• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়েই মরতে চান ভিক্ষুক মুক্তু মিয়া

রাজিউর রহমান রাজু
পঞ্চগড়
|  ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১:৫৭ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২:৫৭
আবারও চলে যাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক ডিসেম্বর। চলে যাচ্ছে আরেকটি বিজয়ের মাস। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আমরা যখন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মহান বিজয় দিবস উদযাপন করছি।  ১৯৭১ সালের সেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আজ ষোল কোটি পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে বাংলাদেশ, বদলে গেছে মানুষের ভাগ্য।

কিন্তু জাতির জনকের ডাকে যারা সেদিন পুরো ৯ মাস দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতা, ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়, পবিত্র এই ভূমিতে উড়িয়ে দিয়েছিলেন লাল-সবুজের গৌরবময় জাতীয় পতাকা, সেই বীর মুক্তিসেনারা যখন বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে দু’মুঠো ভাতের জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরেন মানুষের দ্বারে দ্বারে আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ন্যূনতম স্বীকৃতির জন্য বারবার আকুতি জানান তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় আমাদের এই বিজয়ের আনন্দ ?

এমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা পঞ্চগড়ের মুক্তু মিয়া। কুমিল্লার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন মুক্তুমিয়া। পিতা রইম উদ্দিন মুন্সি আর মাতা খাতনা বেগমের ৫ সন্তানের মধ্যে মুক্তু ছিলেন সবার ছোট। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় শ্রেণিতেই পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। হাল ধরেছিলেন সংসারের।

বিয়ের পর ২৫ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসেন পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড় শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারত সীমান্তবর্তী ভিতরগড় প্রাচীন দূর্গনগরীর ঐতিহাসিক মহারাজা দীঘির পাড়ে বসবাস শুরু করেন। ১ ছেলে ও ২ মেয়ের জন্ম দিয়েই পরপারে পাড়ি জমান প্রথম স্ত্রী। সন্তান ও সংসারের কথা বিবেচনা করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন মুক্তুমিয়া।

দ্বিতীয় স্ত্রীর ২ ছেলে ২ মেয়ে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালই দিন কাটছিল কর্মঠ মুক্তু। ১৯৭১ সালে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। তার বয়স তখন ৩৫। এলাকায় চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় সেসময় কয়েকজন যুবক মিলে রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিতেন তারা।

হঠাৎ একদিন একেএম মাহবুব উল আলমের নেতৃত্বে একদল মুক্তিবাহিনী এলেন মুক্তু মিয়ার বাড়িতে। মাহবুব উল আলম ছিলেন ৬ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর ৩/এ মধুপাড়া কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার। তিনি ভিতরগড় এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ২৫ জনের একটি দল গঠন করেছিলেন। মুক্তু মিয়ার সাহসিকতা আর বিচক্ষণতা দেখে ২৫ জনের ওই মুক্তিবাহিনীর দলটিকে মুক্তুমিয়ার হাতে তুলে দেন মাহবুব।

সেই থেকে শুরু হয় মুক্তু মিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ। ২৫ জনের ওই দলটির গাইড হিসেবে কাজ করতেন তিনি। টানা নয় মাস গাইডের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নেন মুক্তু মিয়া। পঞ্চগড়ের অমরখানা, জগদল, শিংপাড়া, দেওয়ানহাট, তালমাসহ বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখান তিনি। নিজের যতটুকু সাধ্য তা দিয়েই মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াতেন, দিতেন নিজ বাড়িতে আশ্রয়।

কোম্পানি কমান্ডারের নির্দেশে মুক্তু মিয়া পঞ্চগড়ের ভিতরগড় এলাকায় বেশ কয়েকবার রেকি করে আসেন এবং নির্ভুলভাবে শত্রুর অবস্থানসমূহ চিহ্নিত করে স্কেচ ম্যাপ তৈরি করে দিতেন। গেরিলা থেকে সম্মুখ প্রত্যেক জায়গায় তার অবদান ছিল অপরিসীম।

মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য বীরত্বের কথা তৎকালীন এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার এ কে এম মাহবুব উল আলম তার ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ’ নামক বইয়েও তুলে ধরেছেন। এছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মহাব্যবস্থাপক থাকাকালীন জাদুঘরের পক্ষ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র তাকে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোদ্ধা গোলাম গাউছকে চোখের সামনেই পাক বাহিনীর সদস্যরা রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল। সে সব স্মৃতি আজও অম্লান মুক্তুমিয়ার স্মৃতিতে। বলেন, নিজের হাতেই ভারতে নিয়ে গোলাম গাউছকে কবর দিয়েছিলেন তিনি।

দেশ স্বাধীনের পর নদীতে পাথর তুলে আর দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন মুক্তু মিয়া। ভুল করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম না ওঠায় আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু মেলেনি তার।

আজও ৮১ বছর বয়সে মহারাজা দীঘি পাড়ের নি:সঙ্গ বাসিন্দা মুক্তুমিয়া। বার্ধক্য আর নানা জটিল রোগ আক্রান্ত মুক্তু মিয়ার এক টুকরো ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। বৃদ্ধ বয়সে দেখার কেউ নেই। দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সন্তানরা অনেক আগেই ফেলে গেছেন তাকে। জীবিকার তাগিদে তারা বাস করেন ঢাকায়। স্বজনদের কেউই খবর রাখার দরকার মনে করেন না তার।

মুক্তু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে ছোট একটি কুঁড়েঘর। বাঁশের ফাঁকা ফাঁকা বেড়া দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে বাইরের সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শীতের সময় এই ফাঁকাগুলো দিয়ে হুহু করে ঢুকে হিমেল বাতাস।  ঘরে পুরনো চৌকি তার ওপরে খড় দিয়ে একটি কম্বল বিছানো। সারা ঘরে ছড়ানো ছিটানো ভিক্ষা আর রান্নার নানা উপকরণ। ঘরের এক কোণে একটি চুলা। এখানে নিজ হাতে রান্না করেন তিনি।  
 
নানা রংয়ের টুকরো কাপড় দিয়ে পেঁচানো হাতে একটি ভিক্ষার লাঠি। পরনে ছেড়া ময়লা কাপড়। চোখে ভাঙা ফ্রেমের ঘোলা কাচের চশমা। চোখ দিয়ে অনবরত ঝরছে পানি।  

কেন চোখ দিয়ে পানি ঝরছে জানতে চাইলে কাঁপা কাঁপা স্বরে মুক্তুমিয়া জানান, বেশ কিছুদিন ধরে চোখের সমস্যা। ডাক্তারও দেখিয়েছেন। ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি চশমার কাচ বদলাতে বলেছেন ডাক্তার। কিন্তু টাকার অভাবে তা আর বদলানো হয়নি। কোমর থেকে নিচের অংশ দিনদিন অবশ হচ্ছে। আগের মতো আর হাঁটতে পারছেন না। দূর-দূরান্তে ভিক্ষার থলি নিয়ে বেড়াতে পারেন না। একটু হাঁটতেই হাঁপিয়ে উঠছেন তিনি।

মাঝে মাঝে প্রতিবেশী মহিলারা তাকে রান্না করে দেন। খাবার না থাকলে তারা যতটুকু পারেন সাহায্য করেন।

অভিমানের সুরে আক্ষেপ করে মুক্তু মিয়া জানান, মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাকি আমার নাম নাই তাই কিচ্ছু পাই না। কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় চোখের সামনে যারা চুরি-ডাহাতি (ডাকাতি) করলো তারাই এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা! আর আমি ভিক্ষা করেও ভাত পাই না! এইডা আমার কপালের দোষ। অনেকবার মুক্তিযোদ্ধা অফিসে গেছি কোন লাভ হয়নি। মাহবুব সাহেব একটা কাগজ (প্রত্যয়নপত্র) পাঠাইছে, আগে কিছু টাকাও পাঠাইছিল, এখন আর দেয় না। এহন তো আমার জীবন শেষ, আর চাওয়া-পাওয়া কি ? শেষ জীবনে যদি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরতে পারতাম তাতেই আমার শান্তি।’

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পঞ্চগড় জেলা ইউনিটের কমান্ডার মির্জা আবুল কালাম দুলাল জানান, মুক্তুমিয়া স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এটা সত্য। তবে কি কারণে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি সেটা জানা যায়নি। আগামী দিনে কিছু বাদ পড়া মুক্তিযোদ্ধা অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি এই যাচাই বাছাইয়ে মুক্তুমিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ গোলাম আযম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড় এলাকায় মুক্তুমিয়ার অনেক অবদান রয়েছে বিষয়টি আমরা বিভিন্নভাবে জেনেছি। যুদ্ধ চলাকালীন ভুলবশত তার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় স্থান না পাওয়ায় তাকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এরইমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সামান্য আর্থিক সহযোগিতা  করেছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তালিকাভুক্ত হবার ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তিনি।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়