• ঢাকা শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫

নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধননামা-২

ট্রাম্পকার্ড নয়, রেটকার্ড হতে চায় ওরা

সিয়াম সারোয়ার জামিল, আরটিভি অনলাইন
|  ১৬ মার্চ ২০১৮, ১১:৫১ | আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৮, ১৮:০০
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে তৎপর হয়ে উঠেছে নতুন রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে ৭৬টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। নিবন্ধনের কাগজপত্র জমা দেয়ার শেষ দিনে অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। প্রশ্নে‌ উঠেছে, এত রাজনৈতিক দল কোথা থেকে এলো? দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের মাঠে তাদের ভূমিকাই বা কতটা? 

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শুরু হলে ১১৭টি আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু মাত্র ৩৯টি দল নিবন্ধন পায়। এর মধ্যে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল হয়। আদালতের আদেশে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ হয়। এরপরে মুসলিম লীগ (বিএমএল) নামে নতুন একটি দলও নিবন্ধন পায়। দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও ৪৩টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। এর মধ্যে নিবন্ধন পেয়েছিল মাত্র দুটি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার ৭৬টি নতুন রাজনৈতিক দলের অধিকাংশই সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই অপরিচিত। বেশিরভাগ দলই গত বছর আত্মপ্রকাশ করেছে। এর নেতাদের কোনো পরিচিতি নেই। বেশিরভাগই নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বাসস্থানের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘সাধারণ জনতা পার্টি’ নামে একটি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে। দলটির আবেদনে ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আত্মপ্রকাশের কথা উল্লেখ করা আছে। এ দলটির সভাপতি ড. ছরোয়ার হোসেনের বাসস্থান ও কার্যালয় একই। হাতিরঝিলের দক্ষিণ বাড্ডাস্থ বাসভবনে পরিচালনা করা হচ্ছে দলীয় কার্যক্রম। বর্তমানে ২১টি জেলা ও ২৪টি উপজেলায় কমিটি রয়েছে।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি’ (বিএমজেপি) আত্মপ্রকাশ করে। এ দলটিও নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে। অক্টোবরে প্রতিষ্ঠা পায় সাধারণ জনতা পার্টি। এ দলটিও নিবন্ধনের আবেদন করেছে। 

কথা হয় মাইনরিটি জনতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক সুকৃতি কুমার মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমরা এককভাবে নির্বাচন করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না। নির্বাচনের আগে সুবিধা মতো কোনো জোটের সঙ্গে গিয়ে নির্বাচন করতে পারি। তবে কোন জোটে যাব, তা এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যার সঙ্গেই যায়, দরকষাকষি তো থাকবেই।

ইউনাইটেড ইসলামিক পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দলও আবেদন করেছে নির্বাচন কমিশনে। এ দলটির কার্যক্রম ইদানীং দেখা গেলেও তেমন সক্রিয় না। নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে বাংলাদেশ গণশক্তি দল নামে একটি রাজনৈতিক দল। গণশক্তির প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মজিদ ফকির। এ দলটি প্রতিষ্ঠাও বেশিদিনের নয়।  কী উদ্দেশ্যে এই দল গড়েছেন এমন প্রশ্নে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মজিদ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমরা পুরানো দল। আগে সক্রিয় ছিলাম না। এখন সক্রিয় হয়েছি। এজন্য নিবন্ধনের আবেদন করেছি।

জেনারেল পিপলস পার্টি (জিপিপি) নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ করে ১২ নভেম্বর। ড. ছরোয়ার হোসেন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমি এর আগে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। কিন্তু ‘ইউনিয়ন পরিষদ অ্যান্ড লোকাল লেভেল ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ: প্রোবলেমস অ্যান্ড প্রসপেক্টাস’ শীর্ষক পিএইচডি গবেষণা করার সময় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেই। নিবন্ধন পেলে মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করবো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, একই বছরে আত্মপ্রকাশ করে একই বছরে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে বেশিরভাগ দল। কীভাবে এত অল্প সময়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করতে পারে, তা বোধগম্য নয়। বেশিরভাগ দলই নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করেনি। প্রতি নির্বাচনের আগে অনেক দল এভাবে গঠিত হয়। বেশিরভাগই বাদ পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আবেদনগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। কয়েক দফা সভাও হয়েছে। নিবন্ধন দেয়ার আগে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করা হবে। যেসব নাম নিবন্ধনযোগ্য হবে, তাদের নাম কমিশনে সুপারিশ করা হবে। কমিশনের সভায় চূড়ান্ত হবে, কে শর্ত পূর্ণ করেছে। কে করেনি। সে অনুযায়ী নিবন্ধন দেয়া হবে।

এ নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি আরটিভি অনলাইনকে বলেন, দেশে কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে নিবন্ধনের জন্য আইন আছে। ফলে বেশিরভাগ দলই এখন দুই, চার বা পাঁচজন মিলেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করছে। পরে নিবন্ধন পেলে তারা বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট বাধতে চায়। সুবিধায় নিতে চায়।

একইমত দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. এম এম আকাশও। তিনি আরটিভি অনলাইনকে বলেন, সবার উদ্দেশ্য তো রাজনীতি নয়। কেউ কেউ অন্য উদ্দেশ্যেও রাজনীতি করতে আসে। সুবিধা নিতে চায়। এটা দেশের জন্য শুভ নয়। 

তবে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই আদর্শচ্যুত উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, এখন ছোটদের বা নতুনদের ট্রাম্পকার্ড ভাবার সুযোগ নেই। তারা বড়দের মূলত রেটকার্ড ফেলতে চায়। তাদের সেভাবে জনসমর্থন বা জনবল নেই। তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে মূলত রেটকার্ড ফেলতে চায়।

এম এম আকাশ আরো বলেন, জনসমর্থন না থাকলেও রাজনৈতিক জোটে দলের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে কেউ কেউ। এ অবস্থায় নতুন দলগুলো নিবন্ধিত হতে চাইছে কেবল নিজেদের দরকষাকষির জায়গা আরো পোক্ত করার জন্য। রাজনীতি তাদের কাছে কেবলই বাণিজ্যে।

আরও পড়ুন :

 

এসজে/এমকে 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়