• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

নতুন ঢঙে প্লাস্টিক, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫%

মিথুন চৌধুরী
|  ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২১:১২ | আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৯:২০
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিকাশমান শিল্পখাত প্লাস্টিক। প্রযুক্তি ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেশ পরিবর্তন ঘটেছে দেশের প্লাস্টিক পণ্যে। ফলে অ্যালুমিনিয়াম, সিরামিক পণ্যকে পেছনে ফেলে এসব  খুব সহজেই দেশীয় ক্রেতাদের মন জয় করে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্তে সেদেশে রপ্তানি কমার পাশাপাশি অন্য দেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করেছিলেন প্লাস্টিক শিল্পের উদ্যোক্তারা। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টায় আশার আলো ফুটছে প্লাস্টিক খাতে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত প্লাস্টিক পণ্যে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ডলার আয় হয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্লাস্টিক পণ্য থেকে মোট রপ্তানি আয় আসে ৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯৫ হাজার ডলার।

আগে শুধু ঘরের টুকিটাকি কাজে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার হলেও এখন প্রযুক্তির উন্নয়নে নিত্যপণ্যের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। পোশাক খাতের সরঞ্জাম, খেলনা সামগ্রী, ঘরে ব্যবহারের বিভিন্ন তৈজসপত্র, অফিসে ব্যবহারের জিনিসপত্র, গৃহনির্মাণসামগ্রী, জানালা ও দরজা, চিকিৎসার উপকরণ, কৃষি খাতের জন্য পাইপ ও বড় চৌবাচ্চা, গাড়ি ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন পণ্য, কম্পিউটারের উপকরণ হিসেবে প্লাস্টিকের পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভর শিল্পটি এখন রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হয়েছে।

দেশে প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা শুরু সেই ৫০ দশকের শুরুতে।  হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ শিল্প এতোটাই এগিয়েছে যে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১২তম প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিকারক দেশ।

উদ্যোক্তারা বলছেন, পোশাক শিল্পের মতো আনুকূল্য পেলে প্লাস্টিক পণ্য দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাতে পরিণত হবে।

৫০ দশকের শুরুতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে প্লাস্টিক শিল্প। ৯০ দশক পর্যন্ত  এ দেশে নিম্নমানের প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদিত হতো। বিদেশি প্লাস্টিক পণ্যের জন্য দেশীয় বাজার ছিল অবারিত। এখন মানে ও বৈচিত্র্যে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প এতোটাই এগিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশে  দেশের তৈরি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। চীন, ভারতেও তা সমাদৃত হচ্ছে।  এ শিল্পের উদ্যোক্তারা ২০২১ সাল নাগাদ রপ্তানি বাবদ ২০ হাজার কোটি টাকা আয়ের আশা করছেন।

প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হয়। তবে প্রথম থেকেই দুটি শর্ত রাখা হয়। যেমন প্লাস্টিক দ্রব্য উৎপাদনের কোনো পর্যায়েই ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা নেয়া যাবে না। এ ছাড়া রপ্তানির বিপরীতে বন্ড-সুবিধাপ্রাপ্ত এবং ইপিজেড এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এসব শর্তের কারণে নগদ সহায়তার সুবিধা খুব বেশি পাচ্ছেন না রপ্তানিকারকেরা।

মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের ধলেশ্বরী সেতুর পশ্চিম পাশে বড়বর্ত্তা মৌজায় ৫০ একর জমিতে প্লাস্টিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। শিল্প নগরীতে ৩৪৮টি শিল্প ইউনিট স্থাপন করা হবে। এসব ইউনিটে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, সেজন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে দরকারি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালের জাতীয় শিল্পনীতিতে এ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ‘শিল্পনীতি ২০১৬’-এ প্লাস্টিক খাতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে শিল্পনীতি ২০১৬ খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমই) সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে দেশে ছোট-বড় প্রায় ৫ হাজার প্লাস্টিক শিল্প রয়েছে। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষের। পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ১৩ লাখ মানুষ কাজ করছে। এখানে ১৮ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। যার ৬৫ শতাংশ ঢাকার মধ্যে, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম, ১০ শতাংশ নারায়ণগঞ্জ ও বাকি ৫ শতাংশ অন্য বিভাগে রয়েছে।

প্লাস্টিক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি বাড়ার কারণেই এ খাতের রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আর জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্লাস্টিক শিল্প। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশই ইইউতে ও আমেরিকায় হয় ১০ শতাংশ। তবে আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য ছিল সম্ভাবনাময় বাজার। সেজন্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতিও নিতে থাকে। তবে এখন সেটিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কারণ, জিএসপি স্থগিতের কারণে ৩ থেকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে রপ্তানি করতে হচ্ছে।

এদিকে, জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (এসক্যাপ) কয়েক বছর আগে গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প খুবই সম্ভাবনাময়। ২০২০ সালের মধ্যে এ খাতের রপ্তানি আয় ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।

বিপিজিএমইএ জানায়, বর্তমানে ২০টি বড় প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, স্পেন, কানাডাসহ বিশ্বের ২৩টি দেশে সরাসরি যাচ্ছে বাংলাদেশের এই পণ্য। সার্কভুক্ত ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যে সবচেয়ে বেশি।

দেশ-বিদেশে এ শিল্পের প্রসারে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিপিজিএমইএ)সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার প্রচেষ্টায় গেলো বারের মতো এবারো বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বসছে ঢাকা আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক মেলার ১২তম আসর। ১৫ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ মেলা।

মেলায় দেশ-বিদেশের ৪ শতাধিক পণ্যের সমাহার থাকছে। মেলায় বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ অংশ নেবে। দেশগুলো হচ্ছে চীন, হংকং, ভারত, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, তুরস্ক, আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।

মেলায় আয়োজক সংগঠন আশা করছেন, গেলো বছরের মতো এ বছরও মেলায় বেশ জনসমাগম থাকবে। প্লাস্টিক পণ্যের পাশাপাশি মেলায় দেশ-বিদেশের প্রিন্টিং, প্যাকেজিং এবং মুদ্রণ শিল্পের অসংখ্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অংশ নেবে।

এমসি/ডিএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়