• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

ব্যাংক খাতের অনিয়মের উদাহরন তৈরি করে গেলেন আবদুল হামিদ

মাজহার খন্দকার
|  ০৩ জুলাই ২০১৬, ১৩:০৫
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদ শুধু ব্যাংক আইনই লঙ্ঘন করেননি, পদে পদে উপেক্ষা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংককেও। শুরু থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘স্নেহানুকূল্য’ পেয়ে এসেও শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দিনই অর্থ আত্মসাতের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অপসারিত হওয়ার আগে ব্যাংক খাতের জন্য নানা নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করে গেছেন আবদুল হামিদ। ছয় বছর এমডির দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন গ্রুপকে অনৈতিক সুবিধা দেন। দায়িত্বকালীন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ হয়েছে দ্বিগুণ আর মুনাফা কমেছে ৫ গুণ।

মিরপুর পাইকপাড়া মৌজার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন ৫৫৫ দাগের জমিটি মুন গ্রুপের মালিক মিজানুর রহমানের দখল করা জমি বলে অভিযোগ আছে। জমির প্রকৃত দলিল না থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধক রেখে মিজানুর রহমানকে ঋণের ব্যবস্থা করে দেন আবদুল হামিদ।

আবদুল হামিদ ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার বছরে ব্যাংকটির প্রকৃত মুনাফা ছিল ৩৫১ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে মুনাফা নেমে আসে ৬৫ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে ২০১০ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রািহম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে আবদুল হামিদের কার্যক্রম মোটেও ভালো ছিল না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাঁকে অপসারণ করেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে দুদককে নিতে হবে।

ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয় তাঁকে নিয়ম ভেঙে এমডি নিয়োগ দেয়। মনে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের লোকজন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।’

ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০১৩ সালে সংশোধন হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া এমডি নিয়োগের সুযোগ নেই। সৈয়দ আবদুল হামিদকে পুনির্নয়োগ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি ছিল। এরপরও তাঁর মেয়াদ এক বছর বাড়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়। সে সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, ‘১১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে সৈয়দ আবদুল হামিদের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হলো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণের প্রয়োজন নেই।’ এরপর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ধরনের নির্দেশনা উপেক্ষা করেন আবদুল হামিদ।

মুন গ্রুপের অনিয়মের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ব্যাংকটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মিজানুর রহমান খানকে (গ্রেপ্তারকৃত) পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পর্ষদও তাঁকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু এমডি একক ক্ষমতাবলে ঋণ অনুমোদনসহ ঋণ কমিটির প্রধান বানিয়ে দেন ডিএমডিকে। হামিদ নিজেও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে।

 

ব্যাংকটির তৎকালীন অডিট কমিটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি এসব ঘটনার জন্য এমডি ও অন্য কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক এমডির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১২টি অনিয়ম খুঁজে পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে অগ্রণী ব্যাংক তানাকা ট্রেড কম ইন্টারন্যাশনালকে ১২০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেয়। পরে পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া এমডি ওই ঋণের জামানত পরিবর্তন করে ফেলেন। প্রতিষ্ঠানটিকে এরপর ২০১৫ সালে ১১ কোটি টাকা ঋণ নবায়ন করে দেন এমডি, আবার ৪৬ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হওয়ার পরও নিয়মিত দেখান।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের লালদীঘি ইস্ট শাখার গ্রাহক মুহিব স্টিলের ৪২ কোটি টাকা ঋণ নবায়ন, মাহিদ অ্যাপারেল লিমিটেডকে বিনা মার্জিনে ৪০ কোটি টাকার ঋণপত্র খোলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ অবলোপনেও এগিয়ে ছিলেন তিনি। ২০১০ সালে ব্যাংকটির ঋণ অবলোপন ছিল ৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া নুরজাহান সুপার অয়েলের ৬৫ কোটি, খালেক অ্যান্ড সন্সের ২০৬ কোটি, মাররীন ভেজিটেবলের ৩০৬ কোটি, তাসমিন ফ্লাওয়ারের ২৭ কোটি ও জাসমীর ভেজিটেবলের ৮৬ কোটি টাকা অবলোপন করেন তিনি।

অপসারিত এমডি হামিদের এসব কর্মকাণ্ডের সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক। কেমন দেখেছেন আবদুল হামিদকে—জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। এদিকে দুদকের মামলার পর থেকে পলাতক আবদুল হামিদ। তাঁর রায়েরবাজারের বাসায় গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়