো বাহুবলি টু এর কাছে কলকাতার বাংলা সিনেমা? ১৩ জুন ২০১৭ কলকাতার শক্তিধর অভিনেতা চিরঞ্জিৎ আনন্দবাজার পত্রিকার কাছে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, 'ছবি ফ্লপের ধাক্কা থেকে ইন্ডাস্ট্রিটা বাঁচান। ইন্ডাস্ট্রি মরে যাচ্ছে, তাই বাঁচানোর জন্য বস টু, চ্যাম্প হিট হওয়া ভীষণ প্রয়োজন।' এবার বুঝুন কোন ইন্ডাস্ট্রি জন্য এখানকার মায়া কান্না। কাকে বাঁচাতে কার দৌড় ঝাঁপ! 

ক্ষমতা এবং সদিচ্ছা থাকলে আনেন বাহুবালি টু, আনবেন না, কারণ ওটা আনতে একদিকে পয়সা বেশি লাভ কম, অন্যদিকে উপকার কলকাতার না সাউথের। ভূতের মুখে রাম নাম! একদিকে কম পয়সায় বেশি লাভের আশায় কলকাতা থেকে ছবি এনে নিজ দেশের ছবি মুক্তির পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে, আরেকদিকে বলা হচ্ছে কলকাতার ছবি না আসতে দিলে আমাদের চলচ্চিত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। কি হাস্যকর কথা। বলুন আমাদের কাঁধে চড়ে এদেশে ছবি মুক্তি না দিতে পারলে হয়তো কলকাতার ছবিই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সুযোগ পেলে এদেশের মানুষকে কতভাবেই না বোকা বানানো যায়। 

কলকাতার চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তাদের বাজার একদিন সাউথ ইন্ডিয়ার হাতে চলে যাবে। কি দূরদর্শিতা, লু হাওয়ার ঝালাস বুঝতে পেরে নতুন বাজার সৃস্টির শপথ নিয়ে প্রসেনজিৎ বাবু দলবলসহ ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে এসে হাজির হলেন, অথবা প্রসেনজিৎদের সঙ্গে নিয়ে মমতা রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় উপস্থিত হলেন। উদ্দেশ্য পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি সাধন। 

টিভি দেখে মনে হয়েছে মমতার এই সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় বেশি ছিলেন অভিনয় শিল্পী, যার অধিকাংশই ছিলেন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। নিশ্চয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিস্তার পানি বাংলাদেশকে দেয়ার জন্য শিল্পী বহর নিয়ে ঢাকায় আসেননি? বরং তিনি খুব ভালো করেই জানতেন বাংলাদেশে গেলে, বাংলার মানুষ তাঁকে পানি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করবে। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তাঁর মনোভাব জানতে চাইবে। 

উত্তরটা যদিও সেদিন তিনি সঙ্গে করে নিয়েই এসেছিলেন, 'আমার ওপর ভরসা রাখুন।' ভরসা রেখে আজও বাংলার মানুষ তিস্তার পানির জন্য পরম মমতায়, মমতার ঝোলানো মুলার দিকে চেয়ে আছে। মমতা যখন ঢাকা সফরে এসে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে ব্যস্ত তখন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বসে প্রসেনজিৎ আর দেব বাবুরা আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ছবি আদান প্রদানের নামে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজার দখল আর হল দখলের লক্ষ্যে। সেদিন কেনো আমাদের ওই প্রতিনিধি দল বুঝতে পারেননি কি হতে যাচ্ছে? 

ভারতের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত যা হয়েছে তা শুধু প্রদানই হয়েছে, আদান হয়েছে কয়টি? হয়ে থাকলে তার ফলাফল কি? ক'দিন আগে আমাদের এক অভিনেত্রী অভিযোগের সুরে বললেন কলকাতায় আমাদের যে ছবি দেখানো হয় তাতে ওখানকার দর্শক দেখেনা। প্রশ্ন ওঠে, কার ছবি? কোন ছবি? কলকাতার কোথায়, কোন হলে মুক্তি দেয়া হয়েছে? অথচ বাংলাদেশের জনগণের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ। যেখানে ঈদকে ঘিরে প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয়টা নিজ দেশের ছবি মুক্তির একটা প্রচলন আজীবন ধরে চলে আসছে। এই সময় নিজ দেশের নানা রংয়ের গল্প বাংলার দর্শক সিনেমার পর্দায় দেখতে অভ্যস্ত। 

অথচ এখন দেশের ছবি মুক্তির সুযোগ সঙ্কুচিত করে, প্রসেনজিৎ আর দেবের ছবি তথা কলকাতার ছবি বাংলাদেশের অধিকাংশ হল কামড়ে ধরার চেষ্টা চলে। থাকো ঘরে বন্দি স্বদেশের ছবি! আরো ভয়ংকর ব্যাপার পবিত্র মাহে রমযানে 'আল্লাহ মেহেরবান' গানের সুরে নুসরাত ফারিয়া নামের এক শিল্পীর অর্ধউলঙ্গ নৃত্য বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? যদিও দেশের ফুঁসে উঠা জনগণের প্রতিবাদ আর আইনি নোটিশের মাধ্যমে নুসরাতের এই অশ্লীলতাকে জাতি প্রতিরোধ করেছে। 

যে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে একদিন আমাদেরকে আন্দোলন করতে হয়েছিল, যে অশ্লীলতার বিরুদ্ধ মরহুম কর্নেল গুলজারকে একের পর এক হল এবং অশ্লীল ছবি সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করতে হয়েছিল কাটপিস নামক অশ্লীল সিনেমা ফুটেজ। এতদিন পর যৌথ প্রযোজনায় হোক আর সাফটার আওতায় ভারতীয় ছবিই হোক, আবার কি আমরা সেই অবস্হার দিকে ফিরে যাচ্ছি? যদি তাই হয় তাহলে একদিন যে অশ্লীলতার অভিযোগে ময়ুরী, পলি, মুনমুনদেরকে এফডিসিতে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছিল আজ তাদেরকে কি বলা হবে? কি বলা হবে ওই সব ছবির নির্মাতাদের? 

এতদিন যারা দাবি করেছেন যৌথ প্রয়োজনার ছবির ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রকার অনিয়ম বা প্রতারণা নেই, সম্প্রতি তাদেরই যৌথ প্রযোজনার 'বস ২' ছবিটি প্রিভিউ বোর্ডের কাছে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে বলে রিপোর্ট করলে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্নধার নাখোশ হয়ে, প্রিভিউ বোর্ডের একজন সদস্য, পরিচালক সমিতির বর্তমান সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ঠিক যেমন একজন সোনা ব্যবসায়ীর সোনার ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ নয় ড্রাগন বেরিয়ে আসে, উদ্ধার হয় ধর্ষক ছেলের বাবার অবৈধ সোনা ব্যবসার মনের মন অবৈধ সোনার স্তুপ। 

তারপরও সোনা ব্যবসায়ীদের সমিতি আন্দোলনের হুমকি দিয়ে শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালকের অপসরণ দাবি করার মতই, চিত্রপরিচালক মুশফিকুর রহমান গুলজারের পদত্যাগ দাবি। ব্যাপারটা এই রকম, আমরা যা খুশি করবো তোমরা দেখার কে? আর যদি দেখো তাহলে পদত্যাগ করো, না হয় অপসারিত হও। এবার বলবো, আমাদের ভবিষৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চিন্তার কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষের উদ্দেশে আপনার সামনে বলেছিলেন তাঁর প্রতি ভরসা রাখার জন্য, আপনি ভরসা রেখেছেন, বাংলার ষোল কোটি মানুষ ভরসা রেখেছে, কিন্তু মমতা কথা রাখেননি। 

তিনি কলকাতা ফিরে গিয়ে বরং উল্টো বলেছেন, তার রাজ্যই জল পায় না তিনি বাংলাদেশকে কোত্থেকে জল দেবেন। তিস্তার বিষয়ে মমতাকে দোষারোপ করে সময় অসময় দিল্লির দু'একজন মন্ত্রীও বলেছেন, তিস্তা চুক্তির পক্ষে যেমন বাংলাদেশের হাসিনা সরকার, তেমন চুক্তির পক্ষে দিল্লি সরকারও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণেই এটা এতদিন ধরে হচ্ছেনা। ঠিক। আমরা যেকেউ যদি মমতার স্থানে দাঁড়ায়, তাহলে দেখবো দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে মমতার এই মমত্ববোধ বা সিদ্ধান্ত সঠিক। যদিও ওটা গায়ের জোরে, কেননা প্রাকৃতিক ভাবে প্রবাহিত নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন বলে ভিন্ন কথা। 

সে যায় হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন, ভারতীয় চলচ্চিত্র বাংলাদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করুন। আপনারও এই সিদ্ধান্ত হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য, বাংলার মানুষের জন্য, ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য, উত্তম সিদ্ধান্ত। কেননা একটি দেশের চলচ্চিত্র শুধু পণ্য নয় শিল্পও বটে! তাই আমাদেরকেই আমাদের চলচ্চিত্র রক্ষা করতে হবে। কলকাতা পারেনি সাউথ ইন্ডিয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে, কিন্তু আমরা যেন পারি কলকাতা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে। দুই দেশের সামান্য কটা মানুষের হাতে বন্দি হয়ে সত্যি যেন চলচ্চিত্র ধ্বংস না হয়ে যায়। বরং স্ব স্ব স্হানে দুই দেশের ছবিই বেঁচে থাকুক, বেঁচে থাকুক ছবির মানুষগুলো। অটুট থাকুক সব দেশ, সব মানুষের সঙ্গে আমাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক।

এসজে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়