হোটেলে মরা মুরগি খাচ্ছেন না তো?

প্রকাশ | ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৪৮ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:৩৭

মাসুদ মোস্তাহিদ
ছবি প্রতীকী

রাজধানীর অনেক হোটেল ও ফাস্টফুডের দোকানে খাওয়ানো হচ্ছে মরা মুরগি। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে কয়েকটি অসাধু চক্র নগরজুড়ে গড়ে তুলেছে মরা মুরগির বাজার। ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে হোটেল, বাসা-বাড়িতে গড়ে ওঠা মেসের বুয়ারাও জড়িত চক্রের সঙ্গে।

কাপ্তানবাজারের একটি সিন্ডিকেট চক্র কেবল ঢাকায় নয়, এর আশপাশেও মরা মুরগি সরবরাহ করছে। এতে নিরাপদ খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোক্তারা। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। সবকিছু চোখের সামনে চললেও নির্বিকার প্রশাসন।

প্রতিদিন সারা দেশ থেকে রাজধানীতে আসা মুরগির গাড়িগুলোতে মারা যাওয়া শতশত মুরগি কোথায় যায়? নগরীর ডাস্টবিনগুলোতে-তো কখনো এগুলোকে পাওয়া যায় না!

নাকি ফাস্টফুডের দোকান, হোটেলগুলোতে মুখরোচক সুস্বাদু যে খাবার খাওয়ানো হচ্ছে, সেগুলো তৈরি হচ্ছে এসব মুরগি দিয়ে-ই?

কারণ অনুসন্ধানে নামে  আরটিভি সংবাদ দল। রাত সাড়ে তিনটা, স্থান- রাজধানীর কাপ্তানবাজার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছে শত শত মুরগির গাড়ি। প্রতিটি গাড়ির ওপরেই মৃত মুরগি। কিন্তু সকাল হতেই সব উধাও!

সিটি কর্পোরেশনের এক ডাস্টবিন পরিচ্ছন্নকর্মী বলেন, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ মুরগি মরে। সকাল থেকে শুরু হয়  মরা মুরগি সরানোর কাজ।

-------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : এতো মরা মুরগি কোথায় যায়?
-------------------------------------------------------

তাহলে মধ্যরাতে কারা মরা মুরগি নিয়ে যায়?

সরেজমিনে দেখা যায়, রাত সাড়ে তিনটা থেকে শুরু হয়  মরা মুরগি সংগ্রহ। কিছু চলে যায় বাজারের অলিগলিতে। বাকিগুলো জমা করে রাখা হয় ঢাকা ও তার আশপাশের জন্য!

রিক্সাভ্যান অনুসরণ করে কামরাঙ্গীর চরের খাল পাড়ে যায় আরটিভির সংবাদ দল। হাতে-নাতে ধরা পড়ে গোলাম বাজারের এক মরা মুরগি বিক্রেতা। এসময় ওই বিক্রেতা আরটিভির কাছে এ ধরনের ভুল হবে না বলে জানান।

কেবল কেরানীগঞ্জের গোলাম বাজারের ব্যবসায়ী সেলিমই নন মরা মুরগি ব্যবসার সিন্ডিকেটদের নেটওয়ার্ক ঢাকার বাইরেও রয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, জানতে চাই সেলিমের কাছে। কিন্তু ততক্ষণে মোবাইল বন্ধ করে লাপাত্তা হয়ে যায় কাপ্তান বাজারের সিন্ডিকেট দলের হোতারা।

আমরাও নাছোর বান্দা দেখতে চাই এর শেষ কোথায়। কিছুদিন পর আবার চলে অনুসন্ধান। এবার ওয়ারী থানার জোড়পুল বাজারে আরটিভি সংবাদ দল।

দোকানে কেউ কি জবাই করা মুরগি কিনতে যান তাহলে মুরগির দোকনে কেন দুটি ডিপফ্রিজ। বোঝার বাকি থাকে না কোথায় কিভাবে খাওয়ানো হচ্ছে মানুষকে মরা মুরগি।

নগরবাসীকে ঘুমে রেখে প্রতিরাতে এভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় মরা মুরগি। নানা প্রক্রিয়ায় করা হয়  সুস্বাদু। সকাল হতেই যা চলে যায় ঢাকা ও তার আশপাশের হোটেল, বাসাবাড়ির মেস, ফাস্টফুডের দোকানে।

আর এর মূল হোতা কাপ্তান বাজারের প্রভাবশালীরা সব সময় থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

চিকিৎসকরা বলছেন, মরা মুরগির মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলছেন, এসব মুরগি হয় আহত হয়ে মারা যাচ্ছে অথবা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে মারা যাচ্ছে। অথবা অন্য কোনও রোগ যেমন ডায়রিয়া হওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে। তাহলে যে মোরগ মরগিটি এভাবে মারা গেলো, তা তো সিদ্ধ নয়। সুতরাং এসব মাংসের সঙ্গে ভোক্তারা বিষ খাচ্ছে। এটা ইসলামী শরীয়াতে নেই।

আগে হোটেল ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে জীবিত মুরগি কিনে নিলেও দাম কম হওয়ায় অনেক মালিকের ঝোঁক এখন মরা মুরগির দিকে। বাজারেই সব প্রক্রিয়া শেষ কোরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়ও পাঠানো হয় এগুলোকে। গলা কেটে দিলে বোঝার উপায় থাকে না, কোনটা মরা আর কোনটা জীবিত ছিলো। এভাবে বছরের পর বছর প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ভোক্তা অধিকার দারুণভাবে লঙ্ঘিত হলেও খবর নেই প্রশাসনের।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, মুরগি যারা বিক্রি করে, তারা তো সেটা চুপি চুপি করে। সেটা আমাদের গোচরে আসে না। এখানে হোটেল মালিকদেরও নৈতিকতার স্থখন রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ আসলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারি।

মরা মুরগি খাওয়ানো নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক খবর হয়েছে। হয়েছে অনেক হৈ চৈও। ফলে প্রশাসনও কিছুদিন নড়েচড়ে বসে, চলে ধরপাকড়। কিন্তু, কয়েকদিন পর সব থিতিয়ে আসলে আবারো চুপ। ফলে অসাধু চক্রও ভাঙ্গে না। তাই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- এভাবে আর কত কাল চলবে?

আরও পড়ুন :

এসআর