close
ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭ | ০৬ ভাদ্র ১৪২৪

গণপরিবহন

সিটিং চিটিং বনাম ভোগান্তির রকমফের

জাফর উল্লাহ সোহেল
|  ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৮:১৪ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৭, ১৪:১২
মুখে মুখে গণতন্ত্র আর নাগরিক অধিকারের কথা বলতে আমরা খুব ওস্তাদ। কিন্তু গণ বিষয়ে গণ মানুষের মতামত নেয়া আমাদের কোন ইচ্ছে নেই। সরকার তো নয়ই, এমনকি নাগরিক সমাজ বলে নিজেদের দাবি করা কিছু সুশীল ব্যক্তিও টেলিভিশনের টকশোতে এমন সব বিষয়ে মতামত চাপিয়ে দেয়ার বা তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে মতামত তৈরি করার চেষ্টা করেন, যা আসলে সাধারণ মানুষের ভেতরের কথা না। কিন্তু তাঁরা গণমানুষের মত বলেই নিজের মত চাপিয়ে দেন আর কর্তৃপক্ষও তাতে গা ভাসিয়ে দেন। জনগণ আসলে কী চান বা কীভাবে কোন সমস্যার সমাধান চান সেই কথাটি জানতে চাওয়ার কেউ নেই।
লোকাল বাসের সংকট কাটাতে এবং সিটিং নামে চিটিংবাজি বন্ধ করতে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হল। বলা হল, এতে সাধারণ যাত্রীদের উপকার হবে। অনেক যাত্রী নাকি এটা চেয়েছেন। টকশোতে কিছু বিশেষজ্ঞ গলা ফাটিয়েছেন এর পক্ষে। বলেছেন, পৃথিবীর কোন দেশেই সিটিং সার্ভিস নেই। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা করেন। তা পৃথিবীর সব দেশের শহর আর ঢাকা শহর কি এক ? পৃথিবীর কয়টা দেশে ঢাকা শহরের মতো এত লোকের চাপ, এত কম গণপরিবহন, এত এত জ্যাম, এত খারাপ রাস্তা, এত আনফিট চালক আছে ? টকশোতে যারা কথা বলেন, তারা কজন রাজধানীর গণপরিবহনে চড়েন?

কথায় কথায় আমরা বাকি বিশ্বের উদাহরণ টানি। কিন্তু সেইসব দেশে যে গণমানুষের কথা শোনে কর্তৃপক্ষ, পরিবর্তন বা সংস্কার কিছু লাগলে তাদের মতামত নিয়েই তা করে, জনগণ কী চায় তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।  সে বিষয়ে এদেশে অনুকরণের কোন ইচ্ছা কারো নেই। এই যে ইউরোপ থেকে ব্রিটেন বের হয়ে গেল, সেখানে কি সরকার নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? নেয়নি। তারা একটা গণভোট দিয়েছে, গণ মানুষের মত নিয়েছে, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েকদিন আগে তুরস্কও একইভাবে গণভোট থেকে জনগণের রায় নিয়ে সংস্কারে গেছে। আমাদের দেশে এসব চিন্তার কোন সময় কারো নেই। হুটহাট কিছু বিশেষজ্ঞ আর সরকার মনে করেছে। এমন করলে ভাল, ব্যস করে ফেলেছে। আরে ভাই, আপনি বলছেন জনগণের স্বার্থে আপনি এটা করছেন। তাহলে আপনি তাদের মতামত নেন, তারা কী চায়, কীভাবে চায় তা শুনুন।

যারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপনারা কি যাত্রীদের মতামত নিয়েছেন? কতজন যাত্রীর মত আপনারা নিয়েছেন? কতজন বলেছেন এতে তাদের উপকার ? মাননীয় কর্তৃপক্ষ, কষ্টকরে গণমানুষের এখন মুখখোলার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম ফেসবুক এ একটু ঢুঁ মেরে দেখুন। কজন আপনাদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আর কজন ধুয়ে দিচ্ছে! আর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একদিন পরের গণমাধ্যমের খবরগুলোও একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। অনেক যাত্রীর ইন্টারভিউ সেখানে এসেছে। আমার মনে হয় না ১/২ শতাংশের বেশি যাত্রী আপনাদের সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছে। বেশিরভাগই নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছে ফেসবুকে এবং গণমাধ্যমে। একটা অনলাইন গণমাধ্যমে আসা এক নারী যাত্রীর বক্তব্য ছিল এরকম, আগে তো বাসে উঠে অন্তত একটু শান্তি পেতাম, জ্যামে বসে থাকলেও কষ্ট কম হত। এখন গাদাগাদি করে জ্যামের মধ্যে কীভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাব? আর পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গাড়িতে উঠবই বা কীভাবে? না উঠতে পারলে ঠিক সময়ে অফিসে যাব কী করে?

সিদ্ধান্ত প্রণেতারা কি এই নারী যাত্রীদের ভোগান্তির কথাটি ভেবেছেন? ভাবেননি। কেবল তো নারীই নয়। ঢাকা শহরের গণপরিবহনের যাত্রী আছে বয়স্ক নারী-পুরুষ, শিশুও; আছে প্রতিবন্ধী, অসুস্থ আর স্কুলগামী শিক্ষার্থী।তাদের কী হবে? প্রথমদিনই দেখা গেছে শত শত নারী-শিশু বৃদ্ধ ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। গরমে তাদের কারো কারো নাভিশ্বাস উঠেছে। অনেকেই ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারেননি। অনেকে যেতে পারেননি হাসপাতালে। আচ্ছা, ঢাকা শহরে চাকরিজীবী নারীর সংখ্যা কত? আমি আসলে জানি না। জানি না কারণ, সম্ভবত এ নিয়ে কোন জরিপ নেই। না সরকারি মহলে না বেসরকারি মহলে। কিন্তু অনুমান তো কিছুটা করতে পারি। সেটা বাসে চড়ার সময় নারী সহযাত্রীর সংখ্যা দেখে, কর্মস্থলে নারীর উপস্থিতি দেখে, ফুটপাতে হাঁটার সময় পথচারিদের কাতারে নারীর উপস্থিতি দেখে। দিনে দিনে আমরা আধুনিক হচ্ছি, নারীকে কর্মে উৎসাহিত করছি। কিন্তু আবার তাকে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ফেলছি।

দুদিন পরে মঙ্গলবার সেতুমন্ত্রী বলছেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি পুর্নবিবেচনা করা হবে। নিঃসন্দেহে খুবই ইতবাচক চিন্তা। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী, দ্বিতীয়বারের এই ভাবনাটা কি প্রথমেই ভাবা যায় না ? সাধারণ মানুষের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত অনেকদিন ভেবে চিন্তে নেয়া হল, তা সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করে কেন নেয়া হল না। ঢাকা শহরে চলাচলে কী কী অসুবিধা, তা যারা চলাচল করেন তাদের চেয়ে কি বিশেষজ্ঞরা বেশি জানেন ?

আসলে এদেশে কোনকিছুতেই জনমতের বালাই নেই। বাস মালিকদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের অভিযোগ ছিল প্রধানত দুটি। এক, বেশিরভাগ বাস সিটিং বানিয়ে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে।  আর দু’ নাম্বার হচ্ছে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বাস রাখেনি কেউ। আর সিটিং সার্ভিস নামের বাসগুলো এসব যাত্রীকে তুলতে চায় না, আবার অনেক সময় শুরুর স্টপেজেই ভর্তি হয়ে আসে বাসগুলো। ফলে পথের যাত্রীরা আর উঠতে পারেন না। তো এ দুটি প্রধান সমস্যা সমাধানে কী কী করণীয়?

যাত্রীদের একটা বড় অংশের দরকার লোকাল বাস সার্ভিস। লোকাল সার্ভিস মানেই কিন্তু গাদাগাদি আর হুড়োহুড়ির সার্ভিস নয়। বেশি পরিমাণ বাস রাস্তায় নামানো হলে সিটে বসেই লোকাল বাসের যাত্রীরাও চলাচল করতে পারবেন। সে চাহিদা তো সরকারই মেটাতে পারে। বিআরটিসি জনগণকে কী সেবা দিচ্ছে ? রাজধানীর গণপরিবহনের নিশ্চয়তাটুকুও কি তারা দিতে পারে না?  মাঝে বেশকিছু বিআরটিসি একতলা দোতলা বাস বেশ নিয়মিত নামানো হতো। সেই ফ্লো বন্ধ হয়ে গেল কেন? এ ব্যাপারে মানুষের সাধারণ অভিযোগ হল, বাসমালিকদের স্বার্থ দেখতে গিয়েই সরকারি গণপরিবহনকে সবসময় পিছিয়ে রাখা হয়। এটা অনেকাংশেই সত্যি। তা না হলে রাস্তায় অন্তত ৫০ শতাংশ বাস সরকার দিতেই পারে। ঢাকা শহরের মানুষ কি ট্যাক্স কোন অংশে কম দেয়? স্বস্তিকর একটি পরিবহন সেবা তো তাঁরা পেতেই পারেন। এই খাতেও জনগণকে সেবা দেয়ার যে একটা বিষয় আছে তাও হয়তো আমাদের নীতি নির্ধারকদের মাথায় নেই। 

বিলম্বে আসুক উপলব্ধি, তবু ভাল উপলব্ধি বলব মাননীয় সেতু মন্ত্রীর। গণ পরিবহনে নৈরাজ্য কমাতে এবং যাত্রীদের সমস্যা সমাধানে পুনরায় চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন তিনি। সেই চিন্তা ভাবনায় এরকম কিছু আসুক যা সবার জন্য আখেরে ভাল হবে। সেটা এমনকি বাসমালিকদের জন্যেও। তাঁরাও তো ব্যবসা করতেই নেমেছেন। তাঁদের একেবারে পথে না বসিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে এই খাতে শৃঙ্খলা নিয়ে আসা হোক। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাস কোম্পানিদের অর্ধেক বাস সিটিং সার্ভিস রেখে বাকী অর্ধেক লোকাল সার্ভিস হিসেবে রাস্তায় নামানোর সুপারিশ করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই গণপরিবহন আরো বাড়াতে হবে। সেটা সরকারিভাবে হলে সবচেয়ে ভাল। সরকার না পারলে বেসরকারিভাবে হলেও যাতে বেশি বাস নামে সে ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য রাস্তার ব্যক্তিগত গাড়ি সীমিতকরণের যে উদ্যোগ একবার নেয়া হয়েছিল তা আবার আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের সব ব্যক্তিগত গাড়ি এ বি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে একদিন  এ আরেকদিন বি ক্যাটাগরির গাড়ি চালানোর অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। এতে রাস্তায় বাস বেশি চললেও অসুবিধা থাকবে না।

লেখক- জ্যেষ্ঠ বার্তাকক্ষ সম্পাদক, আরটিভি।      

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়