• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ৩ কার্তিক ১৪২৫

‘চাকরিবাজার থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে যাচ্ছে ভারত’ (ভিডিও)

শাহীনুর রহমান
|  ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:৫৫ | আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৪:৫৯
প্রবৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় দেশে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ২৭ লাখ বেকার রয়েছে। উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। বিশ্বব্যাংকও বলেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে গেলে এই কর্মসংস্থানকেই গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের চাকরিবাজার ও বেকারত্ব নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানের আইসক্রিম কোম্পানি ইগলুর প্রধান নির্বাহী (সিইও) জিএম কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানিয়েছেন তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতাও। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরটিভি অনলাইনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শাহীনুর রহমান।

শুরুতে আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কে জানতে চাই

জিএম কামরুল হাসান: নেসলেতে কাজের মধ্য দিয়ে আমার ক্যারিয়ার শুরু। কোম্পানিটিতে আমি প্রায় ১২ বছর ছিলাম। সেখানে বিভিন্ন পজিশনে থেকে কাজ করেছি। আমি রহিম আফরোজে কাজ করেছি, এরপর নিউজিল্যান্ড ডেইরিতে ছিলাম ৫ বছর। সেখান থেকে আমি সিঙ্গাপুরে কোম্পানিটির গ্লোবাল স্টাফ হিসেবে কাজ করি। প্রাণ গ্রুপের চিফ মার্কেটিং অফিসার- সিএমও ছিলাম। সব মিলে প্রায় অর্ধ ডজন কোম্পানিতে কাজ করেছি। দাপিয়ে বেড়িয়েছি ফিল্ড, সেলস, মার্কেটিং, করপোরেট ট্রেনিং সবখানেই। এরপর ইগলুতে। প্রায় ৩ বছর আগে কোম্পানিটির দায়িত্ব নিয়েছি।

আপনার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা কোথায়, কি বিষয়ে?

জিএম কামরুল হাসান: আমার বেড়ে ওঠা নেত্রকোনায়। সেখানে এসএসসি পড়ার পর ঢাকায় চলে আসি। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করার পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো-কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হই। সেখানে অনার্স শেষ হওয়ার পর পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছি। এরপর ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেছি।

কিন্তু বায়ো-কেমিস্ট্রিতে পড়ে কেন মার্কেটিং, সেখান থেকে কিভাবে এতদূর?

জিএম কামরুল হাসান: কেউ এমবিএ করলেই মার্কেটিংয়ে ভালো করবে এমনটি আশা করা ঠিক নয়। আমার বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন থেকেই এ সেক্টরে এসেছি। আমি মনে করি, মার্কেটিং হচ্ছে একটা কমন সেন্স। মার্কেটিং করতে হলে কোনও মার্কেটিং ডিগ্রির দরকার হয় না। এক সময় বাংলাদেশে মার্কেটিংয়ে এমবিএ ছিল না, পৃথিবীতেই এমবিএ ছিল না। কিন্তু তখনও তো মার্কেটিং হয়েছে; বিজনেস হয়েছে। আমাদের কোম্পানির এমডি কিন্তু এমবিএ করে আসেননি। কিন্তু তিনি তো ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। সুতরাং বিজনেসটা মূলত কমন সেন্স। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি ব্যবসা যদি আপনি বাড়াতে চান তবে সেখানে আপনার সম্পৃক্ততা কতটুকু, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কেটিং থেকেই সেটা শিখতে হয়। কাস্টমার কি জানে, কি বোঝে, কি নিতে পারে, সেটা জানাই মার্কেটিং। এটা একটা প্রাকটিসও বটে। তবে শিক্ষার গুরুত্ব আছে। কিন্তু থিওরির জায়গায় থিওরি। সেটা যদি প্রাকটিক্যালি না হয়, তবে তার ভ্যালু নেই।

আমি যখন কাজ করতে শুরু করলাম, তখন ভাবলাম আমাকে আরও ভালো করতে হবে। নিজকে বড় করার মানসিকতা, হেরে না যাওয়ার মানসিকতা থেকেই আমি কাজ করেছি। এটা অনেক দীর্ঘ পথ। চলার পথে মাঝে মাঝে আমার আপ-ডাউন হয়েছে। যখন আমি ডাউন হয়েছি তখন আবার ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়েছি। আরেকজন পারলে তুমি কেন পারবা না? এটা সবসময় আমার নিজকে মোটিভেট করেছে। মূল বিষয় হচ্ছে আপনি শিখতে চান কিনা? আমি যদি মনে করি আমি সবটা বুঝি, তাহলে আমি ডেড। লার্নিংটা যেকারও জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি মনে করি, ক্যারিয়ার হচ্ছে একটা টেস্ট প্রোসেস। মার্কেটিংয়ে সফল হতে গেলে আপনাকে ফিল্ডে পড়ে থাকতে হবে; লেগে থাকতে হবে; জানার আগ্রহ থাকতে হবে। এগুলোই আজ আমাকে সিইও বানিয়েছে।

দেশে এখন প্রায় ২৭ লাখ বেকার। এই বেকারত্ব কিভাবে দূর করা সম্ভব?

জিএম কামরুল হাসান: আমাদের দেশে এই মুহূর্তে ৩৫ শতাংশের বেশি যুবক বেকার। এটা মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ। প্রায় ২০ লাখ মানুষ এখন গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে। সরকারি চাকরি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পদ তো মাত্র ২৩০০ থেকে ২৫০০। সবাই এখন ওটার পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। তরুণরা আসলে এই চাকরির পেছনে কেন দৌঁড়াচ্ছে সেটা আমি জানি না।

তবে এটা বলবো শুধু সরকারের একার পক্ষে কখনই উন্নয়ন করা সম্ভব নয়, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এক্ষেত্রে জরুরি। বেকারত্ব দূরীকরণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে এগিয়ে আসতে হবে। আগে আমাদের নিজেদের মানসিকতা ঠিক করতে হবে।

কিন্তু প্রাইভেট খাত তো এখন এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি ধরনের মানসিকতার কথা বলছেন?

জিএম কামরুল হাসান: একটা বিষয় অবাক করার মতো- বাংলাদেশের শ্রমবাজার থেকে ভারত বড় অংকের একটি রাজস্ব নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ৫ লাখের বেশি ভারতীয় এখন কাজ করছে। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে তারা বিভিন্ন পজিশনে আছে। এমনকি অনেক দেশি কোম্পানিও মনে করে ভারত থেকে আমাদের লোক নিয়োগ দিতে হবে। এটা করপোরেট খাতে সবচেয়ে বড় মাইন্ড সেটআপ সমস্যা। কিন্তু আমাদের দেশ থেকে আপনি ভারতে চাকরি করতে যান সেখানে অনেক ফরমালিটি মেইনটেইন করতে হবে। আমাদের কোম্পানিগুলো যারা ইন্ডিয়ানদের নিয়ে আসছে, তারা নামে বেনামে বাংলাদেশ ব্যুরো থেকে অনুমতি নিয়ে তাদের কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। দেশপ্রেমের ঘাটতিই এখানে বড় সমস্যা।

আমরা মনে করি, ভালো ইংরেজি বলতে পারলেই তাদের বাংলাদেশে চাকরি দেয়া যাবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আমাদের দেশের ছেলেদের তৈরি করবো। আমার দেশের ছেলেদের ডেভেলপ করবো। আমার দেশের ছেলেরা যদি ডেভেলপ হতে শুরু করে তবে আজ না হোক, ৫ বছর পর এখান থেকে কর্মসংস্থান হতে শুরু হবে।

যখনই আপনি কোম্পানিতে একজন বিদেশি নিয়োগ দিচ্ছেন তখন কিন্তু তার দেশপ্রেম কাজ করে না, সে ওই কোম্পানি চাকরি করবে, টাকা পাবে এরপর চলে যাবে। আমার দেশের ছেলেরা যখন কাজ করবে তখন কিন্তু তারা দেশপ্রেমের কথা, কোম্পানির কথা চিন্তা করবে। সুতরাং এই মাইন্ড সেটআপ সমস্যাটা আমাদের করপোরেট মহলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে। চাকরিতে ঢুকেও সমস্যা আছে।

সেটা কোন ধরনের?

জিএম কামরুল হাসান: দেশে যাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে তারা রাতারাতি বড় হতে চায়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যখন গ্যাপ হয়, তখন কিন্তু তাদের হতাশা বেড়ে যায়- এটাও বেকারত্বকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এক্ষেত্রে করণীয় ক?

জিএম কামরুল হাসান: চাকরিতে পদের কথা ভুলে গিয়ে কাজকে সম্মান দিতে হবে। আপনি কাজ করা শুরু করুন পজিশন আপনাকে ফলো করবে। অনেক ক্ষেত্রে কিন্তু এখন পরিবর্তন আসছে। ছেলেরা এখন আর বাইকে করে ভাড়া খাটতে ইতস্তুত হয় না। একসময় সবাই জবের জন্য ছুটতো। এখন কিন্তু অনেকেই নিজে কিছু করছে। নিজেকে গ্রো করতে গিয়ে আর ৫টা ছেলেকে নিয়োগ দিচ্ছে। এটা ভবিষ্যতে দেশের জন্য অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

চাকরিপ্রার্থী অধিকাংশই এখন মার্কেটিংয়ের দিকে ছুটছেন। যেমন একজন অ্যাকাউন্টসে পড়লো তিনিও সেলসে ঢুকছেন আবার অন্য বিষয়ে পড়েও সেলসে যাচ্ছেন। নতুনরা কীভাবে ক্যারিয়ার চয়েস করবেন। এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

জিএম কামরুল হাসান: আমাদের শ্রমবাজারের সবখানেই এখনও ওই জায়গা তৈরি হয়নি। যেমন, বাবা-মা ছেলেকে কি বানাতে চায়, সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। যখন সেটা না হয়, তখন ওই ছেলে নিজের মতো করে পড়াশোনা করে। তখন ইচ্ছেটা থাকে গ্র্যাজুয়েট হওয়া। প্র্যাকটিক্যাল ভিউতে এখনও ক্যারিয়ার চয়েজের জায়গা তৈরি হয়নি।

তবে সমাধান আছে। এজন্য কারিকুলামে পরিবর্তন আনতে হবে। একটা এমবিএ বা বিবিএ প্রোগামে শুধু দুই বা এক মাসের ইন্টার্নশিপ দিলেই হবে না। কারণ এতে ওই শিক্ষার্থী প্র্যাকটিক্যালি কিছু শিখতে পারে না। শুধু ভালো সিজিপিএ থাকলেই সে কর্মক্ষেত্রে ভালো করবে সেটা বলা যাবে না। এজন্য ৪ বছরের পড়াশোনায় অন্তত এক বছর কোনও না কোনও কোম্পানির অধীনে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষা কারিকুলামে এটা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যখনই এটা হবে তখন যে কেউ নির্দিষ্ট খাতেই ক্যারিয়ার গড়তে পারবে। সরকারকেও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

আরটিভি অনলাইনকে সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

জিএম কামরুল হাসান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন : 

এসআর/এম

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়