close
ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০২ পৌষ ১৪২৪

এক মগের মুল্লুক থেকে আরেক মগের মুল্লুকে গণপরিবহন !

মিথুন চৌধুরী
|  ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৫:০৪ | আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৬:৪৩
সরকার দোষ দিচ্ছে মালিকপক্ষকে। মালিকপক্ষ দিচ্ছে শ্রমিকদের। এ রশি টানাটানির যাঁতাকলে উঠছে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস।

২০০৪ সালে সিটি বাস সার্ভিসের মাধ্যমে সিটিং প্রথা শুরু হয় রাজধানীতে। শুরুতে ভাল সার্ভিস দিয়ে এ প্রথা শুরু হলেও ধীরে ধীরে নৈরাজ্যের রূপ নেয়। গুটি কয়েক বাস কোম্পানি সিটিং প্রথা চালু করে। পরে বাড়তি আয়ের লোভে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাজধানীর অনেক বাস সিটিং সার্ভিস বনে যায়। ফলে বাসে উঠলেই ভাড়া গুনতে হতো শেষ স্টপেজ পর্যন্ত। আর গাড়িতে উঠলে নামলে দিতে হতো ১০ থেকে ২৫ টাকা। এছাড়া  সিটিং সার্ভিসের নিজের মতো করে তৈরি করা স্টপেজ পার হলে দিতে হতো দিগুণ ভাড়া। এতে রীতিমত জিম্মি হয়ে পড়ে রাজধানীবাসী। যা বিআরটিএ নীতিমালায় নেই। এমনকি রুট পারমিটেও নেই সিটিং বা গেটলক।  তবে এ থেকে শুরুতে পিছিয়ে ছিল না সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসিও। পরে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ হলে সিটিং প্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করে বিআরটিএ। কিন্তু সিটিং বন্ধ হলেও বাড়তি টাকা নেয়া বন্ধ হয়নি।

যাত্রী কল্যান সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, রাজধানীজুড়ে এ নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন হাতে গোনা কয়েকজন পরিবহন নেতা। যারা পরিবহন মালিক নেতা বনে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে দায়সারা ভাব নেন। তারাই মূলত সিন্ডিকেট ও তদবিরের মাধ্যমে সিটিং সার্ভিস বন্ধ না হওয়ার জন্য পায়তারা করে আসছিলেন। এছাড়া শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নামও আসে। যারা মাসিক চাঁদার মাধ্যমে সিটিং প্রথাটিকে উস্কানি দিতেন। ফলে প্রতিনিয়ত দাঁতে দাঁত ছেপে চলাচল করতো যাত্রীরা। সিন্ডিকেটটি এতোই সক্রিয় যে তারা বেসরকারিভাবে পরিবহন খাতের কর্তৃত্ব বাড়াতে রাষ্ট্রীয় বিআরটিসিকে দুর্বল করে তোলে। ফলে পরিবহন খাতের কর্তৃত্ব পুরোপুরি বেসরকারি খাতে। সিটিং সার্ভিস শুরুতে রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও ধীরে ধীরে জেলা শহর গুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে পতাকাবাহী গাড়ি, চট্টগ্রামে মেট্রো সার্ভিসে অতিষ্ঠ এলাকার জনগণ।

সিটিং সার্ভিস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় তোপের মুখে মালিক সমিতি সার্ভিসটি পুরোদমে বন্ধ করতে গেল ৩০ মার্চ জরুরি সভা ডাকে। ৪ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে ঘোষনা দেয়া হয় ১৫ এপ্রিল থেকে ঢাকার বাস-মিনিবাসে সিটিং সার্ভিস থাকবে না। ১৫ এপ্রিল বাস-মালিকরা বিষয়টি পাত্তা না দেয়ায় ওদিন বিকেলেই বিআরটিএ ও মালিক সমিতি জরুরি সভা শেষে সিটিং সার্ভিসের নীতিগত অনুমোদন নেই এমন মন্তব্য করে সার্ভিসটি বন্ধের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রোধ ও সিটিং সার্ভিস বন্ধ এবং পরিবহন খাতের শৃঙ্খলার আগ পর্যন্ত অভিযানের ঘোষণা দেন বিআরটিএ। এতে মালিকসমিতি ও ডিএমপি সহায়তা করছে।

এদিকে গেল কয়েকমাস ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ফিটনেস বিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়। এতে বেশ কয়েকটি গাড়ি ডাম্পং ও জেল-জরিমানা করা হয়।

এদিকে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলেও গাড়িতে “সিটিং” লেখাটা মুছে হলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বিআরটিএর চার্ট না মেনে আগের মতো ভাড়া আদায় করছে বেশিরভাগ বাস। ফলে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে বিতর্ক, ঝগড়া, হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে গেল কয়েক দিনে। এরমধ্যে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার প্রতিবাদ করায় দুই গণমাধ্যমকর্মীও আহত হয়েছেন।

সাধারণ যাত্রীরা বলছে, সরকারি চার্ট অনুসারে ভাড়া দিয়েও কেন কষ্ট করতে হবে। বাস কোম্পানি চার্টের টাকা দিয়ে ভাল সার্ভিস দিয়ে তাদের ব্যবসা করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। যা বিশ্বব্যাপী চলমান। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর মনিটরিং ও সরকারি পরিবহনগুলো আগের মত সচল করলে পরিবহনখাতের নৈরাজ্য কমবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সিটিং বন্ধের পরও কেন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যাত্রীদের কাছ থেকে সরকারি চার্টে ভাড়া না নিয়ে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে তারা। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সময় সিটিং সার্ভিসের ভাড়া নৈরাজ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওবায়দুল কাদের বলেন,   পরিবহনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সামান্য মানুষ নয়, খুবই প্রভাবশালী। তবে সরকারের চেয়ে তারা বেশি প্রভাবশালী নয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি অভিযানে গেলেই পরে তা বাড়াবাড়ি বলে সরকারের সমালোচনা শুরু হয়।  ভোগান্তি হয় সাধারণ মানুষের, তা এড়িয়ে চলা বা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকার যখন বাধন কোষণ শুরু করবে তখন ফসকা গেরো হবে।

তিনি বলেন, ফিটনেসের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে অপরাধ। কেউ নানা অজুহাতে যদি গাড়ি না চালায় আমাদের দেশের বাস্তবতায় জোর করে গাড়ি নামানো অসম্ভব।  যারা  এসব বিষয়ে তাগিদ দিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে তারাই কখনো কখনো এ ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ খান বলেন, বাসের সংকট নেই, সমস্যার কারণে অনেক গাড়ি গ্যারেজে রয়েছে। আবার যাদের কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে তারা অভিযানের ভয়ে রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছেন না। তবে তা খুব সামান্য। অভিযানের কারণে আগের তুলনায় অনিয়ম কমেছে।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না, দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার জন্য একটু কষ্ট করতে হবে। অভিযানের মধ্যে যেসব বাস রাস্তায় নামানো হচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। এসব গাড়ির রুট পারমিট বাতিল করতে হবে। বিআরটিএর চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। অভিযান চলমান থাকতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার বিরুদ্ধে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

গেল সোমবার শাহবাগে অভিযানের কারণে রাজধানীতে বাস সার্ভিস বন্ধ রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুঁশিয়ারি করে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মশিউর রহমান রুট পারমিট বাতিলের ঘোষণা দেন।

এমসি/এএইচ/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়