close
ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০১ পৌষ ১৪২৪

সৌন্দর্যবর্ধনে কোটি টাকার বনসাই কেন?

সিয়াম সারোয়ার জামিল
|  ১৯ মে ২০১৭, ২৩:১৮ | আপডেট : ২২ মে ২০১৭, ১৪:০৬
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডের সৌন্দর্যবর্ধনে ৩ কোটি টাকা খরচ করে বনসাই ফাইকাস রোপণ করা হয়েছে। চীন থেকে আমদানি করা এ বনসাই নিয়ে এরইমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। গাছগুলো বড় আকৃতির হলেও নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এটা রাষ্ট্রীয় অর্থের শুধু অপচয়ই নয়, রাজধানীর সৌন্দর্যহানীর ও কারণ হয়ে উঠতে পারে। আর উদ্ভিদবিদরা বলছেন, এ ধরনের বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণে যে সতর্কতা দরকার তা সম্ভব হয়ে উঠবে না। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, বনানীর পর থেকেই এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বেশ পরিচ্ছন্ন প্রশস্ত রাস্তা। ছিমছাম ফুটপাথ ঘেঁষে লাগানো হয়েছে বাহারি গাছ, লতাপাতা। এর মাঝে মাথা নেড়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ফাইকাস বনসাই। ইট-পাথরের শহরের বুকে ধূসর শরীর, জড়ানো শিকড় আর ঊর্ধ্বমুখী ডানায় বেশ বিরক্তই হতে দেখা গেছে নগরবাসীকে।

বনানীর স্থানীয় বাসিন্দা আহসান আহমেদ অনিক জানালেন, 'সৌন্দর্যবর্ধনের নামে রাস্তার সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ভেবেছিলাম প্রশস্ত করার জন্যে, আসলে তা নয়। বরং দেশীয় গাছের স্থলে বিদেশি বনসাই লাগাবার জন্যে। 

বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, এয়ারপোর্ট রোডের দুপাশে আগে কত লাল-নীল ফুল ফুটে থাকতো। সব দেশি ফুল। ঋতু বদলে রাস্তাটার রঙও বদলে যেত। নানারকম রূপ ধারণ করতো! এখন সব গাছ কেটে এরকম উদ্ভট সিদ্ধান্ত সরকার কেন নিলো, বোধগম্য হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ' এ ধরনের গাছ বাংলাদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। দেশি গাছ ছেড়ে বিদেশি গাছ আনার এই চিন্তা সংশ্লিষ্টদের মাথায় কীভাবে এলো!'

বনানীর যাত্রী ছাউনিতে অপেক্ষা করছিলেন চাকরিজীবী ফজলুর রহমান। ফুটপাত আধুনিকায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এলাকাটা উন্নত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আগের নানা রঙের ফুল ফোটানো দেশীয় গাছ কেটে এরকম বিদেশি গাছ লাগানোটা ভালো লাগেনি। 

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'আমি কোনোমতেই বুঝতে পারছি না যে, কেন টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে আমদানি করে এমন গাছ লাগাতে হলো! রাজধানীকে এখন সবুজ বানানো জরুরি। অথচ সেটা না করে এরকম উন্নয়ন সত্যিই আমরা চাইনা।'

শুধু স্থানীয় বা যারা এ রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাফেরা করেন তারাই নন, আমদানি করা এ বনসাই রোপণ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন নগরবিদ, উদ্ভিদবিদ, গবেষকরাও। উদ্ভিদবিদ সুজা উদ দৌলা প্রশ্ন তুললেন বনসাইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েই।

তিনি বলেন, 'এ ধরনের বনসাইয়ের সতর্ক রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি, যেটা এখানে হবার সম্ভাবনা কম। ফলে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে আনা হলেও কিছুদিন পর বরং নগরীর সৌন্দর্যহানীর কারণ হতে পারে এসব বৃক্ষ। দেশীয় গাছগুলো যদি এখানে লাগানো হতো সেটা বরং আরো সৌন্দর্য বাড়াতো, ছায়াসুনিবিড় একটা পরিবেশ তৈরি হতো।'

নগরপরিকল্পনাবিদ আকতার মাহমুদও আপত্তি তুললেন বনসাই নিয়ে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'কেমন করে এমন একটা নির্বোধের মতো কাজ করা হলো? মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই রাস্তার দুইপাশে নানা জাতের নানা রঙের ফুল ফুটে থাকত। জারুল, সোনালু, রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়ার বাহারী ফুল সবাইকে মুগ্ধ করতো।'

তিনি বলেন, 'যারা উত্তরা এলাকায় থাকেন তারা সকাল বিকেল আসা যাওয়ার পথে এই ফুলগুলো দেখতে পেতেন। এখন এই ভিনদেশি কদাকার গাছগুলো দেখতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'রাস্তার ধরন, যানবাহনের বিভিন্নতা, স্থানীয় মানুষের পছন্দ, গাছের প্রাপ্যতাসহ নানা বিষয়কে বিবেচনায় এনে গাছ নির্বাচন করা হয়। এক্ষেত্রে কী করা হলো?'

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলছেন, ঢাকার বিমানবন্দরের রাস্তার ধারে বনসাই গাছ লাগানো হয়েছে এই খবরে আমি বিস্মিত হইনি। কী বলা হচ্ছে, কী ভাষায় বলা হচ্ছে তা যেমন বনসাই চিনিয়ে দেবে তেমনি চিনিয়ে দেবে কী বলা হচ্ছে না তাও। আর যদি কার্যকলাপ অনুসরণ করেন তবে তো কথাই নেই। কখনো কখনো মনে হয়- মানুষের মধ্যে বনসাই হবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিনয়ে নয়, স্বার্থের তাগিদে; অনুপার্জিত বিত্তের জন্যে, অতিসামান্য কিছু প্রাপ্তির জন্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভেতর হলেও এই রাস্তাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। তারাই এয়ারপোর্ট রোডের সৌন্দর্যবর্ধন কাজের দেখভাল করছে বলে জানালেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মেসবাহুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'এই কাজ তদারক করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। আমরা এখানে কিছু করছি না। তারা কেন এ ধরনের গাছ বিদেশ থেকে আমদানি করল বা রোপণ করল, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।'

তবে ঢাকা সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান আরটিভি অনলাইনকে বলছেন, 'বনানী ওভারপাস টু এয়ারপোর্ট বিউটিফিকেশন প্রকল্পের আওতায় ফুটপাথের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। ফুটপাতকে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তুলতে চীন থেকে এনে ১২০টি ফাইকাস বনসাই লাগানো হয়েছে। এই বনসাই গাছগুলোর একেকটির দাম প্রায় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। এই গাছগুলো আনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা।'

তিনি বলেন, 'যেসব গাছের বনসাই করা হয় তার মধ্যে ফাইকাস গাছের বনসাই বেশি দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে। আর এ কারণে অন্য বনসাইয়ের তুলনায় এর দামও একটু বেশি। গাছগুলোর দামের চেয়ে বেশি খরচ হয়েছে চীন থেকে ফ্রিজার কনটেইনারে এগুলো নিয়ে আসতে। আগে থেকেই ফুটপাতে টব তৈরি করা ছিল। এগুলো নিয়ে এসে পরিচর্যা করে পরিকল্পনা মতো বপন করা হয়েছে।'

গাছগুলো দেশের আবহাওয়া উপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'শুধু এই বনসাই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হবে বাহারি পাতার গাছ। আমরা সেগুলো লাগাবো।'

এতটাকা খরচ করে এসব গাছ আনা কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'বিদেশিরা এ রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তাদের একটি সুন্দর বাংলাদেশ দেখাতে চাই আমরা। সেজন্যেই উন্নয়ন ও নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।'

এসজে/সি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়