• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

হাজারীবাগে ট্যানারি কর্মযজ্ঞ আর চলবে না

মিথুন চৌধুরী
|  ০৮ এপ্রিল ২০১৭, ১৭:৪৫ | আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৭, ১৯:০৬
এক-দু’দিন না, দীর্ঘ ৫৭ বছরের (১৯৬০-২০১৭ সাল) হাজারীবাগের ট্যানারি অধ্যায়ের ইতিহাস। তর্ক-বিতর্ক, কোর্ট-কাছারি করে অবশেষে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন সংযোগসহ সব ধরনের সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে এর ইতি টানছে সরকার। পরিবেশ দূষণের দায় ও  বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারীর মুকুট দুটোই এ খাতের উদ্যোক্তাদের। আর ভালো-মন্দ মিলিয়ে ট্যানারি শিল্পের নতুন ইতিহাস গড়ে উঠছে সাভারে।

১৯৪০ সালের শেষদিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে চামড়া শিল্পের যাত্রা। পরে গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং একে আরো এগিয়ে নিতে ১৯৬০ সালে তা ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ছোট-বড় অনেক ট্যানারি কারখানা গড়ে ওঠে। মূলত তখন এদেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ করে রপ্তানি করা হতো পশ্চিম পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্কে। স্বাধীনতার ঠিক পরই এ শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয় এবং সেই সময় থেকে চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। শতকরা ৯৫ ভাগ কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। রপ্তানিযোগ্য চামড়ার মধ্যে রয়েছে ওয়েট ভুলু, ক্রাস, ফিনিশড ও লেদার গুডস।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে শতকরা ৯৫ ভাগ ট্যানারি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এসব ট্যানারি পরিবেশকে মারাত্মক ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হাজারীবাগের ২৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে ২৫০ থেকে ২৬০টি ছোট-বড় ট্যানারি কারখানা গড়ে উঠেছে। এগুলোর বর্জ্যে অন্তত ৪০ রকমের বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। এর মধ্যে ক্রোমিয়াম, সোডিয়াম সালফেট, পটাশিয়াম সালফেট, ক্যাডমিয়াম, কপার, লেড, সেলেনিয়াম, নিকেল অন্যতম। এসব রাসায়নিক পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব কেমিক্যালের মধ্যে ক্রোমিয়াম মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। আর সালফার ডাই-অক্সাইড ফসফুসের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা গেছে, হাজারীবাগের ট্যানারির তরল বর্জে্যর কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। যার মধ্যে শুধু পরিবেশগত ক্ষতি হয় প্রায় ২ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। ট্যানারি নিসৃত বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দুর্গন্ধ প্রায় ১ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসও ব্যাহত হয়। শুধু তাই না, ট্যানারি দূষণের সবচে’ ভয়াবহ শিকার হচ্ছে ঢাকার প্রাণশক্তি বুড়িগঙ্গা। বলা হয়, ট্যানারি দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের মাত্রা এতো মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শুধু বাংলাদেশের না, বিশ্বের কোনো প্রচলিত প্রযুক্তি দিয়েও এ পানির পরিশোধন সম্ভব নয়।

এসব কারণে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০১ সালে দেয়া আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা গ্রামে ১৯৯ একর জমির ওপর চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে। প্রথমে ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে, পরে প্রকল্পের ব্যয় দু’দফা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সেখানে ১৫৫টি ট্যানারি শিল্প-কারখানাকে সরিয়ে নেয়া ও তৈরির জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

৩ বছর মেয়াদি প্রকল্পের সরকারের প্রস্তুতি আর মালিকদের সদিচ্ছার অভাবেই সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করা হয়নি। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া চামড়া শিল্প নগরী ১৩ বছরেও প্রস্তুত হয়নি। সরকার এবং মালিকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের জের ধরে পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর চামড়া কারখানা হাজারীবাগে রয়ে যায়।

গেলো ৩০ মার্চ হাজারীবাগে থাকা ট্যানারিগুলোর সব কার্যক্রম ৬ এপ্রিলের মধ্যে বন্ধ করা হলে জরিমানা মওকুফের বিষয়টি বিবেচনার কথা জানান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানি ৯ এপ্রিল গ্রহণের কথাও জানান আদালত। তার আগেই হাজারীবাগের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয় পরিবেশ অধিদপ্ততরকে। 

গেলো ২ এপ্রিল আদালতের নির্দেশ অনুসারে, হাজারীবাগে থাকা সব ট্যানারি বন্ধ করে দেয়ার কথা জানান মালিকরা। এসময় তারা শিগগিরই সাভারে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি দ্রুত সংযোগ দেয়ার দাবি করেন। তারা বিপর্যয় রোধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন।

এর আগে ট্যানারি কারখানার মালিকরা কোরবানির ঈদ পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগে কার্যক্রম চালিয়ে যাবার সময় চেয়ে আবেদন করে। পরে ২৯ মার্চ আদালত কার্যক্রম চালাতে পারবে না, বরং ৬ এপ্রিলের মধ্যে সব ট্যানারি সরিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।
এসময় ট্যানারি মালিকদের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, সাভারের শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় ট্যানারি স্থানান্তরে কোরবানি পর্যন্ত সময় লাগবে বলে আদালতে শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, ট্যানারি স্থানান্তরে বারবার সময় বেঁধে দেয়া হলেও আদালতের নির্দেশ অমান্য করে আসছে ট্যানারি মালিকরা।

গেলো ৬ মার্চ হাইকোর্টের ওই ডিভিশন বেঞ্চ এক আদেশে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেন। এমনকি কারখানাগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নির্দেশ দেন আদালত। পাশাপাশি ট্যানারি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলা হয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে গেলো ১২ মার্চ আপিল বিভাগও তা খারিজ করে দেন। ফলে ট্যানারি কারখানাগুলোর হাজারীবাগে থাকার আর সুযোগ থাকে না।

মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। পরে ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট ফের নির্দেশ দেন।

পরে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাজারীবাগ থেকে যেসব ট্যানারি স্থানান্তর হবে না, ১ মার্চ থেকে সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ, লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দ্রুত সময়ে সাভারের চামড়া শিল্প পার্কে কারখানা চালু করা না গেলে আসছে মৌসুমে এ খাত বিপাকে পড়বে। আসছে ৪ মাস পরই চামড়ার প্রধান মৌসুম ঈদুল আজহা। এ সময় গরু-ছাগলসহ প্রায় ৮০ লাখ চামড়া উৎপন্ন হয়। কিন্তু কারখনা চালু না থাকলে বর্তমান মজুদ চামড়ার কাজ শেষ হবে না। তাই অতিরিক্ত চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। মৌসুমের শুরুতে চামড়া মজুদ করা না গেলে বছর শেষে ফের সঙ্কটে পড়তে হবে।

নিজেদের দাবি আদায়ে ১০ এপ্রিল সমাবেশ করবে ট্যানারি মালিক-শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার ট্যানারি মালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের বিশেষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ওই সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। চামড়া উৎপাদন ও চামড়াপণ্য রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এমনকি মাংস ব্যবসায়ীরাও এ সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন।

চামড়া শিল্প নগরীর সবশেষ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর অবকাঠামো এখনো শতভাগ প্রস্তুত না। মূলত, বিসিকের প্রস্তুতি এবং মালিকদের সদিচ্ছার অভাবেই এ নগরীকে উৎপাদনের উপযোগী করা যায়নি। সামনের সারির প্লটগুলোর সামনের সড়কের কাজ শেষ হলেও পেছনের দিকে রাস্তা এখনো কাঁচা। বৃষ্টিতে সেখানে হাঁটু পানি ও কাদা জমে যায়। আবার অনেকে বরাদ্দ নিয়েও ট্যানারি শিল্প গড়ে তোলেননি। এখনো খালি পড়ে আছে অনেক প্লট। একমাত্র অ্যাপেক্স ট্যানারি ছাড়া সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে অন্য কোনো কারখানায় শতভাগ উৎপাদন শুরু হয়নি। কয়টি কারখানায় শুধু ওয়েট-বস্নু হচ্ছে।

মালিকদের অভিযোগ, সরকার কারখানা স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সহায়তাও দেয়নি। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নিতে প্লট বরাদ্দসহ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও এখন পর্যন্ত ১১২ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। আবার শিল্পনগরীর চারপাশের সব সড়ক ঘিরে গ্যাসের লাইন বসানোর কাজ সম্পন্ন হলেও অভ্যন্তরে এখনো তা সংযোগ দেয়া হয়নি।

তবে বিসিক উল্টো অভিযোগ করে বলছে, ট্যানারি মালিকদের গাফিলতিতেই বরাদ্দ অর্থের পুরোটা এখনো পাওয়া যায়নি। আবার ১১ বছর আগে গ্যাসের লাইন বসানোর কাজ শেষ হলেও ট্যানারি মালিকরা নিজ নিজ প্লটের সংযোগের জন্য আবেদন করেননি।

তারা জানান, তিতাস কর্তৃপক্ষ ট্যানারি মালিকদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা হাজারীবাগে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করছিলেন সাভারেও তাদের সেটুকুর সংযোগ দেয়া হবে। এর বেশি না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা হাজারীবাগের তুলনায় বেশি গ্যাস ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে।

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক জানান, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হচ্ছে। এটাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে আমাদের দাবি থাকবে, ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে একজন শ্রমিকও যেনো বেকার না হয়, সেদিকে ট্যানারি মালিক ও সরকারের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ থাকবে।

তিনি বলেন, হাজারীবাগের ট্যানারির ওপর নির্ভর করে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের খাওয়া-পরা। এখন হাজারীবাগ থেকে আদালত ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু আদালতের নির্দেশ আছে, সেহেতু ট্যানারি সরিয়ে নিতেই হবে। তবে আমরা চাইবো, হাজারীবাগের মতো সেখানেও যেনো আমাদের শ্রমিকরা কাজ পায়।

লেদার গুডস্ অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের(বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, নগরীতে যে পরিমাণ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তার মাত্র ৪ শতাংশের দায় আমাদের। কিন্তু আমাদের ওপরই ষড়যন্ত্র চলছে। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে লাখ লাখ লোক বেকার হবেন। বিসিক যদি চামড়া শিল্প পার্ক পুরোপুরি তৈরি করতে পারতো, তাহলে আমরা চলে যাবো। তারা তাদের কাজ করেনি। বিসিকের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, বিসিক চামড়া শিল্পনগরী তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনো আমাদের ৩০ হাজার শ্রমিকের থাকার ব্যবস্থা করেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই। আমরা যাবো কি করে? আমাদের আর জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বিসিক নিজেরা চামড়া শিল্প পার্ক পুরোপুরি তৈরি না করে আদালতে বলেছে, তাদের কাজ নাকি শেষ। বিসিকের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি। আসছে ১০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি দেয়া হবে। কী ধরনের কর্মসুচি দেবো সেটা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

এমসি/ডিএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়